ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ: রেলের জমি হরিলুট উদ্ধারে বাধা

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ: রেলের জমি হরিলুট উদ্ধারে বাধা

শিপন হাবীব :

ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ ১৬ কিলোমিটার রেলপথ। এ পথের দু’পাশে রেলের জমি দখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্থাপনা। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও চিহ্নিত ভূমিদস্যুরা এসব স্থাপনা গড়ে তুলেছেন।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করেও তাদের জায়গা পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি। কারণ উদ্ধারে গেলেই হামলা-মামলাসহ নানা রকম বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাদের। এদিকে বেদখলে থাকা জমি বুঝে না পাওয়ায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজও এগোচ্ছে ধীরগতিতে।

জানা গেছে, এ রেলপথের দু’পাশে প্রায় ৮০ একর জায়গা বেদখল হয়েছিল। এরমধ্যে গত ১ বছরে প্রায় ৩০ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ৫০ একরের মধ্যে শুধু নারায়ণগঞ্জ শহরেই বেদখল ৪০ একর জমি। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের নেতৃত্বে উদ্ধার কাজে বাধা দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জে ভূমিদস্যুরা উদ্ধারকারীদের বিরুদ্ধে ৭০টি মামলা করেছেন। কোথাও কোথাও উদ্ধার হওয়া জায়গা পুনরায় দখলে নেয়া হচ্ছে। রেল কর্তৃপক্ষ সেসব ভূমিদস্যুর বিরুদ্ধে মামলা করলেও তাদের আটক করা হচ্ছে না।

বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ পরিদর্শন এবং এ পথে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প ঘুরে দেখেন রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। দিনব্যাপী পরির্দশন শেষে রেলপথমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে সাংবাদিকদের বলেন, খোঁজ নিয়ে জেনেছি, রেলের জমি দখলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও জড়িত। অবৈধ জমি যে কোনো মূল্যে উদ্ধার করা হবে। দলীয় নেতা কিংবা যে কোনো রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি, সস্ত্রাসী- কেউই ছাড় পাবে না। জমি উদ্ধারসহ দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কমলাপুর টিটিপাড়া থেকে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন পর্যন্ত লাইনের দু’পাশ ঘিরে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ শহরে ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত জয়নায় আবেদীন ওরফে আল জয়নালের বিরুদ্ধে রেলের জমি অবৈধভাবে দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের অপরাধে থানায় মামলা রয়েছে। ১ আগস্ট ঢাকা রেলওয়ে ভূ-সম্পদ বিভাগের কানুনগো ইকবাল মাহমুদ বাদী হয়ে এ মামলা করেন।

মামলায় বলা হয়, নারায়ণগঞ্জ জেলার সদর থানার চাষাড়া রেলস্টেশনের দক্ষিণে রেলওয়ের (খানপুর মৌজার আর এস ৮৪০নং দাগ) জমিতে একটি ৫ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন তিনি। আল জয়নাল ট্রেড সেন্টার নামে এ ভবনের কিছু অংশ উচ্ছেদ করা হলেও পুনরায় জয়নাল তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে নির্মাণকাজ করেন। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই জয়নাল যুগান্তরকে জানান, রেলওয়ের জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি জামিনে আছেন।

বুধবার রেলপথমন্ত্রী যখন নারায়ণগঞ্জে দিনব্যাপী রেলওয়ের জায়গা ও চলমান প্রকল্প পরিদর্শনে যান- তখন আল জয়নাল রেলপথমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রী তাকে কোনো সুযোগ দেননি।

রেলওয়ে ভূ-সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা আনোয়ারের নেতৃত্বে অবৈধ দখলদাররা একাধিকবার উচ্ছেদকারী কর্মকর্তাদের হুমকি এবং উচ্ছেদে বাধা দেয়। নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে মার্কেট এবং মনির হোটেল উচ্ছেদের সময়ও বাধা দেন তারা। এ বিষয়ে ঢাকা রেলওয়ের বিভাগীয় প্রধান ভূ-সম্পদ কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জমি দখলকারী আল জয়নাল, আনোয়ারসহ স্থানীয় প্রভাবশালীদের বাধায় নারায়ণগঞ্জে বহুবার উচ্ছেদ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দখলদাররা আমাদের বিরুদ্ধে প্রায় ৭০টি মামলা করেছে। পর্যায়ক্রমে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে বলে জানান তিনি।

নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ভূমিদস্যু আল জয়নালের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এখন থেকে কেউ উচ্ছেদে বাধা দিলেই মামলা করা হবে। গত ১ বছরে প্রায় ৩০ একর জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, রেলের জমি দখল নিয়ে একটি সন্ত্রাসী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে নারায়ণগঞ্জে। উচ্ছেদের খবর পেলেই তারা জড়ো হয়। বাধা সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে রেলের প্রায় ১৬ একর জায়গা দখল করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে। ওই জায়গায় কোয়ার্টার ছিল। সেখানে বসবাসকারীদের কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই ৫ অক্টোবর ৩২টি বাসা ও বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। পরে রেল কর্তৃপক্ষ সিটি কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে ২টি মামলা করে। বুধবার শহরের জিমখানা এলাকায় রেলের প্রায় ১০ একর জায়গায় অবৈধভাবে পার্ক নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেন খোদ রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান ভূ-সম্পদ কর্মকর্তা ইশরাত রেজা বলেন, রেলের জায়গা উদ্ধার করতে গেলেই সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যুরা রিট মামলা করে দেয়। আদালত স্থগিতাদেশ দেন। এতে করে বেদখলে থাকা রেলের জমি উদ্ধারে বেশ হিমশিম খেতে হয়। কিন্তু আমরা শত বাধা উপেক্ষা করেও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছি।

প্রকল্পের ধীরগতি নিয়ে ক্ষুব্ধ মন্ত্রী : ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের ধীরগতি নিয়ে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। ২০১৫ সালে নেয়া এ প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালের জুনে। পরবর্তীতে সময় বাড়িয়ে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত করা হয়। বর্তমানে প্রকল্পের কাজ হয়েছে ৫০ শতাংশের মতো। বুধবার চাষাড়া রেলস্টেশন সংলগ্ন প্রকল্পের অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মন্ত্রী জানতে চান, আগামী ৫ মাসের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাবে কি না।

কিন্তু প্রকল্প পরিচালক বা চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা সঠিক জবাব দিতে পারেননি। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো কর্মকর্তা বিড়বিড় করে বলছিলেন, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে না। আরও প্রায় ২ বছর লাগতে পারে। এমনটা শুনে মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে হবে।

সুত্র:যুগান্তর, ২৬ অক্টোবর ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।