দৃশ্যমান হচ্ছে চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেলপথ

দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ: ১২৭ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে শুরু হচ্ছে নির্মাণ

 

শিপন হাবীব  :

অবশেষে বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে বহু আকাক্সিক্ষত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ। আগামী মার্চ থেকেই শুরু হবে কর্মযজ্ঞ। দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও ঘুমধুম রেললাইন প্রকল্পের আওতায় এর কাজ শুরু হবে। ২০২২ সালে কাজ শেষ হবে। প্রকল্পটি পর্যটন শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হবে।
এ প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারে তৈরি হবে ঝিনুকের আদলে দৃষ্টিনন্দন একটি রেলওয়ে স্টেশন। এই স্থাপনা ঘিরে গড়ে উঠবে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হোটেল, বাণিজ্যিক ভবন, বিপণিবিতান ও বহুতলবিশিষ্ট আবাসিক ভবন।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফিরোজ সালাহ উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর একটি। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী মার্চ মাসের শুরুতেই এর কাজ পুরোদমে শুরু হবে। জায়গা অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে। কাজ শেষ হলে শুধু দেশ নয়, বিদেশ থেকেও হাজার হাজার পর্যটক কক্সবাজার তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে জড়ো হবে। এ প্রকল্পে সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থাপনা হচ্ছে কক্সবাজার রেলওয়ে টার্মিনাল। ঝিনুকের আদলে মনোরম স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব নিদর্শন হবে টার্মিনালটি। ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের (টিএআর) সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এর মাধ্যমে পর্যটন শহর কক্সবাজার রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে। এর ফলে পর্যটন শিল্পের যেমন বিকাশ ঘটবে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যেরও। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, লাওস, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার রেলওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। পরে যশোর, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা হয়ে ভারত যাবে। আর তাতে বাংলাদেশের সঙ্গে তৈরি হবে ২৭টি দেশের রেল নেটওয়ার্ক। দীর্ঘ ১৭ বছর আগে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হলে জমি অধিগ্রহণসহ সব ধরনের ব্যয় কম হতো। ২০০০ সালে সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা, ২০১০ সালে ১ হাজার ৭৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল। বর্তমানে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ।
প্রকল্প পরিচালক মো. আজিজুর রহমান বলেন, ১২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ ও অবকাঠামোসহ নির্মাণ কাজে ভিন্নতা রয়েছে। পাহাড় ও আঁকা-বাঁকা পথে রেললাইন নির্মাণ হচ্ছে। অগ্রাধিকার ও দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের ১০টি মেগা প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এ প্রকল্পটি। প্রকল্পটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বাকি ৪ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। তিনি বলেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ৬১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ২০২২ সালে এ প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হবে। গত বছরের (২০১৬) ১৫ ডিসেম্বর টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে এর আগে পাহাড় ঘিরে এত দীর্ঘ রেলপথ তৈরি হয়নি। শুরুতে মিটারগেজ হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল। ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে মিটারগেজের পরিবর্তে ডুয়েলগেজ নির্মাণের নির্দেশনা দেন। তার নির্দেশনায় এ রেলপথ এখন ডুয়েলগেজ হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ উন্নয়ন প্রকল্প শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জানা যায়, এ প্রকল্পে কক্সবাজারসহ ১১টি রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ এবং ৫২টি বড় ও ১৯০টি ছোট সেতু এবং ১১৮টি লেভেলক্রসিং ও ২টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে। এছাড়া রামু ও আশপাশের রেলপথে বিশেষ ধরনের সেন্সর বসানো হবে। ফলে বুনোহাতি রেলপথে থাকলে চালক ওই এলাকা অতিক্রমের আগেই বুঝতে পারবেন।
১৮৯০ সালে ব্রিটিশ আমলে এ রেলপথটি নির্মাণের প্রথম পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরে ১৯১৭-১৮ সালের দিকে চট্টগ্রাম-দোহাজারী-রামু হয়ে আকিয়াব পযর্ন্ত সমীক্ষা চালানো হয়। ওই সময় প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণও করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাকি রেলপথ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। পরে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সরকার উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি। ১৯৭১ সালে জাপান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সার্ভিস (জেআরটিসি) সমীক্ষার উদ্যোগ নিলে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তাও আলোর মুখ দেখেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে এ রেলপথ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও এ লাইন নির্মাণের কোনো অগ্রগতি হয়নি। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেই এ লাইন নির্মাণে প্রতিশ্রুতি দেয়। পরে ২০১১ সালে ৩ এপ্রিল এর ভিত্তি স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সামসুল হক বলেন, কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন হলে পর্যটন খাতে আমূল পরিবর্তন আসবে, বাড়বে রাজস্ব আয়ও। ১৭ বছর পর একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়া দুঃখজনক জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এ প্রকল্পটিকে ‘অগ্রাধিকার প্রকল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন- এটা খুবই ভালো।
কক্সবাজার-টেকনাফ বাস-মিনিবাস মালিক গ্র“পের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ রফিকুল হুদা চৌধুরী বলেন, এ রেলপথ আরও দুই যুগ আগেই হওয়া প্রয়োজন ছিল। রেলপথ চালু হলে সড়ক পথে যাত্রী আরও বাড়বে। আমরাও চাই দ্রুত সময়ের মধ্যে এ পথে রেললাইন স্থাপন হোক।
এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পর্যটন খাতে বৈল্পবিক পরিবর্তন আসবে জানিয়ে কক্সবাজার হোটেল শৈবাল, পর্যটন কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়–য়া এই প্রতিবেদককে জানান, উন্নয়ন প্রকল্পটি সমাপ্ত হলে পর্যটন শহর কক্সবাজারে দেশী-বিদেশী পর্যটক বাড়বে বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৬০ হাজার পর্যটন কক্সবাজারে আসে।

সুত্র:২১ জানুয়ারি, ২০১৭,যুগান্তর

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।

Be the first to comment on "দৃশ্যমান হচ্ছে চট্টগ্রাম কক্সবাজার রেলপথ"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*