যাত্রীদের কাছে জবাবদিহি নেই রেলের, কথা শুনবে কে?

যাত্রীদের কাছে জবাবদিহি নেই রেলের, কথা শুনবে কে?

নাজমুস সালেহী:

যাত্রীদের ট্রেনের সমস্যা ও ভোগান্তির নানা বিষয় লিপিবদ্ধ করতে ব্রিটিশ আমল থেকে প্রতিটি যাত্রীবাহী ট্রেনে একটি করে ‌’অভিযোগ বই’ সরবরাহ করা হয়। যাতে যাত্রীরা তাদের সেবা সম্পর্কিত সব অভিযোগ সেখানে লিখতে পারেন। এবং সেগুলো দেখে রেল কর্মকর্তারা তা সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারেন। কিন্তু ট্রেনের প্রায় শতভাগ যাত্রীই সেই সেবা সম্পর্কে জানে না। সেই বইও এখন কোনো ট্রেনে আর চোখে পড়ে না। কোনো যাত্রী তা ব্যবহার করেছেন এমন যাত্রীও নেই। সেখানে লেখার কারণে কোনো সমস্যার সমাধান হয়েছে এমন কোনো নজিরও নেই। কিন্তু যাত্রীদের কাছে জবাবদিহিতার একটা ব্যাপার শত বছর আগেই ব্রিটিশরা চালু করেছিল। কিন্তু আজ তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ফলে যাত্রীরা তাদের ভালো-মন্দ কিছুই কোথাও জানাতে পারেন না। যাত্রীরা তাদের সমস্যার কথা যে বলবেন এমন কোনো পদ্ধতিও চালু নেই। ফলে কোথাও কোনো ব্যাপারে জানাতেও পারছেন না তারা। স্টেশন এলাকায় অভিযোগ বক্স থাকার কথা থাকলেও তা নেই। ফলে যাত্রীদের কথা রেল কর্মকর্তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না কোনোভাবে। যেন যাত্রীদের কথা শোনার কেউ নেই। যাত্রীদের কথা শোনার জন্য প্রতিটি যাত্রীবাহী ট্রেনে অভিযোগ বই থাকার কথা থাকলেও তা এখন বিলুপ্ত।

যাদের কাছে অভিযোগ বই সংরক্ষিত থাকে সেই ট্রেন ইনচার্জ বা পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে এসব বইয়ের সরবরাহ। কয়েকজন ট্রেন পরিচালকের সঙ্গে যেসব অভিযোগ বই সরবরাহ করা হয়, সেগুলোর কাগজ খুবই নিম্নমানের। ফলে লিখতে গেলেই তা ছিঁড়ে যায়। তাই অনেকেই তা রাখতে চান না। আবার এসব খাতা একটুও কাজে না লাগায় অধিকাংশ ট্রেনেই তা কর্তৃপক্ষও সরবরাহ করে না। কোনো কোনো গার্ড সাহেব তা সঙ্গে রাখলেও তাতে কিছু লেখা আছে কি না বা সে সম্পর্কে কোনো প্রশ্নও করে না কোনো রেল অফিসার, সুতরাং সেটা কেউ আর রাখতেও চায় না।

ট্রেনে ভ্রমণের সময় সিট ভাঙা, সিট হেলানো যায় না, এসি চলে না, সিট বসার অনুপযোগী, কেবিনের গেট অকেজো, পানিবিহীন ও অপরিচ্ছন্ন টয়লেট- এ রকম নানা সমস্যায় পড়তে হয় রেলযাত্রীদের। এসব সমস্যার তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও ভ্রমণ করতে হয় যাত্রীদের। প্রতিটি ট্রেনের সব শেষে থাকে ট্রেনের গার্ড বা পরিচালক তার কাছে থাকে এই বই। গার্ড কোচে গিয়ে যাত্রীরা তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় লিখে সমস্যার কথা লিখলে গার্ড পরবর্তী সময়ে তা হেডকোয়ার্টার্সকে জানাবে, পরবর্তী সময়ে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পদ্ধতি চালু রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়েতে।

নিয়মিত রেলযাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০০ শতাংশ যাত্রীই জানেন না অভিযোগ বই সম্পর্কে। কিভাবে নিজের সমস্যার কথা জানানো যায়,  তার ব্যবস্থাও আছে কি না এমন তথ্যও নাই অনেকের কাছে। নিয়মিত রেলভ্রমণ করেন এমন যাত্রীদের অভিযোগ, তাদের এই পদ্ধতি সম্পর্কে জানানো হয় না। অভিযোগ বইয়ের প্রচার প্রচারণা একেবারেই নেই। আবার যারা জানেন তারা গার্ড রুমে গিয়ে বই না পাওয়ার অভিযোগ করেন। আবার যারা অভিযোগ লিপিবদ্ধ করেন তারা জানান, কখনও তাদের মতামত মূল্যায়ন করা হয় না। লিপিবদ্ধ সমস্যার একটিও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় না ফলে অনাগ্রহ তাদের। অভিযোগকারীদের পরর্বী সময়ে ডাকা হয় শুনানিতে, সেই শুনানির পর তা বাস্তবায়ন হতে সময় লাগে দীর্ঘদিন। ফলে এটাতে বিব্রত হন অনেকেই। ফলে বিড়ম্বনার জন্য অভিযোগ করতে চান না কেউই।

তবে রেল কর্মকর্তারা দাবি করেন, তারা নাকি প্রতিটি ট্রেনেই অভিযোগ বই সরবরাহ করে থাকেন। এবং তা নিয়মিত তদারকি করা হয়। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত রেল কর্মকর্তারা স্বীকার করেন বিগত কয়েক বছরে একটিও অভিযোগ আসেনি। আসল ব্যাপারটি হলো অভিযোগ বইয়ের ব্যাপারে যাত্রীরা না জানায় কেউ এখানে অভিযোগ করেন না।
যাত্রীদের অভিযোগ প্রচার প্রচারণার অভাবে মানুষ এ সেবা সম্পর্কে ভালোভাবে জানে না। ফলে অকেজো হয়ে পড়েছে অভিযোগ বইয়ের মাধ্যমে সেবাদান পদ্ধতি। যাত্রীরা বিভিন্ন কারনে তাঁদের অভিযোগ জানাতে চান। তবে মোক্ষম কোনো উপায় না থাকায় যাত্রীরা কোনো পথ খুজে পননা। ফলে যাত্রীদের এক ধরনের ক্ষোভ কিন্ত রয়েছে রেলের যাত্রীসেবা নিয়ে কথা বলতে না পারার কারনে।

প্রতিটি ট্রেনেই রেলের মোবাইল নাম্বার, ই-মেইল ঠিকানা দেয়া থাকে এসবের মাধ্যমে সমস্যার কথা জানানোর কথা যাত্রীদের। তবে এসব মাধ্যমও কার্যকর নয়। এসব মাধ্যমে কেউ কেউ অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পান না তাই কোনো যাত্রীরও আগ্রহ নেই।

তবে সত্যিকার অর্থে রেল সেবা নিয়ে সরাসরি যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতে হলে, যাত্রীদের ভালোমন্দ বিবেচনা করতে হলে ১৩০ বছর আগে প্রবর্তিত ‘‘অভিযোগ বই’’ পদ্ধতিরই পরিবর্তন করে নতুন ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। পুরানো মান্ধাতা আমলের সেই পদ্ধতি আধুনিক যুগে অচল। যদি সেটা চালু থাকতো তবুও যাত্রীদের কিছু স্বত্ত্বি থাকতো। রেল যাত্রীদের কাছ থেকে সরাসরি সমস্যা শুনতে হলে একটি ওয়েবসাইট বানানো যেতে পারে। যেখানে যাত্রীরা তাদের সমস্যার কথা লিখবেন। কিংবা একটি অ্যাপ তৈরি করা যেতে পারে, সেখানে যাত্রীরা সমস্যার ছবি আপলোড করতে পারবেন ও লিখতে পারবেন।

এসব করা তখনই স্বার্থক হবে যখন এসব সমাধনে রেলওয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিবে। যত পদ্ধতিই প্রবর্তন করা হোক যদি তা বাস্তবায়ন না হয় তাহলে আর লাভ নেই। সেখান থেকে যদি মুক্তি না মেলে যাত্রীদের তাহলে কেউ নার লিখবেও না। তবে যাত্রীদের সমস্যা নিয়ে কোথাও বলার যায়গা নেই বলে যাত্রীরাও রেলের প্রতি ক্ষোভ পুষে রাখেন। আবার সমস্যাগুলোর কোনো সমাধানও হচ্ছেনা। যে যাত্রীর জন্য রেলের উন্নয়ন, রেলের সব প্রচেষ্টা সেই যাত্রীদের চাহিদামত সেবা দিতে তাদের কথা শোনার জন্য একটি মাধ্যম থাকা জরুরী। বিশ্বের সব দেশেই আছে সে পদ্ধতি। আমাদের রেলেও সংযুক্ত হোক নতুন কোনো আধুনিক পদ্ধতি। সেখানে যাত্রীরা লিখুক তাদের মনের কথা, সমস্যা সম্ভাবনার কথা। রেলও তাৎক্ষণিক তা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহন করুক। তবেই গড়ে উঠবে একটি জবাবদিহি রেল ব্যবস্থা, যাত্রীবন্ধব হবে বাংলাদেশের রেলপথ।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

সূত্র:কালের কন্ঠ,


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।