দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ: ১২৭ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে শুরু হচ্ছে নির্মাণ

ইসমাইল আলী: ১৮৯০ সালে ব্রিটিশ আমলে প্রথম পরিকল্পনা করা হয় রেলপথটি নির্মাণের। সে বছর তদানীন্তন বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) রেলওয়ে চট্টগ্রাম থেকে রামু ও কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের জন্য সমীক্ষা পরিচালনা করে। পরেও কয়েক দফা সমীক্ষা করা হয় এ রেলপথ নির্মাণে। তবে সেগুলো আর আলোর মুখ দেখেনি। অবশেষে ১২৭ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে দোহাজারি-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ।

সোয়া শ বছরের বেশি আগে এ রেল যোগাযোগের বিষয়ে প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ কলোনি মিয়ানমার। ১৮৯০ সালে পরিচালিত প্রাথমিক সমীক্ষার ভিত্তিতে ১৯০৮-০৯ সালে রেলপথটি নির্মাণে বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনা করে বার্মা রেলওয়ে। পরে তা বাতিল করা হয়। চট্টগ্রামের সঙ্গে আকিয়াবের (মিয়ানমার) রেল সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে দোহাজারি থেকে রামু হয়ে আকিয়াব পর্যন্ত পুনরায় সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত পরিচালিত সে সমীক্ষার ভিত্তিতে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারি পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার মিটার গেজ রেলপথ স্থাপন করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাকি অংশ নির্মাণ সম্ভব হয়নি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার তিনটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু রেলপথ আর হয়নি। এরপর ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সরকার একবার উদ্যোগ নিলেও সফল হয়নি। সে বছর তদানীন্তন পূর্ব বাংলা রেলওয়ে চট্টগ্রামের দক্ষিণ দিক থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের জন্য সমীক্ষা পরিচালনা করে। আর স্বাধীনতার পর জাপান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সার্ভিস (জেআরটিএস) কর্তৃক লাইনটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে জেআরটিএস ১৯৭৬-৭৭ সালে এর তথ্য সংগ্রহের কাজ করে। তবে এর কোনোটিও বাস্তবের মুখ দেখেনি।

১৯৯২ সালে ইকোনমিক অ্যান্ড স্যোশাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (এসকাপ) কমিশন  অধিবেশনে সম্মতিপ্রাপ্ত এশিয়ার ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সম্পাদিত সমীক্ষায় ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের তিনটি ইউরো-এশিয়া সংযোগ রোডের সাউদার্ন করিডোরের অন্যতম রুট হয় এটি। ১৯৯৫ সালে এসকাপ কর্তৃক সাউদার্ন করিডোর-১ এর ওপর প্রাথমিক স্টাডি পরিচালনা করে। এর একটি রুট বাংলাদেশ হয়ে মিয়ানমার যাওয়ার কথা। তারপর অনেক দিন এ নিয়ে আর কথা হয়নি।

পরিকল্পনা করেও গত সোয়া শ বছরে কয়েক দফা ব্যর্থ হওয়ার পর বর্তমান সরকার আবারও মিয়ানমারের সঙ্গে রেলপথে যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আঞ্চলিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে এ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এজন্য চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে মিয়ানমার সীমান্ত গুনদুম পর্যন্ত প্রায় ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের জন্য ২০১০ সালে প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের খরচ ধরা হয় এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা ও মেয়াদ তিন বছর। ২০১০ সালের ৬ জুলাই অনুমোদিত এ প্রকল্পে এক হাজার ১৮২ কোটি ২৮ লাখ টাকা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। আর ৬৭০ কোটি সাত লাখ টাকা সরকারের তহবিল থেকে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও জমি অধিগ্রহণসহ মূল কাজ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাহ উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, সোয়া শ বছর আগে এ রেলপথ করার কথা ছিল। এতে বোঝা যায়, তখনও এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল। কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, এখন যেহেতু ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে, ভবিষ্যতে মিয়ানমারের আকিয়াব হয়ে তা চীন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তাই গুরুত্ব বুঝে নতুন করে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের অবস্থা: ২০১০ সালে এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়। ২০১১ সালের এপ্রিলে এর ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু রুট জটিলতা ও জমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তা আর শুরু করা যায়নি।

এতে নতুন করে প্রকল্পটির বিস্তারিত সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের কাজ করা হয়। এর ভিত্তিতে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এতে রুট কিছুটা পরিবর্তন করা হয়। এছাড়া পরিবেশ রক্ষা ও হাতির অভয়াশ্রম নষ্ট না করার সুপারিশও উঠে আসে। এডিবির পরামর্শে এজন্য নেওয়া হয় বেশকিছু সর্তকতামূলক ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩০৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। গত বছর শুরুর দিকে সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুমোদন করে সরকার।

বর্তমানে প্রকল্পটি দুই ভাগে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ভাগে নির্মাণ করা হবে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার। এর সঙ্গে ৩৯ দশমিক ২১ কিলোমিটার লুপ ও সাইডিং লাইন নির্মাণ করা হবে। আর দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে ২৮ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার রামু থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে। এর সঙ্গে লুপ ও সাইডিং লাইন রয়েছে ৩ দশমিক ৯১ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে ১৭২ দশমিক ৪২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে।

পাশাপাশি ৫২টি মেজর ও ১৯০টি মাইনর রেল সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ১১৮টি লেভেল ক্রসিং ও ২টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় হাতি চলাচলের জন্য পাঁচটি ওভারপাস নির্মাণ ও থারমাল ইমেজিং ক্যামেরা প্রযুক্তি প্রবর্তন করা হবে। রেলপথটি নির্মাণে এক হাজার ৭৪১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে।

প্রথমে মিটার গেজ রেলপথ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু এখন প্রকল্পটি সংশোধন করে ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দোহাজারি-কক্সবাজার-গুনদুম রুটে ১১টি রেল স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এগুলো হল: দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজরা, ইসলামাবাদ, রামু, কক্সবাজার, উখিয়া ও গুনদুম।

প্রকল্পটিতে ৬০ কেজির রেল ব্যবহার করা হয়। এছাড়া রেল সেতুগুলো ২৫ টন এক্সেল লোড বহন ক্ষমতাসম্পন্ন। প্রকল্পটির আওতায় পাঁচটি সেতু নির্মাণে নদী শাসন (সাংগু, টংকাবতী খাল, মাতামুহুরী, মুহুরী শাখা ও বাকখালী) করা হবে। রেলপথটির ডিজাইন গতি ধরা হয়েছে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার। রেললাইন ও সড়কের মধ্যে গ্রেড সেপারেশনের জন্য মোট ২টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে। এর ফলে এমব্যাংকমেন্ট এর উচ্চতা গড়ে ১৭ মিটার (কাটিং) ও ১১ মিটার (ফিলিং) হবে।

রেলপথটি নির্মাণে গত সেপ্টেম্বরে ১৫ কোটি ডলার বা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করে এডিবি। পরে এ-সংক্রান্ত ঋণ চুক্তি সই করা হয়।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, প্রকল্পটির জমি অধিগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এ কার্যক্রম চলছে। ঋণও পাওয়া গেছে। দ্রুতই রেলপথটি নির্মাণে ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি এর নির্মাণকাজ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।

উল্লেখ্য, রেলপথটি নির্মাণ হলে পর্যটননগরী কক্সবাজারে সরাসরি ট্রেনে যাতায়াত করা যাবে। এতে পর্যটকরা উৎসাহিত হবে, রেলওয়ের আয়ও বাড়বে। এছাড়া আন্তঃদেশীয় রেল নেটওয়ার্কে ট্রান্স-এশিয়ান করিডোরে যুক্ত হতে মিশিং লাইন অংশটুকুও নির্মাণ সম্পন্ন হবে। ফলে মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি ট্রেন সার্ভিস চালুরও সুযোগ তৈরি হবে।

সুত্র:শেয়ার বিজ , জানুয়ারি ১, ২০১৭

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।

Be the first to comment on "দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ: ১২৭ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে শুরু হচ্ছে নির্মাণ"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*