হাতি চলাচলের একাধিক বিকল্প ভাবছে রেলওয়ে

হাতি চলাচলের একাধিক বিকল্প ভাবছে রেলওয়ে

সুজিত সাহা :  চলতি সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেললাইন প্রকল্পের কাজ। তবে নির্মাণাধীন রেলপথটির বেশ কয়েকটি অংশে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য এলাকায় হাতি চলাচলের বিশেষ ব্যবস্থা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি রেলওয়ে।

শুরুতে হাতি চলাচলের জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর এখন একাধিক বিকল্প ভাবছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাতি পারাপারের এলাকাটির দৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় শুধু ফুটওভার ব্রিজ দিয়েই এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই ফুটওভার ব্রিজের পাশাপাশি লোকোমোটিভে ডিজিটাল সেন্সর, ওয়াচ টাওয়ার, সিসিটিভি ক্যামেরা ও টহলের মাধ্যমে হাতি পারাপারের এলাকাগুলোয় পাহারা দেয়া ছাড়াও প্রয়োজনে বেশ কয়েকটি এলাকায় উড়াল রেল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে রেলপথের সেতুগুলো উঁচু করে নির্মাণ করার কথা ভাবা হচ্ছে, যাতে হাতি সহজেই পার হয়ে যেতে পারে।

দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১২৯ কিলোমিটার রেলপথটির জন্য ১৩ হাজার ১১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা ঋণসহায়তা হিসেবে দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বাকি ৪ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেয়া হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে হাতির জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কোনো সুপারিশ করা হয়নি। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে চূড়ান্ত করা প্রকল্প প্রস্তাবনায়ও (ডিপিপি) বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পরবর্তীতে হাতির জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাবটি যোগ করা হয় প্রকল্পে। ফুটওভার ব্রিজগুলো নির্মাণের জন্য ব্যয় ধরা হয় ১৭৭ কোটি টাকা। পুনর্গঠিত ডিপিপিতে ১১টি পয়েন্টে হাতি চলাচলের জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করার কথা ছিল। কিন্তু পয়েন্টগুলোর পরিধি বিস্তৃত হওয়ায় এখন বিকল্প চিন্তা করছে রেলওয়ে।

সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল ভারতের দেরাদুনে বন্যপ্রাণী ট্রেনিং ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করে এসেছে। এডিবি, বন বিভাগের কর্মী, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে এরই মধ্যে গবেষণা চালাচ্ছে রেলওয়ে। দলটি আগামী মার্চে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দেবে। প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুসারে হাতি পারাপারের জন্য একাধিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।

জানা গেছে, প্রকল্প এলাকার ১৮টি লোকেশনে ৩৫টি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। মূলত চকরিয়ার মেধাকচ্ছপিয়া ও ফাসিয়াখালী এবং লোহাগাড়ার চুনতী ইউনিয়নে সর্বোচ্চ ১৮টি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এর মধ্যে চুনতীতে ১০টি, ফাসিয়াখালীতে ছয় ও মেধাকচ্ছপিয়ায় দুটি। বাকি ১৭টি ক্যামেরা আটটি পয়েন্টে বসানো হয়েছে। চুনতী ও ফাসিয়াখালী এলাকায় প্রতিদিনই হাতি চলাচলের রেকর্ড হচ্ছে।

এ বিষয়ে দোহাজারী-গুনদুম প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মো. মফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলপথ নির্মাণের এলাকাটি হাতি চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ রুট। বেশ কয়েকটি এলাকা দিয়ে হাতির চলাচল থাকায় শুধু ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে জটিলতা এড়ানো সম্ভব নয়। আমরা বিষয়টি নিয়ে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করেছি। এডিবি এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ৩৫টি পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি। আশা করি, আগামী মার্চের মধ্যে এ বিষয়ে গঠনমূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারব।’

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাতি বা বন্যপ্রাণী চলাচলের পথ নির্বিঘ্ন করতে সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে বিভিন্ন পয়েন্টের রেলপথ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা। কিন্তু এতে প্রকল্পটির ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। ফলে ডিপিপিতে নির্ধারিত অর্থেই হাতি চলাচল নির্বিঘ্ন করতে হবে। পয়েন্টগুলোর মধ্যে ছয়টি দিয়ে প্রায় সারা বছর এবং পাঁচটি পয়েন্ট দিয়ে অনিয়মিতভাবে হাতি চলাচল করে। রেলপথটি ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেকটা উঁচু হওয়ায় পাথুরে পথে হাতির পাল পার হয় শ্লথগতিতে। ফলে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে হাতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ট্রেনগুলোর নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি করবে।

জানতে চাইলে প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, হাতি চলাচলের বিভিন্ন পয়েন্টের মধ্যকার দূরত্ব কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে একটি মাত্র পন্থা অবলম্বন করলে হাতির চলাচল নির্বিঘ্ন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ওয়াচ টাওয়ার, নিয়মিত লোকবল নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেও হাতির গতিবিধি দেখার পর কন্ট্রোল রুমে জানানো কঠিন হয়ে যেতে পারে। এছাড়া পয়েন্টগুলোর মধ্যকার পথ দীর্ঘ হওয়ায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েও করা সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে একাধিক পরিকল্পনা রাখা হতে পারে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন চন্দনাইশে ১০ একর অধিকৃত জমি বুঝিয়ে দেয়। এছাড়া ৮ জানুয়ারি কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ২১০ একর জমি রেলওয়েকে বুঝিয়ে দেয়। প্রকল্পের সিংহভাগ অংশের ভূমি বুঝে পাওয়ায় চলতি সপ্তাহের মধ্যেই প্রকল্পটির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ের। এটি বাস্তবায়ন হলে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্য সহজীকরণ ছাড়াও সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রক্রিয়াটি আরো সহজ হবে।

সুত্র:বণিক বার্তা, জানুয়ারি ১৮, ২০১৮

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।