স্বপ্নের মেট্রো রেল

স্বপ্নের মেট্রো রেল

আপেল মাহমুদ :  পাকিস্তান আমলে যে শাহবাগ, ময়মনসিংহ রোড, ফুলবাড়িয়া থেকে রেললাইন তুলে নেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে সেখানে নতুন করে মেট্রো রেলের পথ স্থাপিত হচ্ছে। তবে সেটা মাটির ওপর ইস্পাত, পাথর আর কাঠখণ্ড দিয়ে নয়, কংক্রিটের পিলারের ওপর দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলবে স্বপ্নের রেলগাড়ি

উড়াল, পাতাল, আকাশ, চুম্বক কিংবা বৈদ্যুতিক রেলের স্বপ্ন দেখে আসছি যুগ যুগ ধরে। এসব ট্রেনে এক ঘণ্টায় ১০০ টাকা খরচ করে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছানের গল্পও আমরা বিভিন্ন মন্ত্রী-আমলার মুখ থেকে শুনেছি। এসব কথা শুনতে শুনতে শরীরে ঝিমুনি এসে গেছে। ঠিক তখনই আমাদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের ২৫ জুন উদ্বোধন করেছেন উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত মেট্রো রেলের মূল কাজ। এর খুচরা কাজগুলো প্রায় তিন বছর ধরে সম্পন্ন করা হয়েছে যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে। ২০২০ সালের মধ্যে এই যুগান্তকারী যোগাযোগব্যবস্থার ফল পাবে নগরবাসী। বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে সময় লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টা। মেট্রো রেল সেটা কমিয়ে আনবে ৪০ মিনিটে।

পৃথিবীর উন্নত দেশেগুলোতে মেট্রো রেল চালু হয়েছে অনেক আগে। কলকাতা মেট্রো রেল প্রকল্পের কাজের উদ্বোধন করেছিলেন ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, ১৯৭২ সালের ২৯ ডিসেম্বর, যা চালু হয় ১৯৮৪ সালের ২৪ অক্টোবর। ধর্মতলার এসপ্লানেড থেকে ভবানীপুর পর্যন্ত। এরপর কলকাতা মেট্রো রেলের পরিধি আরো বেড়েছে। এর আগে কলকাতাকে বলা হতো ভাগাড়ের শহর। ময়লা-আবর্জনা আর যানজটের কারণে অনেকেই কলকাতাকে এড়িয়ে চলতেন। কেউ সেখানে বেড়াতে গেলে নাকে-মুখে রুমাল চেপে পথ চলতেন। কিন্তু মেট্রো রেল চালু হওয়ার পর সেই পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। বর্তমানে কলকাতা একটি যানজটমুক্ত পরিচ্ছন্ন শহরে পরিণত হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় চলছে যানবাহন। শুধু মেট্রো রেলে চড়ার জন্যই অনেকে কলকাতায় বেড়াতে যান।

ধারণা করা হচ্ছে, ঢাকার অবস্থাও তেমনই হবে। আজ অনেকেই ঢাকা শহরের কথা উঠলেই বলে ওঠেন, ‘মোগল আমলের শহর হলেও ঢাকা যানজটের কারণে বড্ড বিরক্তিকর। ’ মেট্রো রেল চালু হলে সেই অপবাদটা আর থাকবে না। যানজটমুক্ত শহরে পরিণত হবে শহরটি। ফলে গতিশীল হয়ে উঠবে অলিগলি, পথঘাট, রাস্তা-ফুটপাত। নগরবাসীর প্রতিটি কাজকর্ম, চলাফেরা আর ঘোরাফেরায় নতুন করে প্রাণ ফিরে আসবে। বর্তমানের মতো ২৪ ঘণ্টা জীবনযাপনের মধ্যে ছয় ঘণ্টাই যানজটে আটকা পড়ে থাকতে হবে না। বাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে বসে অফিশিয়াল সময় পার করে বাসায় ফিরতেও হবে না। ২৬টি লেভেলক্রসিং স্পর্শ করবে না বলে মেট্রো রেল হয়ে উঠবে নগরবাসীর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

উপমহাদেশে প্রথম রেল চালু হয় ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল বোম্বাই থেকে থানে পর্যন্ত ২১ মাইল রেলপথে। বাংলাদেশ অংশ অর্থাৎ ভারতের রানাঘাট থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত ৩৩ মাইল রেলপথ চালু হয় ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর। ঢাকায় প্রথম রেলপথ চালু হয় ১৮৮৫ সালের ৪ জানুয়ারি, ৯ দশমিক ৩১ মাইল, ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ছিল সেই রেলপথ। ঢাকার ফুলবাড়িয়া ছিল জংশন স্টেশন, যা পাকিস্তান আমলে সরিয়ে ঢাকার পূর্বাঞ্চল নামে পরিচিত কমলাপুরে স্থানান্তর করা হয়। রেল কর্মকর্তাদের মতে, ফুলবাড়িয়া থেকে স্টেশন কমলাপুরে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্তটি ছিল আত্মঘাতী। শহরকে গতিশীল করার জন্য রেলের কোনো বিকল্প নেই।

যেদিন রেলগাড়ি আবিষ্কার হয়, সেদিন বিশ্ব হেসে উঠেছিল। অন্ধকারের জগৎ থেকে পৃথিবী উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে থাকে। রেলের চাকার সঙ্গে এগিয়ে যায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প বিপ্লব ও যোগাযোগব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি। জনশ্রুতি আছে, ইস্পাতের রেলপথ যেদিক দিয়ে গেছে, সেখানেই সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়ন হয়েছে। রেল আবিষ্কার না হলে মানুষকে আরো কয়েক শ বছর পিছিয়ে থাকতে হতো।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞের মতে, রেল ঢাকার প্রগতি বয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু নানা অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি আর পরিকল্পনাহীনতার কারণে সেটা তো হয়নিই, বরং এই ইস্পাতের পথটি নিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ফুলবাড়িয়া থেকে রেলস্টেশনটি সরিয়ে কমলাপুরে নিয়ে যাওয়া। বিষয়টিকে মাথা ব্যথার কারণে শিরশ্ছেদ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জাপান, ভারতসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মূল শহরের মধ্যমণিতে রেললাইন ও রেলস্টেশন গড়ে উঠেছে। মাকড়সার জালের মতো পুরো শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রেললাইন। অথচ ঢাকায় কয়েকটি ওভারপাস নির্মাণ করলেই উদ্ভূত সমস্যা সমাধান করা যেত। সেখানে তা না করে মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা হয়।

সাবেক রেল কর্মকর্তা এ কে তৌফিকুর রহমানের বিবরণ থেকে জানা যায়, শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া রেলপথটি পাকিস্তানি শাসকদের চোখে জঞ্জাল হিসেবে গণ্য হতে থাকে। তারা রেলপথ ও স্টেশনটি নগরীর পূর্ব দিকে স্থানান্তর করা নিরাপদ মনে করে। এ জন্য তাদের কমলাপুর, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর ও বাসাবোতে প্রচুর জমি অধিগ্রহণ করতে হয়, যা ছিল ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থায় মারাত্মক একটি ভুল পদক্ষেপ। ২০০৫ সালের দিকে রেললাইন সরিয়ে কমলাপুর থেকে গাজীপুরে স্থানান্তরের চেষ্টা হয়। অর্থাৎ ঢাকা থেকে রেলগাড়ি নির্বাসনে পাঠানোর একটি চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু শেষ  পর্যন্ত সেটি কার্যকর হয়নি।

 

ঢাকা থেকে রেলপথ নির্বাসনের সিদ্ধান্ত যে মারাত্মক ভুল ছিল সেটা শেষাবধি প্রমাণিত হয়েছে। নতুন করে মেট্রো রেলের পথ সম্প্রসারিত হচ্ছে উত্তরা থেকে মিরপুর, আগারগাঁও, খামারবাড়ী, সোনারগাঁও, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দোয়েল চত্বর, প্রেস ক্লাব, পল্টন হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত। পাকিস্তান আমলে যে শাহবাগ, ময়মনসিংহ রোড, ফুলবাড়িয়া থেকে রেললাইন তুলে নেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে সেখানে নতুন করে মেট্রো রেলের পথ স্থাপিত হচ্ছে। তবে সেটা মাটির ওপর ইস্পাত, পাথর আর কাঠখণ্ড দিয়ে নয়, কংক্রিটের পিলারের ওপর দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলবে স্বপ্নের রেলগাড়ি।

উত্তরায় মা-বাবার সঙ্গে বসবাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফারিয়া খান মুমু। মেট্রো রেল প্রকল্পে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘এক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যানজটের কারণে ঠিকমতো ক্লাস করতে পারছি না। মেট্রো রেল চালু হলে তিন ঘণ্টার পথ মাত্র ৪০ মিনেটে পাড়ি দিতে পারব। এর চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কী হতে পারে! বিশ্ব আজ কোথায় চলে গেছে, অথচ আমরা যুদ্ধ করছি যানজটের সঙ্গে ।

সুত্র:কালের কন্ঠ ,২৯ মার্চ ২০১৭

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।