প্রথম রেলমন্ত্রীর প্রস্থান

প্রথম রেলমন্ত্রীর প্রস্থান

একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিকের নাম সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। প্রখর যুক্তিবোধ ও হাস্যরসে ভরা মানুষটিকে সংসদের কবি বললেও ভুল হবে না। বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশকে মূর্তচিত্রে রূপায়িত করার অমর শিল্পীর নাম সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনীতি, কোনো আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম কিংবা রামকৃষ্ণ মিশন নয়। রাজনীতি মানে জনগণের কল্যাণের দায়িত্ব নেয়া। তাই তো জাতীয় নির্বাচনগুলোয় জনতা তাঁকে বিমুখ করেনি। বরং অবিসংবাদিত জননেতা হিসেবেই বারবার নির্বাচিত করেছেন। অভিজ্ঞ এ পার্লামেন্টারিয়ান ৭১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেও সারা দেশের মানুষের কাছে তিনি রাজনীতির বরপুত্র হিসেবে থেকে যাবেন চিরকাল।

দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য এ রাজনীতিক ২০১১ সালে ৬৫ বছর বয়সে দেশের প্রথম রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একদিকে নতুন মন্ত্রণালয়, অন্যদিকে লোকবল সংকট, রেল ইঞ্জিন, কোচ ও সরঞ্জাম সংকটে থাকা রেলওয়ের সমস্যা বুঝতে মোটেও কষ্ট হয়নি প্রবীণ এ রাজনীতিবিদের। ১৯৯২ সাল থেকে প্রায় ১৯ বছর ধরে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে রেলওয়ে যে তার অধিকার ও সম্মান থেকে বঞ্চিত ছিল, তা বুঝতে সময় লাগেনি তাঁর। নিজেকে শেষ ট্রেনের যাত্রী হিসেবে চিহ্নিত করে নতুন মন্ত্রণালয়ের ‘রোডম্যাপ’ জনগণের সামনে তুলে ধরে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক মাসের মধ্যে তিনি মন্ত্রণালয়ের আগামী দিনের কাজের বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করেন। এর পর শুরু হয় তাঁর ‘জার্নি বাই ট্রেন’।

রেলের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করতে ছুটে চলেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। বাংলাদেশ রেলওয়েকে স্বনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে প্রথমেই তিনি রেলওয়েতে নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠা অর্থাত্ ট্রেনের সময়সূচির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন, ‘গরুর গাড়ির গতিতে নয়, রেল চলবে রেলগাড়ির গতিতে। তার দৃঢ় পদক্ষেপের কারণেই আন্তঃনগর ট্রেনগুলো সময়সূচি মেনেই ছাড়তে শুরু করে। ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা ৪০ থেকে ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়। এর পর তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে, নিরাপদ ও কম খরচে চলাচলের মাধ্যম হিসেবে অধিকাংশ মানুষের পছন্দের এ বাহনের টিকিট কালোবাজারি রোধে নতুন নিয়ম প্রবর্তন করেন। টিকিট কালোবাজারি রোধে ১০ দিনের পরিবর্তে তিনদিন আগে অগ্রিম টিকিট বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। এতে স্টেশনে ক্রেতাদের ভিড় বাড়লেও রাতারাতি টিকিট কালোবাজারি কমতে থাকে।

রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে তিনি পাঁচ মাসের মধ্যে ১২টি বন্ধ স্টেশনসহ মোট ১৫২টি স্টেশন চালুর উদ্যোগ নেন। রেলওয়ের গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে নিয়ে আসেন গতি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে চার জোড়া নতুন ট্রেন ও ঢাকা-জয়দেবপুর দুই জোড়া নতুন ট্রেন নির্ধারিত দিনই উদ্বোধন করে তিনি প্রকল্পের গতির প্রমাণ রেখেছিলেন, যা রেলওয়ের ইতিহাসে সত্যিই স্মরণীয়। রেলওয়ের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে রেলওয়ের বিশাল ভূসম্পত্তিকে রেলের অধীনে রেখে উত্পাদন বা আয়বর্ধনমূলক কাজে লাগাতে পরিকল্পনা নেন। পাশাপাশি রেলওয়ের মোট জমি কতটুকু, ব্যবহার হচ্ছে কতটুকু, দখল হয়েছে কী পরিমাণ এবং অবৈধ দখলে কী পরিমাণ জমি রয়েছে, তা নির্ধারণ করতে উচ্চপর্যায়ের একাধিক কমিটি গঠন করেন। এখানেই তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, জমি দখলমুক্ত করতে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রলি নিয়ে নিজেই উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্ব দেন।

শুধু তা-ই নয়, এখন রেলওয়েকে লোকসানি খাত হিসেবে চিহ্নিত করে অনেকেই যাত্রী ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব দিলেও তিনি ভাড়া বৃদ্ধি করেননি। কারণ বিজ্ঞ এ জনপ্রতিনিধি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন, সেবা বৃদ্ধি ছাড়া ভাড়া বৃদ্ধি করা সঠিক হবে না। তাই তিনি বলেছিলেন, ‘যত গুড় তত মিঠা।’ ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়েছিলেন জনগণের ওপর। কারণ এ দূরদর্শী ব্যক্তি জানতেন, সেবা প্রদান নিশ্চিতের মাধ্যমে জনসন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে ভাড়া বৃদ্ধির মতো সিদ্ধান্তেও জনগণের সমর্থন পাওয়া যাবে। এ লক্ষ্যে রেলওয়েকে ঢেলে সাজাতে তিনি রেলওয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে পদক্ষেপ নেন। যেমন— রেললাইন সম্প্রসারণ, বন্দর ও শিল্পকারখানার সঙ্গে রেলওয়ের সংযোগ স্থাপন, সড়ক, নৌ ও আকাশপথের সঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বয়, মিটার ও ডুয়াল গেজ লাইন নির্মাণ, পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও বগি সংযোজন, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি, রেলের কারখানাগুলোকে কার্যকর করাসহ সার্বিক সেবার মান বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নেন।

ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম অবশেষে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা মাথায় নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে ঘিরে দুই বছর ধরে কালো বিড়ালের পাঁচালি চলেছিল। কালো বিড়ালের থাবায় ক্ষত-বিক্ষত হলেও অদম্য থেকেছেন তিনি। সত্য প্রমাণিত হয়েছে তার আপন মহিমায়। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তরা আসলে ক্ষণজন্মা। চাইলেই একজন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বানানো বা তৈরি করা যায় না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত জাতীয় সংসদে সেরা পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে স্বমহিমায় প্রজ্বলিত থাকবেন। তাঁকে মনে রাখবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বাংলাদেশের সংবিধান এবং অবশ্যই বাংলাদেশ রেলপথ।

মো. আতিকুর রহমান,প্রকল্প কর্মকর্তা ,ডাব্লিউবিবিট্রাস্ট ।

সুত্র :বণিক বার্তা,ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০১৭

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।

Be the first to comment on "প্রথম রেলমন্ত্রীর প্রস্থান"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*