ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণ নিয়ে সড়ক ও সেতু বিভাগের দ্বন্দ্ব

ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণ নিয়ে সড়ক ও সেতু বিভাগের দ্বন্দ্ব

ইসমাইল আলী: ঢাকার যানজট কমাতে ২০ বছরে চারটি ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল (সাবওয়ে) নির্মাণ করতে চায় সেতু বিভাগ। এজন্য প্রাথমিক প্রস্তাব তৈরি করেছে সংস্থাটি। এদিকে ২০ বছরে ঢাকায় পাঁচটি মেট্রোরেল নির্মাণ করতে চায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এগুলোর কিছুটা হবে উড়ালপথে ও কিছুটা ভূগর্ভস্থ। এগুলোর রুটও চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাই মেট্রোরেল নির্মাণে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে একই মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়ক ও সেতু বিভাগের মধ্যে।

রাজধানীতে চারটি ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণ প্রস্তাব সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে সেতু বিভাগ। তবে এ বিষয়ে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক বিভাগের আওতাধীন ডিটিসিএর অনুমোদন গ্রহণে চিঠি দেয় পরিকল্পনা কমিশন। তবে এ প্রস্তাবে আপত্তি তোলে সড়ক বিভাগ। চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্যকেও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকায় যানজট কমাতে এর আগে কখনওই সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। এজন্য অপরিকল্পিত বিভিন্ন প্রকল্প এ শহরের যানজট কমাতে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখেনি। এজন্য সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী এ-সংক্রান্ত একক ক্ষমতা দিয়েছেন ডিটিসিএকে। যদিও সাবওয়ে নির্মাণে ডিটিসিএর অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এছাড়া রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী সেতু বিভাগ এটি নির্মাণ করতে পারে না। তাই এ প্রস্তাবে আপত্তি তুলেছে সড়ক বিভাগ।

গত ১৫ জানুয়ারি সেতু বিভাগে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠায় সড়ক পরিবহন বিভাগ। এতে ঢাকা মহানগরী বা অন্য কোথাও ভূগর্ভস্থ বা উড়ালপথে মেট্রোরেল নির্মাণে কোনো প্রকল্প গ্রহণ না করা বা সম্ভাব্যতা যাচাই না করায় সেতু বিভাগকে অনুরোধ করা হয়।

যদিও সড়ক বিভাগের এ চিঠিতে অসন্তুষ্ট সেতু বিভাগের সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে ঢাকার যানজট হ্রাসে ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার কোনো এখতিয়ার সড়ক বিভাগের নেই। এছাড়া সেতু কর্তৃপক্ষের আইনে ভূগর্ভস্থ সড়ক বা মেট্রোরেল নির্মাণের এখতিয়ার সেতু বিভাগের। তাই বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হবেন সংশ্লিষ্টরা।

যদিও রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ঢাকা মহানগরীতে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বলে উল্লেখ করা হয় চিঠিতে। এতে বলা হয়, মেট্রোরেল নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য এরই মধ্যে সড়ক বিভাগের অধীনে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। মেট্রোরেল আইন ২০১৫ ও বিধিমালা এবং কারিগরি স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন করা হচ্ছে। মেট্রোরেল আইন অনুযায়ী এটির নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে ডিটিসিএ।

ঢাকা মহানগরীতে সমন্বিত পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ২৯ আগস্ট আরএসটিপি অনুমোদন করা হয়েছে। এর আওতায় পাঁচটি মেট্রোরেল ও দুটি বিআরটি নির্মাণের জন্য রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। আরএসটিপিতে উল্লেখ নেই এমন কোনো প্রকল্প ডিটিসিএ’র অনুমোদন ছাড়া গ্রহণের সুযোগ নেই। ডিটিসিএ’র আইনে এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ২০১৪ সালের ২৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, উত্তরা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত মেট্রোরেল-৬ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। বিমানবন্দর সড়ক থেকে কমলাপুর এবং পূর্বাচল থেকে কুড়িল পর্যন্ত আরও দুটি মেট্রোরেলের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এর মধ্যে জাপানের সহায়তায় পূর্বাচল থেকে কুড়িল পর্যন্ত মেট্রোরেল পর্যন্ত নির্মাণে এমওডি সই করা হয়েছে। এ অবস্থায় ঢাকায় নতুন করে আর কোনো মেট্রোরেল নির্মাণের সুযোগ নেই। তাই এ-সংক্রান্ত কোনো প্রকল্প গ্রহণ না করার জন্য অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।

জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে রাজধানীতে সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান আরএসটিপির সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থা আছে কি না, তা জানতে ডিটিসিএ’র মতামত চাওয়া হয়েছিল। তবে সড়ক বিভাগ কেন এ প্রস্তাবে আপত্তি তুলেছে, তা স্পষ্ট নয়। বিষয়টি তারাই ভালো বলতে পারবে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক এ প্রসঙ্গে বলেন, ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের পাঁচটি জেলায় মেট্রোরেলের এখতিয়ার সড়ক বিভাগের। এজন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ডিটিসিএ’র অনুমোদন ছাড়া ঢাকায় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। তাই সেতু বিভাগের সাবওয়ে নির্মাণ প্রস্তাবে আপত্তি তোলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বছর ১৩ মার্চ রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে সড়ক পরিবহন বিভাগ, সেতু বিভাগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সাবওয়ে নির্মাণের দায়িত্ব সেতু বিভাগকে দেওয়া হয়। তবে তিন সংস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেন তিনি।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে সেতু বিভাগ। প্রস্তাবনামতে, প্রথম ধাপে দুটি সাবওয়ে নির্মাণ করা হবে। প্রথম সাবওয়ের প্রস্তাবিত রুট হল টঙ্গী থেকে বিমানবন্দর সড়ক হয়ে মহাখালী, মগবাজার, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে। পরে তা নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণ হবে। দ্বিতীয় সাবওয়েটির রুট প্রস্তাব করা হয়েছে আমিনবাজার থেকে কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, নিউ মার্কেট হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত।

সাবওয়ে-১-এর দৈর্ঘ্য হবে ৩২ কিলোমিটার। এটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২৬ কোটি ডলার। সাবওয়ে-২ দৈর্ঘ্য ১৬ কিলোমিটার। এটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮৭ কোটি ডলার। তবে বিস্তারিত সমীক্ষা সম্পাদনের পর এগুলোর প্রকৃত ব্যয় নিরূপণ করা হবে।

দ্বিতীয় ধাপে আরও দুটি সাবওয়ে নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে একটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে মিরপুর-১০, নেভি কলোনি, কাকলী, গুলশান-২, রামপুরা, খিলগাঁও, মতিঝিল হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত, পরবর্তী সময়ে যা ঝিলমিল পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। এটি সাবওয়ে-৩ নামে পরিচিত। চতুর্থ সাবওয়েটি হবে রামপুরা থেকে নিকেতন, তেজগাঁও, সোনারগাঁও হোটেল, পান্থপথ, রাসেল স্কয়ার, ধানমন্ডি-২৭, রায়েরবাজার, জিগাতলা, আজিমপুর, লালবাগ হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত।সুত্র :শেয়ার বিজ ,২২ জানুয়ারী ২০১৭

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।

Be the first to comment on "ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণ নিয়ে সড়ক ও সেতু বিভাগের দ্বন্দ্ব"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*