চক্ররেলের ইতিকথা

চক্ররেলের ইতিকথা

সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত :
কলকাতার পাতাল রেলের ইতিহাস সকলেই জানেন। জানেন বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় বেড়াতে আসা বহু মানুষ; কিন্তু কলকাতায় যে আরেকটি রেল আছে, সেটার ইতিহাস তুলনায় অনেক কম আলোচিত। এটির নাম চক্ররেল। যা কলকাতাকে ঘিরে রেখেছে। ভারতীয় রেল যেমন ১৮৫৩ সালে চালু হয় তার ১৩০ বছর পর চালু হয় কলকাতার চক্ররেল। এই চক্ররেলের যে কত প্রয়োজন তা প্রমাণ হয়ে গেল মরশুমি উত্সবে। বিশেষ করে দুর্গাপূজার ছুটির কদিন।

অবিভক্ত ভারতের রেলের জনক যদি হন লর্ড ডালহৌসি, তাহলে স্বাধীন ভারতে মেট্রো শহরগুলোর মধ্যে কলকাতায় চক্ররেল চালু করার জনক হলেন এক বাঙালি। ইতিহাসটা একটু লম্বা। সম্ভবত ১৯৮৩ সালে বজবজে একটি অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন এবং তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু প্রমুখ ছিলেন। অতুল্য বাবু তার বক্তৃতায় বলছিলেন, দেখ বরকত (তত্কালীন রেলমন্ত্রী আবু বরকত আতাউল গনি খান চৌধুরী) ডাক্তার বিধান রায় স্বপ্ন দেখেছিলেন কলকাতায় চক্ররেল চালু করবেন। সে অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদকও উপস্থিত ছিল।

প্রফুল্ল সেন ও জ্যোতি বসু দুই জনেই অতুল্য বাবুর কথায় সায় দিয়ে বললেন, চক্ররেলটা খুবই প্রয়োজন। রেলমন্ত্রী তার ভাষণে বললেন, আপনারা তিনজনই আমার গুরুজন। অনুরোধ করবেন না। হুকুম দিন। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি তিন মাসের মধ্যে আমি চক্ররেল চালু করে আমি ডাক্তার বিধান রায়ের স্বপ্নকে সফল করব। পরদিন দিল্লি ফিরে গিয়ে তিনি রেল বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করলেন। রেল বোর্ডের চেয়ারম্যান আপত্তি তুললেন। তিনি লিখিতভাবে জানালেন এ বাবদ খরচ হবে ৪০০ কোটি টাকা। এক টাকা রেলের নেই। রেলমন্ত্রী ছাড়ার পাত্র নন। তিনি তার গুরুজন এবং বাঙালিদের কথা দিয়েছেন। তিনি বাকি তিন সদস্যকে ডেকে পৃথকভবে কথা বললেন। তারা হিসেব-নিকেশ করে বললেন, লাইন আছেই। তা দিয়ে মালগাড়ি চলেও। ৪০ কোটি টাকা খরচ করে সে লাইন আপগ্রেড করে নিলে ওই লাইনে যাত্রীবাহী ট্রেনও চালানো সম্ভব। এই বাঙালি মন্ত্রী নাছোড়বান্দা। তিনি কাজ করবেনই; কিন্তু বাধ সাধল অর্থমন্ত্রক।

আমার মনে আছে অর্থ ও রেলমন্ত্রকের বিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসে। তখন রেল বাজেট সংসদে পেশ করার সময় এসে গিয়েছে। ভারতের সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী রেলমন্ত্রী বাজেট তৈরি করেন। প্রধানমন্ত্রী তা অনুমোদন করেন। এই দুইজন ছাড়া কারও দেখার সুযোগ নেই। দিল্লিতে কর্মরত বাঙালি সাংবাদিকরা দুই মন্ত্রকে ঘোরাঘুরি করছেন চক্ররেল হবে কি হবে না— সেই খবরের জন্য। এমন সময় রেল বাজেটের সঙ্গে নিজের হাতে লেখা একটি গোপনীয় নোট ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পাঠালেন বরকত সাহেব। তাতে তিনি লেখেন, আমি আপনার বাবা, জাতীয় নেতা জওহর লাল নেহরুর বন্ধু বিধানচন্দ্র রায়ের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য চক্ররেল করতে চেয়েছিলাম। এই অপরাধেই আপনার অর্থমন্ত্রী বারবার আমার ফাইল ফেরত পাঠিয়েছেন।

আমি রেল বাজেট পেশ করব না। আর আমি আগামীকালই কয়েকদিনের জন্য মালদহ যাচ্ছি। ইত্যাদি… ইত্যাদি। রাত ৮ নাগাদ দিল্লির প্রচণ্ড শীতে আমরা কয়েকজন বাঙালি রিপোর্টার তার আকবর রোডের বাড়িতে বসেছিলাম। ফোনটা আসতেই তিনি বললেন, এত রাতে কে বিরক্ত করছে? তিনি লাইনটা কেটে দিলেন। ২ মিনিটের মধ্যে আবার ফোন বেজে উঠল। এবার ধরলেন। প্রধানমন্ত্রীর সচিব ওপাশ থেকে বললেন, আপনি যদি এখনই না আসেন তাহলে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং আপনার বাড়িতে আসবেন। তাও তিনি অনড়। উপস্থিত বাঙালি রিপোর্টাররাও তাকে বোঝালেন। আপনার যাওয়া উচিত। তিনি আমাদের বলে গেলেন, আপনারা বসুন। আমি ১০ মিনিটের মধ্যে ঘুরে আসছি।

১০ মিনিট আগে যে বরকতকে দেখেছিলাম, তা পুরোই পাল্টে গেছে। ফিরে আসার পর বরকতের মুখে হাসির রেখা। ইন্দিরা গান্ধী বললেন, রেল বাজেটের সঙ্গে দেয়া নোটটা আমি পড়েছি। তোমার রেল বাজেট কি আমি সংসদে পেশ করব? কত টাকা লাগবে বল। ইন্দিরা ওই ফাইলে লিখে দিয়েছিলেন, কলকাতার চক্ররেলের জন্য এবারের বাজেটে ৪০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ করা হল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার ব্যক্তিগত সচিব দিলীপ বিশ্বাসকে ডেকে পাঠালেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, রেল বাজেট কোথায়? সচিব বললেন, স্যার নাসিকে ছাপাতে পাঠানো হয়েছে।

মন্ত্রীর নির্দেশ, এখনই নাসিক চলে যাও। আমার বক্তৃতার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে লিখে দেবে কলকাতায় চক্ররেল হচ্ছে। তিনি আরও বলে দিলেন, বহু বাধাবিপত্তি এবং ষড়যন্ত্র কাটিয়ে উঠে কলকাতায় চক্ররেল হচ্ছে।

তিন মাসের মাথায় কলকাতায় চক্ররেল শুধু শেষই হয়নি, তা বাণিজ্যিকভাবে চালুও হয়ে গিয়েছিল। সেই চক্ররেল এবারে পূজোর মরশুমে শহরতলী, শহরের চারপাশের লাখ লাখ মানুষকে পরিসেবা দিয়েছে। পূজোর আগে আগে যেহেতু কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ সেতু ভেঙে পড়েছিল তাই সেই জায়গা নিয়েছিল চক্ররেল ।

লেখক:ভারতীয় প্রবীণ সাংবাদিক
সুত্র:ইত্তেফাক

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।