ঢাকা-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণ: ডিপি রেলের বিষয়ে খতিয়ে দেখছে ব্রিটিশ সরকার

ঢাকা-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণ: ডিপি রেলের বিষয়ে খতিয়ে দেখছে ব্রিটিশ সরকার

ইসমাইল আলী: ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণের লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠা ব্রিটেনের ডিপি রেলের। প্রতিষ্ঠানটির জনবল মাত্র ১১। এদের পরিশোধিত মূলধন ১০০ পাউন্ড, দেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার টাকা। রেলপথ নির্মাণের কোনো অভিজ্ঞতাও নেই ডিপি রেলের। নামসর্বস্ব এ প্রতিষ্ঠানটি ৬০ হাজার কোটি টাকায় ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মাণে আগ্রহী। এজন্য গত ডিসেম্বরে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়।

এ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর প্রতিবাদে সম্প্রতি লন্ডনের ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ডিপি রেলের বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।

ঢাকা-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণের কাজ পেতে নানা ধরনের তদবির করে যাচ্ছে ডিপি রেল

সূত্র জানায়, ডিপি রেলের বিরুদ্ধে গত ৫ জানুয়ারি প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি সংগঠন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে একটি প্রতীকী সমাবেশ করে। পরে এ-সংক্রান্ত স্মারকলিপি দেওয়া হলে ব্রিটিশ সরকার এ বিষয়ে একটি চিঠি ইস্যু করে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ১১ জানুয়ারি লন্ডনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ৫ জানুয়ারির চিঠির জন্য ধন্যবাদ। আপনি যে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন সেজন্য ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস দায়বদ্ধ। চিঠিটি সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে।

জানতে চাইলে রেলপথ সচিব মো. ফিরোজ সালাহউদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর দফতরের চিঠির বিষয়টি জানা নেই। তবে ডিপি রেলের সঙ্গে রেলওয়ের নন-বাইডিং এমওইউ করেছে। এটি বাস্তবায়নের কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই। তাই চাইলে যে কোনো পক্ষ যে কোনো সময় এটি বাতিল করতে পারে।

এমওইউ অনুযায়ী, ৭৫০ কোটি ডলার বা প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির নকশা প্রণয়ন, লাইন নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে ডিপি রেল। নির্মাণকাজে সহযোগিতা করবে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিআরসি)। আর এফডিআই পদ্ধতিতে এর অর্থায়ন সংগ্রহ করবে ডিপি রেল। যদিও কোম্পানিটির দরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।

চারটি যোগ্যতার ভিত্তিতে এক্সপ্রেসশন অব ইন্টারেস্টে (ইওআই) অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব বাছাই করা হয়। এগুলো হলো: অর্থনৈতিক ও কারিগরি সক্ষমতা, কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার, একই ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা ও কাজ করার মতো অভিজ্ঞ জনবল। এগুলোর কোনোটিই নেই ডিপি রেলের। এরপরও কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের সুপারিশ করে মূল্যায়ন কমিটি।

এদিকে ঢাকা-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণের কাজ পেতে নানা ধরনের তদবির করে যাচ্ছে ডিপি রেল। এমওইউ সইয়ের আগেই ডিপি রেলকে কাজটি দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে দুটি চিঠি দেওয়া হয়। প্রথম দফা চিঠি দেওয়া হয় ২০১৫ সালের ৭ জুলাই। ওই চিঠিতে ডিপি রেলকে কাজটি দেওয়ার জন্য পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মার্ক ক্লেটন।

ডিপি রেলের পক্ষে দ্বিতীয় দফা চিঠি দেওয়া হয় গত অক্টোবরে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত চিঠিটি পাঠান ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট মিনিস্টার ফর এভিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অ্যান্ড ইউরোপ লর্ড (তারিক) আহমেদ অব উইম্বেলডন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও নৌপরিবহনমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারকেও এর অনুলিপি দেওয়া হয়। পরে চিঠিটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এছাড়া এমওইউ সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাণিজ্যবিষয়ক দূত রুশনারা আলী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর লন্ডনে কোম্পানিজ হাউজে লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় ঢাকা-পায়রা রেল লিমিটেড (ডিপি রেল), যার নিবন্ধন নম্বর ০৮৮২০৯৭৩। কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের মূল্য দশমিক শূন্য ১ পাউন্ড বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ টাকার সমান। মোট ১১ জনবলের মধ্যে একজন কোম্পানি সচিব হিসেবে নিযুক্ত। বাকিরা সবাই পরিচালক। তাদের বেশিরভাগেরই নিয়োগ ২০১৬ সালের ২ এপ্রিল ও তার পরে।

পরিচালকদের মধ্যে আনিসুজ্জামান চৌধুরী নামে একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতও রয়েছেন। অন্যরা ব্রিটিশ নাগরিক। তারা হলেন চার্লস ককবার্ন, পিটার আইলস, ইয়ান ডার্বিশায়ার, ম্যাট স্টেইনার, ডরিয়ান বেকার, বিল রবার্টস, জুলিয়ান লিন্ডফিল্ড, টিম মিডোস স্মিথ, গ্রাহাম লরেন্স ও পল টুইডাল। ব্রিটেনের সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগাযোগ করে জানা যায়, এদের কারোরই ভালো কোনো ব্যবসায়িক বা পেশাদারি প্রোফাইল নেই।

তিন বছর বয়সী ডিপি রেলের ব্রিটেনে কোনো কর্মকাণ্ড নেই। প্রতিষ্ঠানটিকে তাই কার্যক্রমহীন বা ডরমেন্ট কোম্পানি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে ব্রিটেনভিত্তিক ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান এনডোলে। তারা বলছে, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের মধ্যে পাঁচজন সক্রিয়। এছাড়া একজন সক্রিয় কোম্পানি সচিব রয়েছেন। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে ডিপি রেলের আর্থিক বিবরণীতে দেখা গেছে, এ দুই বছরই কোম্পানির মূলধন ১০০ পাউন্ডে অপরিবর্তিত রয়েছে।

একই ধরনের তথ্য মেলে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রিটেনের কোম্পানি হাউজে জমা দেওয়া ডিপি রেল লিমিটেডের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকেও। সে প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি একটি ক্ষুদ্র কোম্পানি। এর মূলধন মাত্র ১০০ পাউন্ড। আর এ কোম্পানিটি জন্মের পর থেকে কোনো কাজ করেনি, ডরমেন্ট অবস্থায় ছিল এবং এর ১০০ পাউন্ডের মূলধন এক পেনি বা এক টাকা মূল্যের ১০ হাজার শেয়ারে বিভক্ত।

সুত্র:শেয়ার বিজ,১৭ জানুয়ারী ২০১৭

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।

Be the first to comment on "ঢাকা-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণ: ডিপি রেলের বিষয়ে খতিয়ে দেখছে ব্রিটিশ সরকার"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*