ব্রিটিশ আমলের রেললাইন চলছে জোড়াতালি দিয়ে

ব্রিটিশ আমলের রেললাইন চলছে জোড়াতালি দিয়ে

হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী :

দীর্ঘ ২৮ ঘণ্টা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের পর সিলেট-ঢাকা রেললাইন সচল হয়েছে শুক্রবার রাত ৩টার পর থেকে। এদিকে সিলেট রুটে ঘন ঘন ট্রেন দুর্ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে সিলেট লাইনের সংস্কার, নিরাপদ যাত্রা ও সেবার মান উন্নয়নের জন্য স্থানীয় দাবি জোরদার হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত ৩টায় ফেঞ্চুগঞ্চে লাইন মেরামত হলে ট্রেন লাইন স্বাভাবিক হয়। রাত সোয়া ৩টায় সিলেট রেলস্টেশন থেকে আন্তঃনগর ‘উপবন’ এক্সপ্রেস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেলেও ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে সকাল ৬টায় ট্রেন ছাড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে। গতকাল সকাল সোয়া ৬টায় ‘কালনী’, সোয়া ১১টায় ‘জয়ন্তিকা’ সিলেট ছাড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে। সিলেট রেলস্টেশন ম্যানেজার খলিলুর রহমান এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা তেলবাহী ট্রেনের ২১টি বগির মধ্যে ১০টি বগি ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁয়ের গুতিগাঁওয়ে লাইনচ্যুত হলে তেল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। তবে গভীর রাতে উদ্ধার কাজ শুরু হয়।

এদিকে দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। রেলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা খাইরুল কবিরকে প্রধান করে গঠিত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। কমিটি শনিবার দিনভর দুর্ঘটনাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছে বলে ইত্তেফাককে জানান রেলওয়ের পরিবহন পরিদর্শক তৌফিকুল আজিম।

সোয়া শ বছরের পুরোনো লাইন : ব্রিটিশ আমলের সোয় শ বছরের পুরোনো সিলেট রেল লাইন আজো জোড়াতালির মধ্যে চলছে। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে। পুরোনো বগি, মান্ধাতা আমলের ইঞ্জিন ও সংস্কারের অভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। সিলেট-ঢাকা রেল পথের প্রায় স্থানে স্লিপার, পাথর, ফিস প্লেট, নাট-বল্টু, নেই। এসব দেখভালের জন্য গ্যাং খালাসি থাকলেও দায়িত্ব পালন না করার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সিলেট লাইনে ঘন ঘন দুর্ঘটনা ঘটছে। ব্রিটিশ আমলে ১৮৯১ সালে এ অঞ্চলে রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। লক্কড়ঝক্কড় কোচ আর প্রায় ১২৫ বছর আগে নির্মিত রেললাইনের কারণে এই রুটে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। রেল সূত্র জানায়, সিলেট-আখাউড়া রেলপথের ১৭৯ কিলোমিটারের মধ্যে ১৩টি সেতু মরণফাঁদ।

রেলওয়ের প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা গেছে, সিলেট-আখাউড়া সেকশনের ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলোর মধ্যে রয়েছে শমসেরনগর-টিলাগাঁও সেকশনের ২০০ নম্বর সেতু, মোগলাবাজার-মাইজগাঁও সেকশনের ৪৩, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর সেতু, কুলাউড়া-বরমচাল সেকশনের ৫ ও ৭ নম্বর সেতু, সাতগাঁও-শ্রীমঙ্গল সেকশনের ১৪১ নম্বর সেতু, শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সেকশনের ১৫৭ নম্বর সেতু, মাইজগাঁও-ভাটেরাবাজার সেকশনের ২৯নং সেতু এবং মনতোলা-ইটাখোলা সেকশনের ৫৬ নম্বর সেতু।

২০১৯ সালে সিলেট রেলপথে দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২১ যাত্রী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় নভেম্বরে। ঐ ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়। আহতের সংখ্যা শতাধিক। এর আগে ২০১৯ সালের ২৩ জুন, অর্থাত্ কসবার দুর্ঘটনার পাঁচ মাস আগে সেতু ভেঙে লাইনচ্যুত হয়ে পানিতে পড়ে যায় উপবন এক্সপ্রেসের একটি বগি। চার জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ঐ দুর্ঘটনায় আহত হন অন্তত ৬৪ যাত্রী।

রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগ সূত্র জানায়, প্রায় প্রতি মাসেই ঢাকা-সিলেট রেলপথের আখাউড়া-সিলেট অংশে এক বা একাধিক দুর্ঘটনা ঘটছে, এর বেশির ভাগই লাইনচ্যুতির ঘটনা। এর মধ্যে ২০১৯ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু লাইনচ্যুতির ঘটনাই ঘটেছে ৯টি। ঐ বছরের ১৬ মে ফেঞ্চুগঞ্জে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন, ২ জুন শায়েস্তাগঞ্জে কুশিয়ারা এক্সপ্রেস, ২০ জুলাই একই স্থানে কালনী এক্সপ্রেস, ১৯ জুলাই কুলাউড়ায় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, ৪ সেপ্টেম্বর ও ১৬ আগস্ট একই এলাকায় উপবন এক্সপ্রেস, ১৭ সেপ্টেম্বর ফেঞ্চুগঞ্জে জালালাবাদ এক্সপ্রেস, ৪ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জালালাবাদ এক্সপ্রেস, ২৯ ডিসেম্বর কুলাউড়ার বরমচালে একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। এছাড়া মুখোমুখি সংঘর্ষ ও সেতু ভেঙে বগি পানিতে পড়ে যাওয়ার পাশাপাশি একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও রয়েছে।

সূত্র:ইত্তেফাক, ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।