যেভাবে চালু হলো ভারতের প্রথম পাতাল রেল

যেভাবে চালু হলো ভারতের প্রথম পাতাল রেল

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

কলকাতার মেট্রো তথা পাতাল রেল করার স্বপ্ন দেখেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়। আর তা বাস্তবায়িত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রথম বাঙালি রেলমন্ত্রী বরকত গনি খান চৌধুরী। ১৯৭২ সালে পাতাল রেলের শিলান্যাস করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ঠিক ৯ বছর পর ভারতের রেলমন্ত্রী হিসেবে বরকত তার তিন বছর রেলমন্ত্রিত্বের আমলে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যান। কলকাতার পাতাল রেল হলো ভারতের প্রথম পাতাল রেল। তারপরে দিল্লি, মুম্বাই ও হায়দ্রাবাদে পাতাল রেলের কাজ শুরু হয়। দিল্লিতে পাতাল রেল চালুও হয়ে গিয়েছে।

কলকাতায় বর্তমানে গড়ে ৯ লাখ যাত্রী পাতাল রেল ব্যবহার করেন। তাই যানজট কিছুটা হলেও ঢাকার থেকে কম। বরকতের আমলে কাজ হয়েছিল টালিগঞ্জ থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত। ৩৪ বছর আগে বাঙালিরা কলকাতায় যে পাতাল রেলে চেপেছিল, এখন তা ৬টি লাইনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই ছ’টি লাইনের কাজ শেষ হতে আরো কয়েক বছর সময় লাগবে। ইতোমধ্যে ছ’টি লাইনের কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে বলে মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।

১৮৪৮ সালে লন্ডনে প্রথম পাতাল রেল চালু হয়। তার দু বছর আগে অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ প্রধান লর্ড ডালহৌসি ইংল্যান্ডের রাজাকে স্বহস্তে লেখা একটি চিঠিতে বলেছিলেন, যদি ভারতবর্ষ শাসন করতে হয়, তাহলে অবিলম্বে ভারতে রেল চালুু করতে হবে।

ব্রিটিশ সরকার তত্ক্ষণাত্ সে আর্জি মঞ্জুর করে। প্রথম রেলপথ চালু হয়েছিল কলকাতা থেকে হুগলী পর্যন্ত। ’৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসকরা এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়ে প্রায় ১০০ বছরে সারা দেশে যোগাযোগের জন্য রেল ব্যবস্থা চালুুু করেছিল। কলকাতা থেকে আফগানিস্তানের সীমান্ত পর্যন্ত ইঞ্জিন-চালিত ট্রেন চালানো হয়েছিল। এর পর ধীরে ধীরে বিদ্যুত্-চালিত ট্রেন শুরু হয়। কংগ্রেসের মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, সর্দার প্যাটেল, আবুল কালাম আজাদের মতো নেতৃত্ব সারা দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য রেলেই ভ্রমণ করেন।

এখন সে যুগ আর নেই। কলকাতায় অফিস টাইমে মেট্রো তথা পাতাল-রেল যে যাত্রী বহন করে তা এক অভূতপূর্ব নজির সৃষ্টি করে চলেছে। লন্ডনের টেমস নদীর তলা দিয়ে পাতাল রেল চলার ঘটনা অনেকেই জানেন। আর দু বছর পর যারা কলকাতায় আসবেন, তারা গঙ্গার তলা দিয়ে পাতাল রেলে চড়ে হাওড়া যেতে পারবেন। পাতাল রেলের সচিব এস আহমেদ বলেন, “কলকাতা থেকে গঙ্গার টানেলের কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। কলকাতা ও হাওড়ার দিকে প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ চলছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে যে পর্যটকরা আসেন, তারা একবার অন্তত পাতাল রেলে চড়ে শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে আসেন। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে পাতাল রেল। একই সঙ্গে ভারতে আরো একটি ট্রেন চালু হতে চলেছে। বুলেট ট্রেন। তবে অবশ্য সেটা মোদীর রাজ্য গুজরাটেই চলবে। লন্ডনে আছে ৪২টি লাইন। আর কলকাতায় আছে দুটি লাইন।

মেট্রো রেল প্রকল্পগুলো হলো, নোয়াপাড়া-এয়ারপোর্ট/নোয়াপাড়া-বরুনগর, নোয়াপাড়া-এয়ারপোর্ট বারাসত, জোকা-বিবাদী বাগ ডায়মন্ড পার্ক। নিউ গড়িয়া-দমদম বিমানবন্দর ও বরুনগর-বাবাকপুর-দক্ষিণেশ্বর, হাওড়া ময়দান থেকে সল্ট লেক পর্যন্ত ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো।

তবুও কলকাতার যানজট ঢাকার তুলনায় খুব কম নয়। গত ৬ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজত্বে ধনী আরও ধনী হয়েছে। পরিবারপিছু একটার বদলে তিনটে করে গাড়ি রয়েছে।

শুধু কি পাতাল রেল? সেই ’৮০-এর দশকের গোড়ায় গনি খান চৌধুরীর উদ্যোগে চক্র রেল চালু হয়েছিল। তারও একটা ইতিহাস আছে। কোনো একটি অনুষ্ঠানে প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও প্রধান কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ বিধান রায়ের এই স্বপ্নটি পূরণ করার আবেদন জানান। বরকত জনসভায় দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আপনাদের এই অনুরোধ আমরা ৯০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়ন করে দেব। এই কাজ করতে গিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল থেকে নানা বাধা পেয়েছিলেন। কিন্তু সে বাধা কাটিয়ে দিয়েছিলেন স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী। আমার মনে আছে, যেদিন তিনি সংসদে রেল বাজেট পেশ করার সময়ে চক্র রেলের প্রস্তাব উত্থাপন করেন, পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থিসহ বিরোধীরা উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন ভারতের রেলটাই যেন পশ্চিমবঙ্গে চলে যাচ্ছে। খবর পেয়ে জ্যোতিবাবু বামপন্থি নেতাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, এই উন্নয়নের কাজে বামপন্থিরা কেন বিরোধী বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে? ভবিষ্যতে এমন কাজ করলে তাদের আর মনোনয়ন দেওয়া হবে না। আর দু বছর পর যারা কলকাতায় আসবেন, তাদের বিমানবন্দর থেকে হাওড়া বা গড়িয়া যেতে ট্যাক্সিচালকদের কাছে আত্মসমর্পণ করে থাকতে হবে না। বরকত বলতেন, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ শুরু হলে, দেরি হলেও তা শেষ করা যায়। তাই কলকাতার পাতাল রেল এবং চক্র রেল করে তিনি প্রমাণ করে গেছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ শেষ করা যায়। সেই পথ ধরেই এগোচ্ছে এখন পাতাল রেল। ১০ হাজার কোটি টাকার উপর খরচ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত খরচ হবে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার ৪৫ শতাংশ আসছে জাপানের আর্থিক সহযোগিতায়— জাইকা থেকে।

একুশ শতকের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ঝুলন্ত বাসে উঠে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা করতে হবে না। এটাও বাঙালি তথা বাংলার লাভ।

সুত্র:ইত্তেফাক,০৩ জানুয়ারী, ২০১৮


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।