শিরোনাম

ঢাকা-না’গঞ্জ রেলরুটে যাত্রী ভোগান্তি

ঢাকা-না’গঞ্জ রেলরুটে যাত্রী ভোগান্তি

 মনির হোসেন সুমন:
নানা কারণে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলরুটে যাত্রী বাড়ছে। প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার যাত্রী এ রুটে নিয়মিত যাতায়াত করছেন। যানজট ও দুর্ঘটনা এড়ানো ছাড়াও ভাড়া কম থাকায় রেলপথে যাত্রী বাড়ছে বলে ধারণা। তবে এ রুটে যাত্রী সেবার মান বাড়েনি। পদে পদে নানা ভোগান্তি পোহাচ্ছেন যাত্রী সাধারণ। পরিবহনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম রেলপথ। রেলপথে পরিবহনব্যয় কম। এ ছাড়া যানজট এড়াতেও রেলপথেই বেশি মানুষ চলাচল করে। এবং নিরাপদও মনে করে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও এই রেলের সেবার মান নিয়ে বরাবরই যাত্রী সাধারণ থেকে শুরু করে সকলেই অসন্তুষ্ট। দেশের যে কোন জেলার চেয়ে বেশি ট্রেন চলাচল করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে। এই রুটে চলাচলরত ডেমু ছাড়া বাকী সব ট্রেন বেসরকারি তত্ত্বাবধানে চলাচল করে। কিন্তু যাত্রীদের ভোগান্তির শেষ নেই এ রুটে।
সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন ব্যতিত এই রুটে সরকারি ও বেসরকারি ভাবে ১৬ জোড়া (সরকারি তিন জোড়া ডেমুসহ)ট্রেন চলাচল করে। নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে ঢাকা কমলাপুর রেলস্টেশনের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ও অরক্ষিত অবস্থায় চলছে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা ট্রেন সার্ভিস। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল লাইন ঘেঁষে গড়ে উঠেছে কাচাঁবাজার, ফলের দোকান, মার্কেটসহ অসংখ্য বস্তিঘর। নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন থেকে ছেড়ে প্রতিটি ট্রেন চাষাঢ়া, ফতুল্লা, পাগলা, শ্যামপুর, গেন্ডারিয়া হয়ে কমলাপুর যায়। ঢাকা-নারায়নগঞ্জ ১৮কিলোমিটার রেল লাইনের মধ্যে কমপক্ষে ৪৫টি অবৈধ রেল ক্রসিং আছে যেখানে কোন ব্যারিকেড ব্যবস্থা নেই। আর ১৩টি রয়েছে বৈধ রেল গেট। প্রথম স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ট্রেন এক একটা স্টেশনে এসে থামলে যাত্রীরা হুড়মুড়িয়ে উঠে। প্রতিটি ট্রেনে যে পরিমান যাত্রী ধারন ক্ষমতা তার চেয়ে কয়েকগুন বেশী যাত্রী চলাচল করে।
তাছাড়া টিকেট চেকও ঠিকমত হয় না। অনেকেই টিকেট ছাড়াই চলাচল করে। ফলে যাত্রী বহনের সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে চাষাঢ়া স্টেশন পর্যন্ত ২কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রেললাইন ঘেঁষে গড়ে উঠেছে কাচাঁবাজার, ফলের দোকান ও গামেন্টর্সের থান কাপড়ের টিনসেড মার্কেট। যখন রেল আসে তখন দোকানের বিক্রেতারা চিৎকার করে রেল লাইনের উপর থেকে মালামাল সরাতে থাকে। শহরের ১নং রেলগেট থেকে শুরু করে উকিলপাড়া ও শ্যামপুরের জুরাইন এলাকায় রেললাইন ঘেঁষে বসেছে বিশাল কাচাঁবাজার। কাচাঁবাজারের উপর অস্থায়ী খন্ড খন্ড ভাবে টানানো হয়েছে কাপড় ও পলিথিনের সামিয়ানা, আরো আছে গেঞ্জি ও ঝুটের দোকান। সরজমিনে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচল করে দেখা গেছে, সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগের অন্ত নেই। সবচেয়ে বেশী অভিযোগ রেলের ভাড়ার তুলনায় সেবার মান নিয়ে। সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটের ট্রেনে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ রুটে প্রতিদিন চলাচলকারী হাফিজ উদ্দিন জানান, এই রুটে দাঁড়িয়ে দ্বিগুণ যাত্রী চলাচল করতে পারে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা যেতে ৩৫ মিনিটের রাস্তায় মোট ৭টা স্টেশন। এই স্টেশনগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে যাত্রী উঠে।
তবে নারায়ণগঞ্জ থেকে কমলাপুর স্টেশনে ৩৫ মিনিটে পৌঁছার কথা থাকলেও ৪০ মিনিট কখনো ৪৫ মিনিট লেগে যায়। টাইমমত কখনো ট্রেন পৌঁছাতে পারে না। এবং নারায়ণগঞ্জেও আসতে পারে না। প্রায়ই লেট হয়। ঢাকায় চাকরি করা যাত্রী আল আমিনের অভিযোগ, স্টেশন না বাড়িয়ে যদি আরও কয়েকটা বগি বাড়িয়ে দিতো তাহলে যাত্রীদের কাজে আসতো। সকাল ১০ টা ৩৫ মিনিটের কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনে বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া ফারজানা মৌ অভিযোগ করে বলেন, যাত্রীর তুলানায় ট্রেনে সিট কম। দুই জনের সিটে তিন জন বসে যাচ্ছে। এছাড়া দাঁড়িয়ে এতো পরিমাণ মানুষ চলাচল করে যে ট্রেনের ভিতর পা ফেলার মত জায়গা থাকে না। প্রতিদিন ট্রেনে দাঁড়িয়ে, ঝুলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আমাদের যাতায়াত করতে হচ্ছে। সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনে পাগলা থেকে উঠা নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নওরিন আক্তার জানান, প্রতিদিনই এই রুটে চলাচল করি। বেশিরভাগ সময়ে দাঁড়িয়েই চলাচল করতে হয়। এছাড়া বেশি যাত্রী হলে বা ভিড় হলে সমস্যাতো হয়ই। যখন স্টেশনে ট্রেন থামে, তখন যে পরিমান যাত্রী ট্রেনে উঠে সেই হিসেবে তিনগুন যাত্রী দাঁড়িয়ে চলাচল করে। দুই সিটের আসনে ৩ জন করে বসে আর বাকিরা দাঁড়িয়ে চলাচল করে। এছাড়া ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলাচল, সেবার মান ও ট্রেনের বগি না বাড়িয়ে আরেকটি নতুন ষ্টেশন যুক্ত হওয়ায় এই রুটে চলাচলকারী যাত্রীদের ভোগান্তির মাত্রা যেন বেড়েই চলেছে।
এবিষয়ে কমলাপুরে কথা হয় বেসরকারিভাবে পরিচালিত ট্রেনের ইজারাদার এসআর ট্রেডিং এর সুপারভাইজার (ইনচার্জ) রফিকের সাথে। তিনি জানান, প্রতিদিন এই রুটে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার যাত্রী চলাচল করে। এই রুটে নানা সমস্যা আছে। তবে আমরা এ বিষয়ে জিআরপি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার বলেছি, তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি। নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার গোলাম মোস্তফা জানান, প্রতিটি ট্রেনে বগির সংখ্যা ৭টি। এর মধ্যে একটি বগিতে অর্ধেক যাত্রী ও অর্ধেক লাগেজের জন্য নির্ধারিত। আর ডেমু ট্রেনের বগির সংখ্যা তিনটি। প্রতিটি বগিতে আসন সংখ্যা হচ্ছে ৭০। আর ডেমু ট্রেনের প্রতি বগিতে বসতে পারে ৩৫ থেকে ৪০জন। তবে কি পরিমাণ যাত্রী চলাচল করে এই রুটে তার কোন সঠিক হিসাব নেই বলে জানালেন স্টেশন মাস্টার। তিনি জানান, এই রুটের বেশির ভাগ ট্রেন বেসরকারিভাবে চলাচল করে। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রায় চারগুণ যাত্রী নিয়ে চলাচলরত এই রুটের ট্রেনের সেবার মান না বাড়িয়ে বাড়ানো হয়েছে ষ্টেশন, যাত্রীদের এমন অভিযোগের ভিত্তিতে স্টেশন মাস্টার গোলাম মোস্তফা দাবি করেন, রেলের মান পূর্বে যেমন ছিল, বর্তমানেও তেমনই আছে। যাত্রীদের অভিযোগ, অন্যান্য রুটে ট্রেনের ভিতরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও ঢাকা নারায়ণগঞ্জ রুটের চলাচলরত ট্রেনের যাত্রীদের নিরাপত্তা নেই।
এ বিষয়ে স্টেশন মাস্টার বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট ভালো। বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণের জন্য, স্টেশন আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে রেলের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। রি-মডেলিং করা হবে। ডাবল লাইনের কাজ চলছে। চাষাঢ়া স্টেশনে এর জন্য শীঘ্রই ক্যাম্প করবে রেল কর্তৃপক্ষ। শীঘ্রই যাত্রীসেবা থেকে শুরু করে এই প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক মান উন্নত হবে।


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।