বাগেরহাট-পিরোজপুরে হচ্ছে না রেলপথ

বাগেরহাট-পিরোজপুরে হচ্ছে না রেলপথ

ইসমাইল আলী: বর্তমানে দেশের ৪৪টি জেলায় রেলের নেটওয়ার্ক রয়েছে। বাকি জেলাগুলো পর্যায়ক্রমে এ নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ২৫ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে রেলওয়ে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় নতুন রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিশদ নকশা প্রণয়নের কাজও শুরু করা হয়েছে। এমনই একটি প্রকল্প গোবরা থেকে পিরোজপুর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিশদ নকশা প্রণয়ন।
যদিও প্রকল্পটি মাঝপথেই বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে। এতে আপাতত রেলওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে না বাগেরহাট ও পিরোজপুর জেলা। তবে প্রকল্প গ্রহণের পর দেড় বছর পেরিয়ে যাওয়ায় বেশকিছু অর্থ অপচয় হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রকল্প শুরুতে নিলে অর্থ অপচয় হতো না। তবে যেহেতু কাজ শুরু হয়েছিল তাই শেষ করা উচিত ছিল।


সূত্রমতে, ‘গোবরা থেকে পিরোজপুর পর্যন্ত নতুন ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ এবং বাগেরহাট রেল সংযোগ স্থাপনে সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিশদ ডিজাইন’ শীর্ষক প্রকল্পটি একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) সভায় অনুমোদন করা হয় ২০১৯ সালের জুলাইয়ে। এর আওতায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গোপালগঞ্জের গোবরা থেকে বাগেরহাট ও পিরোজপুর দুটি জেলাকে রেলপথে যুক্ত করার মাধ্যমে খুলনা বিভাগের সঙ্গে বরিশাল বিভাগের যাতায়াত সুবিধা বাড়ত। এজন্য সম্ভাব্য কয়েকটি রুটও নির্ধারণ করা হয়।


সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিশদ ডিজাইন প্রণয়নে ব্যয় ধরা হয় ১০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। চলতি বছর জানুয়ারির মধ্যে এ সম্ভাব্য যাচাই শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে প্রকল্পটির কাজ বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকে। এতে গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি দাঁড়ায় মাত্র ২৮ শতাংশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত করার কথা ছিল। তবে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় তা আর হচ্ছে না।


সম্প্রতি রেলভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের পরামর্শের ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি (বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ), রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এক্ষেত্রে প্রকল্পটি যে অবস্থায় আছে সেখানেই বন্ধ করে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (আরডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে বলা হয়।
এ বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে আমি প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। তবে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে গেছে। এজন্য প্রকল্পের কার্যক্রম আপাতত বন্ধ।


যদিও এ সিদ্ধান্তটি রেলওয়ের জন্য ক্ষতিকর বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, প্রকল্পটির ব্যয় ১১ কোটি টাকারও কম। আর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে পরামর্শক নিয়োগ হয়ে গিয়েছিল। তারাও কাজ শুরু করেছিল। তাই সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন সম্পন্ন করা উচিত ছিল। এতে একদিকে যেমন অর্থের অপচয় হতো না, আবার পরবর্তী সময়ে যে কোনো সময় বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়েই রেলপথ
নির্মাণ শুরু করা যেত। তবে এখন আর সে সুযোগ থাকছে না। ভবিষ্যতে কখনও এ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিলে সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়নে পুনরায় প্রকল্প নিতে হবে।
রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা সলিমুল্লাহ বাহার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে রেলপথমন্ত্রী প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। তার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি যে অবস্থায় ছিল সেখানেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হবে। তাদের অনুমোদনের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক বন্ধ করা হবে প্রকল্পটি।


সূত্র জানায়, দেশের সব জেলায় রেলওয়ে সংযোগ চালু করতে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই নির্দেশনার আলোকে পিরোজপুর জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল। প্রকল্পটির জন্য প্রাথমিকভাবে দুটি রুট বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে গোবরা-ফকিরহাট-বাগেরহাট-পিরোজপুরের দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। এর মধ্যে আবার ফকিরহাট থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার রেলওয়ের পরিত্যক্ত এমব্যাংকমেন্ট রয়েছে। এ স্থানে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।
অন্য রুটটি গোবরা-মোল্লারহাট-নাজিরহাট-পিরোজপুরের দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার। তবে সমীক্ষার মাধ্যমে কোন রুটটি বেশি গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারণ করা হতো। রেলওয়ে রুট নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব যাতে কম পড়ে তার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়।


তথ্যমতে, পিরোজপুর এবং বাগেরহাট জেলা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এবং গোপালগঞ্জ জেলা মধ্য দক্ষিণে অবস্থিত। গোবরা টুঙ্গিপাড়া উপজেলার একটি ইউনিয়ন। টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জš§স্থান। এছাড়া বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ ইউনেস্কো হেরিটেজ। আর খুলনা-বাগেরহাট সেকশনে ৩২ কিলোমিটার মিটারগেজ লাইন ১৯১৬ সালে নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে রেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।


এদিকে পিরোজপুরের সঙ্গে বাগেরহাটের কোনো রেল সংযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে টুঙ্গিপাড়া ও বাগেরহাটে দর্শনার্থীরা আসেন বঙ্গবন্ধুর মাজার ও ষাটগম্বুজ মসজিদ পরিদর্শন করতে। এই লাইনটি নির্মিত হলে ভবিষ্যতে ভাঙা হয়ে বরিশাল-পায়রা সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের সঙ্গেও প্রকল্পটি সংযোগ হতে পারবে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই রেলপথটি নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। তবে আপাতত তা আর হচ্ছে না।

সূত্র:শেয়ার বিজ, ফেব্রুয়ারী ২৪, ২০২১

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।