চলন্ত বিশ্ববিদ্যালয় !

চবি শাটল ট্রেন

পেরিয়ে গেছে অনেক বছর। বেড়েছে বিভাগ ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শাটলের ভিড়। তবু শুরু থেকে আজ অবধি শিক্ষার্থীদের কাছে সমান জনপ্রিয় এ শাটল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সুখ-দুঃখের সাথী শাটল ট্রেন ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা এলেই প্রথমে বলতে হয় শাটল ট্রেনের কথা। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়-বিশ্বের এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল নিজস্ব ট্রেন ব্যবস্থা আছে।

তবে কিছুদিন আগে সানফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শাটল ট্রেন বন্ধ করে দেয়। তাই বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) এককভাবে এর দাবিদার।
চট্টগ্রাম শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় চবি শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম শাটল ট্রেন। প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থী শাটল ট্রেনে যাতায়াত করে। শাটল ট্রেন আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যেন একে অন্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১৯৮১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় রুটে শাটল ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি কথা প্রচলিত আছে, চবিতে পড়বেন আর শাটলে চড়বেন না তা কি হয়!

শাটল ট্রেনের হুইসেলে জেগে ওঠে নিঝুমপুরী জ্ঞানের রাজ্য চবি ক্যাম্পাস। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ঝুপড়ি, ক্যান্টিন ও ক্যাফেটেরিয়াগুলোতে শুরু হয়ে যায় কর্মজীবী মানুষগুলোর কর্মব্যস্ততা। আর শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকে চাকসু থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঝুপড়ি, ক্যান্টিন, ক্যাফেটেরিয়া, প্রতিটি বিভাগ ও প্রতিটি অনুষদসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন।

ক্যাম্পাসমুখী সকাল সাড়ে সাতটা ও সকাল আটটার ট্রেনের পর শহরমুখী দুপুর আড়াইটা ও বিকেল চারটার ট্রেনে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে তিনগুণের বেশি শিক্ষার্থীকে শাটল তার বুকে পিঠে জায়গা করে দেয়।
রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে সিট ধরার এক প্রতিযোগিতার নাম এই শাটল। প্রেমিক যুগলের কাছে এক ঘন্টা যেন চরম চাওয়ার, পরম পাওয়া। মান অভিমান আর রোমাঞ্চিত হওয়ার এক অনন্য নাম শাটল। ’

ছাত্র-ছাত্রীদের কুশল বিনিময় থেকে শুরু করে পড়াশোনার আদ্যোপান্ত সবই হয় ট্রেনে বসেই। এ জন্য শাটলকে অনেকে ‘চলন্ত বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে থাকেন। শাটল ট্রেনে ওঠা মানেই চলন্তগানের মঞ্চে ওঠা। চলন্ত এ মঞ্চে প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন একেকজন শিল্পী। প্রতিটি বগির পিছনের অংশ চাপড়িয়ে গান গায় একদল আনাড়ি গায়ক। আর তাদের সঙ্গে মিনমিন করে সুর মেলায় কোনো দিন গান না গাওয়া লাজুক ছেলেটিও। শুধু গান গাওয়া নয়, কানে হেডফোন লাগিয়ে রবীন্দ্র, নজরুল সংগীত কিংবা কালজয়ী গান শুনতে শুনতে জানালায় মুখ দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। অন্যদিকে একদল মেতে থাকে জমজমাট আড্ডায়। আড্ডার বিষয়বস্তু রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে শুরু করে খেলাধুলা, সিনেমা, নাটক এবং ক্লাসের কোন মজার বিষয়।

তবে হুড়োহুড়ি করে উঠতে হয় শাটল ট্রেনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন দৃশ্য প্রতিদিনই চোখে পড়ে। শাটলে সিটধরা, সিট দেওয়া নেওয়া। সিট দেওয়া নেওয়া থেকে মন দেওয়া নেওয়ার ঘটনাও কম নয়। শাটলের বুকে যেমন রচিত হয় কোনো কপোত-কপোতীর প্রেমকাহিনি, তেমনি বহু প্রেমিক জুটির মনোমালিন্য ও বিচ্ছেদের সাক্ষীও এই শাটল।

অনেক সুখ স্মৃতি থাকলেও কঠিন বাস্তবতার তিক্ত বেদনা ভরা অনেক স্মৃতি আছে এই শাটলের। কেননা সদ্য গ্রাম থেকে ওঠে আসা দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের যে প্রতিনিয়িত ছুটতে হয় টিউশনিতে। বাবার কষ্ট কিছুটা লাঘব করতেই তাঁদের এ তিক্ত অভিজ্ঞতায় পা বাড়ানো। আবার কখনো কখনো প্রিয় এই বাহনে পড়ে ছাত্র রাজনীতির কালো থাবা, তখন ঝিমিয়ে পড়ে ক্যাম্পাস, বন্ধ থাকে ক্লাস পরীক্ষা বাড়ে সেশনজট।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে যে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ও ছাত্রমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এর উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো ঘটেছে শাটল ট্রেনকে কেন্দ্র করে। ২০০৬ সালে ট্রেনে উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে ট্রেনের চাকার নিচে প্রাণ হারান বাংলা বিভাগের ছাত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। এছাড়া ২০০৮ সালে ষোলশহর রেলস্টেশনে শাটল ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন অ্যাকাউন্টিং বিভাগের এক ছাত্র। পরবর্তীতে বিচ্ছিন্নভাবে একাধিক হত্যাকাণ্ডে নিহত হন রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন মাসুম, মার্কেটিং তৃতীয় বর্ষের হারুনুর রশীদ কায়সার ও অ্যাকাউন্টিং দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান। একসময় শাটল ট্রেন হয়ে পড়েছিল এক আতঙ্কের নাম। রাতে ট্রেনে করে যাতায়াত করতে নিরাপত্তাহীনতায় থাকত শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থায় শাটল ট্রেনে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ট্রেনের ইঞ্জিন ও বগিতে পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করেছে।

শাটলের বগি বৃদ্ধির ব্যাপারে অভিযোগ করে জান্নাত মিমি নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বগি কম থাকার কারণে প্রতিদিন আমাদের ছেলেদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে ট্রেনে চলাচল করতে হচ্ছে। যদি প্রশাসন বগি বাড়াতো তাহলে হয়তো এরকম কষ্ট করে আমাদের যেতে হত না। ’

শাটলের বগি বাড়ানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যে স্টেশন আছে সেখানে আটটি বগির বেশি দাঁড়াতে পারে না। বগি বাড়াতে হলে অতিরিক্ত লাইন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির দরকার। সেজন্য আমরা রেলমন্ত্রী ও চট্টগ্রাম রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এগুলো সরকারি কাজ তাই একটু সময় সাপেক্ষ ব্যাপার এবং অনেক ব্যয়বহুল। তবে আশা করছি সামনে এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া পাব। ’

লেখক: মোবারক আজাদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সুত্র:কালের কন্ঠ

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।