নিয়ম না মেনে এমওইউ সই চীনা দূতাবাসের আপত্তি

নিয়ম না মেনে এমওইউ সই চীনা দূতাবাসের আপত্তি

ইসমাইল আলী:
ঘণ্টায় ট্রেন চলবে ২০০ কিলোমিটার গতিতে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগবে এক ঘণ্টার কিছু বেশি। এজন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড (দ্রুতগতি) রেলপথ নির্মাণ করতে চায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সম্প্রতি আগ্রহ দেখায় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন ইন্টারন্যাশনাল (সিআরসিসিআই)। গত ৬ নভেম্বর এ-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও সিআরসিসিআই। তবে নিয়ম না মেনে এমওইউ সই করায় তা নিয়ে আপত্তি তুলেছে চীনা দূতাবাস।
১৯ নভেম্বর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো এক চিঠিতে এমওইউটি বাতিলের জন্য অনুরোধ করে চীনা দূতাবাস। জিটুজি প্রকল্পে অর্থায়ন-সংক্রান্ত নীতিমালা এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে চিঠিতে। যদিও জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল সিআরসিসিআই। ইআরডির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও সিআরসিসিআইকেও চিঠির অনুলিপি দিয়েছে চীনা দূতাবাস।

ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে এমওইউ সই বিষয়ে মন্তব্য শিরোনামের এ চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা থেকে কুমিল্লা/লাকসাম হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে গত ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ে ও সিআরসিসিআই এমওইউ সই করেছে। এতে জিটুজি ভিত্তিতে চীনের অর্থায়নের কথা বলা হয়েছে, যা শুনে বাংলাদেশের চীনা দূতাবাস বিস্মিত।

সিআরসিসিআই চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। আর জিটুজি ভিত্তিতে চীনের অর্থায়নে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্য কোনো দেশকে প্রতিশ্রুতি প্রদানে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ার নেই।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের এমওইউ সই চীনের জিসিএল (জেনারেল কনসেশনাল লোন) ও পিবিসি (প্রেফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট) ঋণের গুরুতর লঙ্ঘন। নীতিমালা অনুযায়ী চীন সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর আগে কোনো দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দেশটির কোনো কোম্পানির এ ধরনের চুক্তির অনুমতি নেই।

চীন সরকার এ ধরনের এমওইউয়ের বৈধতা বা আইনগত স্বীকৃতি দেয় না। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এমওইউটি দ্রুত বাতিল করা হলেও এক্ষেত্রে জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে দুই দেশের স্বীকৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে চীন সরকার তা স্বাগত জানাবে।
জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুলনা করলে রেলের উন্নয়নে হাইস্পিডের বিকল্প নেই। সবচেয়ে বেশি যাত্রীচাহিদা থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটটি এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এজন্য এরই মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে রেলওয়ে। এর মধ্যে জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায় সিআরসিসিআই। তাদের অনুরোধেই দুই পক্ষ নন-বাইন্ডিং এমওইউ সই করে।

তিনি আরও বলেন, এমওইউ সইয়ের আগে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। আর ১৮ মাসের মধ্যে বিস্তারিত প্রস্তাব জমা দেওয়ার কথা ছিল কোম্পানিটির। দেশটির সরকারি অনুমোদন গ্রহণের জন্য এমওইউয়ের কপি সিআরসিসিআই নিজ উদ্যোগে চীনা দূতাবাসে জমা দেয়। তবে চীনের দূতাবাস আপত্তি তোলায় দ্রুতই এমওইউটি বাতিল করা হবে।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ নভেম্বর দৈনিক শেয়ার বিজে ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট: হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে আগ্রহী চায়না রেলওয়ে’ শীর্ষক প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে দুই পক্ষের স্বাক্ষরিত এমওইউ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

তথ্যমতে, চীনের অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলতি বছর ১ জানুয়ারি নতুন নীতিমালা প্রবর্তন করা হয়। এক্ষেত্রে কোনো প্রকল্পের ব্যয় ৩০ কোটি ডলারের কম হলে তা জিসিএলে বাস্তবায়ন করা হবে। আর ৩০ কোটি ডলারের বেশি প্রকল্প ব্যয় হলে তা পিবিসিতে বাস্তবায়ন করা হবে। আর পিবিসির ক্ষেত্রে বেশকিছু নতুন শর্ত নির্ধারণ করে গত ৩ মার্চ ইআরডিকে চিঠি দেয় চীনা দূতাবাস। গত ১২ নভেম্বর এ-সংক্রান্ত নীতিমালা সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে ইআরডি।

এতে বলা হয়, পিবিসির ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ নির্দেশনা রয়েছে। কারণ পিবিসি চীনের সরকারি সহায়তা নয়, বরং কিছু নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার শর্তযুক্ত ঋণ। অবকাঠামো নির্মাণ, জ্বালানি সম্পদ ও ম্যানুফ্যাকচারিং প্রকল্পের ক্ষেত্রে পিবিসি ব্যবহার করা যাবে। পিবিসি ঋণের ক্ষেত্রে চীনের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে হবে। ইলেক্ট্রিক ও চূড়ান্ত পণ্যের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬০ শতাংশ উপাদান চীন থেকে আমদানি করতে হবে। আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পের ক্ষেত্রে চীন থেকে কমপক্ষে ৩৫ শতাংশ পণ্য আমদানি করতে হবে।

পিবিসি ঋণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক চুক্তি মূল্যের ৮৫ শতাংশ সরবরাহ করবে চীন। আর বাংলাদেশ সরকারকে অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ অর্থ সরবরাহ করতে হবে। এ ঋণের সুদহার হবে দুই-তিন শতাংশ। গ্রেস পিরিয়ডসহ এ ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ২০ বছর। এক্ষেত্রে গ্রেস পিরিয়ড হবে সর্বোচ্চ সাত বছর। এছাড়া পিবিসির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে সভরেন (সার্বভৌমত্ব) গ্যারান্টি দিতে হবে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, পিবিসি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ইআরডি সাধারণ নির্দেশনা, প্রাথমিক আর্থিক প্রস্তাবনা ও সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন, নকশা, প্রকল্প অনুমোদন-সংক্রান্ত তথ্য, জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত তথ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য সম্পদ-সংক্রান্ত নথিপত্র, অর্থায়ন-সংক্রান্ত নথিপত্র প্রভৃতিসহ চীনা দূতাবাসের ইকোনমিক ও কমার্শিয়াল কাউন্সিলর অফিসে পিবিসি প্রকল্পের তালিকা পাঠাবে।

প্রকল্প অনুমোদনের পর সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে (এলটিএম) ঠিকাদার নিয়োগে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে দরপত্র আহ্বান করা হবে। আর সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণের ক্ষেত্রে ঠিকাদার নির্বাচন করে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে স্বাক্ষরিত এমওইউ অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীন সরকারের ঋণের সংস্থান করবে কোম্পানিটি। রেলপথটি নির্মাণে সব ধরনের সিভিল (পূর্ত) ও ইলেকট্রিক্যাল (বৈদ্যুতিক) কাজ বাস্তবায়ন করবে সিআরসিসিআই। আর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ ও ঋণ-সংক্রান্ত বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন গ্রহণে সব ধরনের ব্যবস্থা করবে রেলওয়ে। এছাড়া প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সিআরসিসিআইয়ের প্রতিনিধি দলকেও সহায়তা করবেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

ইআরডি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে কমপক্ষে ৪০০ কোটি ডলার ব্যয় হবে। তাই এটি চীনের পিবিসি ঋণের অন্তর্ভুক্ত হবে। তাই এক্ষেত্রে সরাসরি এমওইউ সই করে তার ভিত্তিতে প্রকল্প চূড়ান্ত বা ঠিকাদার নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই। তাই এমওইউটি বাতিল করতে হবে। আর প্রকল্পটিতে চীনের অর্থায়ন চাইলে ইআরডির মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে।

সুত্র: শেয়ার বিজ, নভেম্বর ২১, ২০১৮


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।