২০১৯-২০ অর্থবছরে রেলওয়ের আয় কমেছে ৩৯০ কোটি টাকা

২০১৯-২০ অর্থবছরে রেলওয়ের আয় কমেছে ৩৯০ কোটি টাকা

ইসমাইল আলী: দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। তবে কভিড-১৯ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধে ২৬ মার্চ থেকে টানা ৬৬ দিন ছিল সাধারণ ছুটি। এর দুদিন আগে ২৪ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায় যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল। এরপর ৩১ মে থেকে পর্যায়ক্রমে কিছু ট্রেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে চালু করা হয়। তবে এখনও দেশব্যাপী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়নি, যার প্রভাব পড়েছে রেলওয়ের আয়ে।

বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেলের আয় কমে গেছে প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে রেলওয়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন এবং জমি ইজারাসহ অন্যান্য খাত মিলিয়ে আয় করে এক হাজার ২০০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যা চার বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেলওয়ের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল দুই হাজার ১৩ কোটি তিন লাখ টাকা। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলের (ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক হাজার ৪১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আর পশ্চিমাঞ্চলের (খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগ) লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

এ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে পূর্বাঞ্চল থেকে রাজস্ব আয় হয় ৬৮৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, আর পঞ্চিমাঞ্চল থেকে আয় হয় ৪৫৪ কোটি ৯৩ লাখ  টাকা। এছাড়া টেলিকম খাতের ইজারা থেকে আয় হয় ৬০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে গত অর্থবছর রেলের আয় দাঁড়ায় এক হাজার ২০০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এ আয় প্রায় ৪০ শতাংশ কম।

এদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেলওয়ের আয় ছিল এক হাজার ৫৯০ কোটি ১০ লাখ টাকা। এ হিসাবে বিদায়ী অর্থবছর রেলের আয় কমেছে ৩৮৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বা ২৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।

এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেলের আয় ছিল এক হাজার ৬২৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা সংস্থাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেলওয়ে আয় করে এক হাজার ৩০৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয় করেছিল এক হাজার ৩১ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এ হিসাবে চার বছরের এবারই রেলের আয় সর্বনি¤œ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সূত্রমতে, করোনা পরিস্থিতির কারণে গত ২৪ মার্চ থেকে সারা দেশে সব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর গত ৩১ মে প্রথম দফায় আট জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হয়। তবে প্রতিটি ট্রেনের আসনের ৫০ শতাংশ টিকিট বিক্রি করা হয়, যার পুরোটাই দেওয়া হয় অনলাইনে।

পরবর্তীকালে ৩ জুন আরও ১১ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হয়। তবে যাত্রী সংকটের কারণে কিছুদিন পর দুই জোড়া ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া গত ১৬ আগস্ট নতুন করে আরও ১৩ জোড়া ট্রেন চলাচল শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৭ আগস্ট থেকে আরও ১৮ জোড়া ট্রেন পরিচালনা শুরু করা হয়। এরপর আগামী ৫ সেপ্টেম্বর থেকে আন্তঃনগর, কমিউটার ও লোকালসহ আরও ১৯ জোড়া ট্রেন চলাচল শুরু হবে। এসব ট্রেনেও আসনের ৫০ শতাংশ টিকিট বিক্রি করা হবে, যার পুরোটাই অনলাইনে।

রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেলওয়ে যাত্রী পরিবহন করে ছয় কোটি ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার। এর আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৯ কোটি ২৭ লাখ পাঁচ হাজার। অর্থাৎ করোনার কারণে ট্রেন বন্ধ থাকায় রেলের যাত্রী পরিবহন কমেছে দুই কোটি ৮৯ লাখ ৪৭ হাজার বা ৩১ দশমিক ২২ শতাংশ। আর গত অর্থবছরে রেলওয়ে যাত্রী পরিবহন থেকে আয় করে ৭৭০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে রেলওয়ের আয় ছিল এক হাজার ৩৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ যাত্রী পরিবহন কম হওয়ায় খাতটি থেকে আয় কমেছে প্রায় ২৫ দশমিক ৬১ শতাংশ।

সূত্রমতে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এত কম যাত্রী রেলওয়ে পরিবহন করেনি। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেলপথে যাত্রী পরিবহনের পরিমাণ ছিল ৯ কোটি ৫৭ হাজার, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সাত কোটি ৭৮ লাখ সাত হাজার ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সাত কোটি আট লাখ ৩১ হাজার। রেলওয়ে এর চেয়ে কম যাত্রী পরিবহন করেছিল ৯ বছর আগে ২০১০-১১ অর্থবছরে। সে বছর ছয় কোটি ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার যাত্রী পরিবহন করেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত্ব এ সংস্থাটি।

চলতি অর্থবছরেও এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের প্রকল্প কর্মকর্তা ও রেলবিষয়ক গবেষক মো. আতিকুর রহমান। শেয়ার বিজকে তিনি বলেন, বর্তমানে ট্রেনের সব ধরনের টিকিট অনলাইনে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। স্টেশনগুলোতে কোনো টিকিট বিক্রি করা হয় না। এতে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে যারা স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না ও কিছুটা কম শিক্ষিত বা অশিক্ষিত তারা ট্রেনের টিকিট কেনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার করোনার কারণে ট্রেনের মোট আসনের অর্ধেক টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে আয়ও কম হচ্ছে। আর যাত্রী পরিবহনই বাংলাদেশ রেলওয়ের আয়ের সবচেয়ে বড় খাত। তাই দ্রুতই রেলের আয় বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

এদিকে যাত্রীবাহী ট্রেন দুই মাসের বেশি বন্ধ থাকলেও পণ্যবাহী ট্রেন কিছুদিন পরই চালু করা হয়। এতে করোনার মাঝে আম-লিচুসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য রেলপথ পরিবহন অব্যাহত থাকায় গত অর্থবছরে এ খাতে আয় হ্রাস পেয়েছে সবচেয়ে কম।

তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেলওয়ে পণ্য পরিবহন করে দুই লাখ ছয় হাজার ২১ ওয়াগন। এর আগের বছর এ সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৪৫ হাজার ৭৯৯ ওয়াগন। অর্থাৎ করোনার কারণে পণ্য পরিবহন কমেছে ৩৯ হাজার ৭৮ ওয়াগন বা ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর গত অর্থবছরে রেলওয়ে পণ্য পরিবহন থেকে আয় করে ২৪৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে রেলওয়ের আয় ছিল ২৮৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ পণ্য পরিবহন খাত থেকে আয় কমেছে মাত্র ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

যদিও করোনায় ট্রেনে পার্সেল পরিবহন সবচেয়ে বেশি (৩৩ শতাংশ) কমেছে। আর এ খাত থেকে আয় কমেছে প্রায় ২৭ শতাংশ। এছাড়া আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় দুই মাস স্থবির থাকায় রেলপথে কনটেইনার পরিবহন কমেছে প্রায় ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং খাতটি থেকে আয় কমেছে প্রায় ১৪ দশমিক ১১ শতাংশ।

সূত্র:শেয়ার বিজ, অগাস্ট ৩০, ২০২০

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।