পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচল শুরুর সময়ও অনিশ্চিত

পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচল শুরুর সময়ও অনিশ্চিত

ইসমাইল আলী: ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে পদ্মা সেতু। আর একই দিনে গাড়ি ও ট্রেন চলাচল করবে সেতুতে। গত কয়েক বছর ধরে এমন কথাই বলা হয়েছে। যদিও চলতি বছর শেষ হচ্ছে না পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। এখন পর্যন্ত ৫৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে মূল অবকাঠামো নির্মাণের। আর ট্রেন চলাচলে সেতুতে রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরুই হয়নি। ফলে কবে নাগাদ পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচল শুরু হবে তা নিশ্চিত নয়।

সূত্রমতে, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ স্থাপনে ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এজন্য ২০১৬ সালের আগস্টে চায়না রেলওয়ে গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি সই করা হয়। জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এরপর প্রায় দেড় বছর পেরুলেও এখনও ঋণচুক্তি সই হয়নি।

চলতি অর্থবছর প্রকল্পটিতে বরাদ্দ ছিল সাত হাজার ৬০৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা। তবে চীনের ঋণ না পাওয়ায় তা কমিয়ে সংশোধিত বাজেটে ছয় হাজার ৫৮৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। তবে চীনের ঋণ না পেলে এ অর্থ ব্যয় হবে না। ফলে রেলওয়ের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন ৪৫ শতাংশ কম হবে বলে সম্প্রতি এক চিঠিতে জানান প্রকল্পটির পরিচালক।

যদিও চলতি মাসেই প্রকল্পটির ঋণচুক্তি সই হতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পটিতে সম্প্রতি সরকারি পর্যায়ে ঋণ অনুমোদন করেছে চীন। শিগগিরই দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেশে এসে পৌঁছবে। আর ফেব্রুয়ারিতে ঋণচুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি মাসে ঋণচুক্তি সই হলেও কবে নাগাদ অর্থ ছাড় হবে না নিশ্চিত নয়। ফলে মূল রেলপথ নির্মাণ কবে শুরু বা শেষ হবে তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিকভাবে ভাঙ্গা থেকে জাজিরা হয়ে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে মাওয়া পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এতে ফরিদপুরের সঙ্গে পদ্মা সেতুর ট্রেন সংযোগ চালু হবে। পরবর্তী সময়ে ভাঙ্গা থেকে যশোর ও মাওয়া থেকে ঢাকা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার ব্রড গেজ মেইন লাইন। চারটি সেকশনে ভাগ করে এর নির্মাণকাজ পরিচালিত হবে। এগুলো হলো রাজধানীর কমলাপুর-গেণ্ডারিয়া পর্যন্ত তিন কিলোমিটার, গেণ্ডারিয়া-মাওয়া পর্যন্ত ৩৭ কিলোমিটার, তৃতীয় পর্যায় মাওয়া-ভাঙ্গা জংশন পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার ও ভাঙ্গা-যশোর পর্যন্ত ৮৭ কিলোমিটার নির্মাণ করা হবে।

এর বাইরে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীসহ ৬৬টি মেজর ও ২২৪টি মাইনর সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ৯টি বড় সেতুর জন্য নদী শাসন লাগবে। এছাড়া এই রেলপথে একটি হাইওয়ে ওভারপাস, ২৯ পয়েন্টে লেভেল ক্রসিং ও ৪০টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটিতে প্রায় ২৩ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার ঢালাইকৃত রেলপথ (ভায়াডাক্ট) নির্মাণ করা হবে। পাথরবিহীন রেলপথ (ব্যালাস্ট লেস ট্র্যাক) তথা নতুন প্রযুক্তির এ রেলপথ দেশে প্রথম নির্মাণ করা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা সেতু পেরিয়ে মুন্সীগঞ্জের পথে এ অংশটি হবে উড়ালপথে।

ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা অংশে স্টেশন থাকবে ছয়টি। এগুলো হলোÑকেরানীগঞ্জ, নিমতলা, শ্রীনগর, মাওয়া, জাজিরা ও শিবচর। দ্বিতীয় পর্যায় ভাঙ্গা থেকে নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত অংশে নতুন আটটি রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এগুলো হলোÑভাঙ্গা জংশন, নগরকান্দা, মুকসুদপুর, মহেশপুর, লোহাগড়া, নরাইল, জামদিয়া ও পদ্মাবিল। এগুলোর বাইরে ঢাকা, গেণ্ডারিয়া, ভাঙ্গা, কাশিয়ানী, রূপদিয়া ও সিঙ্গিয়া স্টেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ঢাকা-ভাঙ্গা-যশোর রুটের এ রেলপথে ১২০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। রেলপথে ব্যবহার করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের ৬০ কেজির রেল। আর এ পথের এক্সেল লোড ধরা হয়েছে ২৫ টন। আর সেতু ও ভায়াডাক্টের এক্সেল লোড ৩২ টন।

রেলপথটি নির্মাণে প্রায় এক হাজার ৯৬৮ একর জমির প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে ২০০ একর সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতর ও ৬৮ হেক্টর সেতু কর্তৃপক্ষ থেকে নেওয়া হবে। অবশিষ্ট এক হাজার ৭০০ একর বেসরকারি খাত থেকে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে প্রকল্পটির জমি অধিগ্রহণ ও নকশা মূল্যায়নের কাজ চলছে। তবে কবে নাগাদ মূল কাজ শুরু হবে বা সেতুতে ট্রেন চলাচল শুরু করবে তা নিশ্চিত নয়। যদিও ২০১৮ সালেই একই দিনে ট্রেন ও গাড়ি চলাচলের ঘোষণা দিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মা সেতু বা এর রেল সংযোগের মতো বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে এভাবে সময় বেঁধে দেওয়া উচিত নয়। কারণ নির্মাণ শুরুর আগে ও নির্মাণকালে এসব প্রকল্পে নানা ধরনের সমস্যা আসবে। এতে কবে নাগাদ কাজ শেষ করে তা দিন-তারিখ নির্ধারণ করে বলা কঠিন। এর অন্যতম উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রানসিসকো-অকল্যান্ড বে ব্রিজ। এটি ২০০২ সালে শুরু করে ২০০৭ সালে শেষ করার কথা ছিল। ১০ লেনের এ সেতুটি নির্মাণে আরও ছয় বছর অতিরিক্ত লাগে। এতে ২০১৩ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয় সেতুটির।

পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে ২০১৮ সালে বলা হলেও এখনও অনেক বাকি রয়ে গেছে। এর ঠিকাদার চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি আরও ২৩ মাস অতিরিক্ত সময় লাগবে বলে কিছুদিন আগে এক চিঠিতে সেতু বিভাগকে বিষয়টি জানায়। এ হিসাবে ২০২০ সালের অক্টোবরে সেতুটি নির্মাণ সম্পন্ন হবে। আর রেলপথ এখনও নির্মাণ শুরুই হয়নি। তাই কবে পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলবে তা নির্ধারণ করাই সম্ভব নয়।

এদিকে গত ৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে পাঠানো চিঠিতে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের (সিআরইসি) সঙ্গে ২৭ হাজার ৬৫২ কোটি টাকার বাণিজ্যিক চুক্তি সই হয় ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট। এরপর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে সে বছর ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম দফা ও ২০১৭ সালের ১৯ আগস্ট সংশোধিত ঋণ প্রস্তাব চীনা দূতাবাসে পাঠানো হয়। ঋণচুক্তি স্বাক্ষর ত্বরান্বিত করার জন্য কয়েক দফা চিঠি ও আধা সরকারিপত্র (ডিও) দেওয়া হয়েছে। দুটি প্রতিনিধি দল চীন সফরও করেছে। উচ্চ পর্যায়ের আরেকটি দল চীন সফরে যাবে শিগগিরই।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের পর ওই লোন কার্যকর হয়ে চীনা এক্সিম ব্যাংকের অর্থ ছাড় হওয়াটাও দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। সেতু কর্তৃপক্ষের প্রকল্প কর্ণফুলী টানেলের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের এক বছরের বেশি সময় পর চীনা এক্সিম ব্যাংক অর্থ ছাড় করে। আর বেইজিংয়ের বাংলাদেশ ইকোনমিক কাউন্সিলরের পাঠানো ই-মেইল থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে, ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আরও অনেক প্রক্রিয়া অবশিষ্ট রয়েছে এবং ঋণচুক্তি সই কতটা দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হবে সে বিষয়ে নিশ্চিত নয় ইআরডি।

রেলওরে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, অর্থবছরের এখনও পাঁচ মাস বাকি আছে। ফেব্রুয়ারিতে চুক্তি সই হলে মার্চেই অর্থ ছাড় করা সম্ভব বলে আশা করি। এজন্য সংশোধিত এডিপিতে প্রকল্প বরাদ্দ রাখা কমানো হয়নি।

সুত্র: শেয়ার বিজ

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।