শুরুতেই নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে পাঁচ হাজার ১০০ কোটি টাকা

শুরুতেই নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে পাঁচ হাজার ১০০ কোটি টাকা

ইসমাইল আলী: পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ স্থাপনে ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে যশোর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করবে সরকার। ২০১৬ সালের মে মাসে প্রকল্পটি অনুমোদন করা হলেও এখনও নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। আবার জিটুজি ভিত্তিতে এতে চীনের অর্থায়নের কথা থাকলেও এখনও ঋণচুক্তি সই হয়নি। এরই মধ্যে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে প্রায় পাঁচ হাজার ১০০ কোটি টাকা। যদিও এটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রেলপথ।

এদিকে প্রকল্পটিতে আশ্বাসের চেয়ে কম ঋণ দিচ্ছে চীন সরকার। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় আগের চেয়ে অনেকখানি বাড়াতে হবে।

পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের সংশোধিত উন্নয়ন প্রস্তাবনা (আরডিপিপি) সম্প্রতি চূড়ান্ত করেছে রেলওয়ে। এতে দেখা যায়, ঢাকা-মাওয়া-যশোর রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। নতুন হিসাবে এ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ নির্মাণ শুরুর আগেই প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ছে পাঁচ হাজার ৯১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বা ১৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। যদিও সম্ভাব্যতা যাচাইকালে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটিতে চীনের ঋণ দেওয়ার কথা ছিল ২৪ হাজার ৭৪৯ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। আর সরকারের তহবিল থেকে ১০ হাজার ২৩৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা সরবরাহ করা হবে। তবে প্রকল্প ব্যয় বাড়লেও সংশোধিত প্রস্তাবে ঋণ তিন হাজার ৭১২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা কমিয়ে দিয়েছে চীন। এতে বর্তমানে ২১ হাজার ৩৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ঋণের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির এক্সিম ব্যাংক। আর সরকারের তহবিল থেকে সরবরাহ করতে হবে ১৯ হাজার ৪৩ লাখ ৭৫ লাখ টাকা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, জমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি সংশোধন করতে হচ্ছে। আর চীন সরকার প্রকল্পটিতে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে খসড়া ঋণ প্রস্তাব পাঠিয়েছে দেশটি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) তা পর্যালোচনা করছে। এর পর সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে ঋণ প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হবে। সব ঠিক থাকলে আগামী মাসে ঋণচুক্তি সই হতে পারে। প্রেফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট হওয়ায় এক্ষেত্রে দেশটির নীতিমালা অনুযায়ী ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রকল্পটির জন্য জমি অধিগ্রহণ ব্যয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। প্রাথমিকভাবে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৮৫৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত আরডিপিপিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৬৯ কোটি আট লাখ টাকা। অর্থাৎ খাতটির ব্যয় বেড়েছে তিন হাজার ৩১৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আর ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ব্যয় বেড়েছে ১৬২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৬৬ কোটি ২২ লাখ টাকা, এখন যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২৯ কোটি দুই লাখ টাকা। এছাড়া পরামর্শক খাতের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা প্রাথমিকভাবে ধরা হয়েছিল ৯৪০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৯০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

এর বাইরে নির্মাণ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৯৫৯ কোটি, দর সমন্বয় খাতে ২৫১ কোটি ৫৪ লাখ ও অনিশ্চিত খাতে ১৬৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এ তিন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল যথাক্রমে ২৭ হাজার ৬৫২ কোটি ৫৭ লাখ, ২৯২ কোটি ৫৭ লাখ ও ১৯৫ কোটি টাকা। বর্তমানে নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৬১১ কোটি ৬২ লাখ, দর সমন্বয় ৫৪৪ কোটি ও অনিশ্চিত খাতে ৩৬২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তাকারী বিভিন্ন সরঞ্জাম সংগ্রহে ব্যয় বেড়েছে ১৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

সূত্রমতে, ঢাকা-মাওয়া-যশোর রেলপথ বিশ্বে সবচেয়ে ব্যয়বহুল। পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি রেল সংযোগ স্থাপনে এ প্রকল্পটি নেয়া হয়েছে। এজন্য ১৬৯ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ২৩২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এ ব্যয় দেশের চলমান যে কোনো রেলপথ নির্মাণের চেয়ে বেশি। এমনকি চীন বা ভারতের হাইস্পিড ট্রেনের জন্য রেলপথ নির্মাণের চেয়েও এ ব্যয় বেশি।

রেলওয়ের চলমান বা পাইপ লাইনে থাকা প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধরা হয়েছে দোহাজারি-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণে। ১২৯ কিলোমিটার এ রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর বর্তমানে চলমান আখাউড়া-লাকসাম ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন প্রকল্পের আওতায় ১৪৪ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৫০৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটাপ্রতি ব্যয় হবে ৪৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

এদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রচলিত রেলপথ নির্মাণব্যয় কিলোমিটারপ্রতি ১২-১৭ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে ফেব্রুয়ারিতে ভারতের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক শ্বেতপত্রে (হোয়াইট পেপার) এ তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া দেশটির মুম্বাই শহর থেকে আহমেদাবাদ পর্যন্ত ৫৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এক্ষেত্রে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ১১৮ কোটি টাকা।

এদিকে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিককালে প্রচলিত ধরনের রেলপথ নির্মাণ করছে না চীন। দেশটির প্রায় পুরোটাই হাইস্পিড রেলপথ। ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতির হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে চীন গড়ে ব্যয় করছে ৭৩-৭৫ কোটি টাকা। আর ঘণ্টার ৩৫০ কিলোমিটার গতির ট্রেন চালানোর উপযোগী রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় করছে গড়ে দুই কোটি ডলার বা ১৬০ কোটি টাকা।

সুত্র:শেয়ার বিজ

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।