শিরোনাম

রেলের ১৬৮০ গেটকিপারের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা!

রেলের ১৬৮০ গেটকিপারের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা!

।। ইসমাইল আলী ।। 
সারাদেশে লেভেল ক্রসিংয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই অবৈধ। এগুলোয় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এজন্য সারাদেশে ৬৫৪টি লেভেল ক্রসিং উন্নয়নে ২০১৫ সালে দুটি প্রকল্প নেয় রেলওয়ে। এগুলোর আওতায় এক হাজার ৬৮০ গেটকিপারও নিয়োগ দেয়া হয়। প্রকল্প দুটির মেয়াদ আগামী জুনে শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এক হাজার ৬৮০ গেটকিপার। আর প্রকল্প দুটি শেষ হলে অরক্ষিত হয়ে পড়বে ৬৫৪টি লেভেল ক্রসিং।

এদিকে গেটকিপারদের চাকরি গেলে লেভেল ক্রসিংগুলোয়ও ঝুঁকি বাড়বে। তাই প্রকল্প দুটি নিয়ে বিপাকে পড়েছে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে প্রকল্পের আওতায় নিয়োগকৃত গেটকিপারদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় রেলওয়ে। কারণ বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তা সম্ভব নয়। তাই চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আমরণ অনশনে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছেন গেটকিপাররা।

তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে রেললাইন রয়েছে তিন হাজার ৯৪ কিলোমিটার আর কর্মকর্তা ও কর্মচারী ২৬ হাজার ৪৪৯ জন। আর সারাদেশে দুই হাজার ৮৫৬টি লেভেল ক্রসিং থাকলেও তার মধ্যে রেলওয়ে দেখাশোনা করে এক হাজার ৪৫টি। এগুলোর মধ্যে আবার ৩৬২টিতে কোনো গেটকিপার নেই। এর বাইরেও লেভেল ক্রসিং আছে, যার সঠিক হিসাব নেই। সার্বিক বিবেচনায় ৮০ ভাগের মতো লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো গেটকিপার নেই, নিরাপত্তাও নেই।

এ অবস্থায় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের লেভেল ক্রসিংগুলোর পুনর্বাসন ও মানোন্নয়ন শীর্ষক দুটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয় ২০১৫ সালে। প্রকল্পের অধীনে পূর্বাঞ্চলে ৩২৮টি লেভেল ক্রসিংয়ের মানোন্নয়ন ও এক হাজার ৩৮ গেটকিপার দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৮২৯ জন নিয়োগ দেয়া হয়। আর পশ্চিমাঞ্চলে ৩২৬টি ক্রসিংয়ের মানোন্নয়ন ছাড়াও ৮৫১ অস্থায়ী গেটকিপার নিয়োগ দেয়ার কথা ছিল। সেখানে সব পদেই নিয়োগ দেয়া হয়।

এদিকে পূর্বাঞ্চলের লেভেল ক্রসিংয়ের মানোন্নয়ন প্রকল্পে শুরুতে বরাদ্দ ছিল ৪৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা। কয়েক দফা বাড়ানোর পর বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলে একই শিরোনামে নেয়া প্রকল্পটির জন্য শুরুতে বরাদ্দ ছিল ৪৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের মেয়াদও ২০২২ সালের ৩০ জুন শেষ হতে যাচ্ছে। এজন্য প্রকল্প দুটি চলতি অর্থবছর সম্ভাব্য সমাপ্য প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের হালনাগাদকৃত সম্ভাব্য সমাপ্য প্রকল্পের তালিকা থেকে এ দুটি বাদ দিতে চাইছে রেলওয়ে। এ নিয়ে একাধিকবার চিঠি চালাচালি করেছে রেলওয়ে ও পরিকল্পনা কমিশন।

এ প্রসঙ্গে সর্বশেষ চিঠিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের লেভেল ক্রসিং গেটসমূহের পুনর্বাসন ও মান উন্নয়ন’ ও ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের লেভেল ক্রসিং গেটসমূহের পুনর্বাসন ও মান উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প দুটি ২০১৫ সালের ২৫ জুন একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। মূল প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামো নির্মাণ এরই মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। পাশাপাশি একনেক সভার নির্দেশনাক্রমে পূর্বাঞ্চলে ৮২৯ ও পশ্চিমাঞ্চলে ৮৫১ জনকে গেটকিপার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।

প্রকল্প দুটি একনেকে অনুমোদনের সময় গেটকিপার নিয়োগে যথেষ্ট সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি প্রয়োজন বলে আউটসোর্সিংয়ের পরিবর্তে সরাসরি নিয়োগের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে প্রকল্প দুটির মেয়াদ আগামী জুনে শেষ হয়ে গেলে গেটগুলো শূন্য হয়ে পড়বে। তাই প্রকল্প দুটির আওতায় সংস্থানকৃত গেটকিপারদের জন্য রাজস্ব খাতে পদ সৃজন ও স্থানান্তরের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, অর্থ বিভাগের আইন অনুযায়ী জনবল রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের কোনো সুযোগ নেই।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পদ সৃজন করে গেটকিপারদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের প্রস্তাব আবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে রেল মন্ত্রণালয়ের প্রেরিত প্রস্তাবনা সংশোধনের জন্য ২০২১ সালেরর ১১ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব করা হয়। বর্তমানে তার সংশোধন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রকল্পের আওতায় নিয়োগকৃত গেটকিপারদের বিভাগীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পদায়ন করা হয়েছে। আর রেল দুর্ঘটনা প্রতিরোধসহ ট্র্যাক সুরক্ষা ও ট্রেন পরিচালনায় সহায়ক ভূমিকার কারণে গেটকিপার অপরিহার্য। তাই প্রকল্প সমাপ্ত হলেও তাদের দ্বারা কাজ চালিয়ে নেয়া প্রয়োজন। আর অধিকাংশ নিয়োগকৃত গেটকিপারের চাকরির বয়স তিন বছর পেরিয়ে গেছে। তাই তারা অস্থায়ীভাবে কাজ করলেও গেটকিপারের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করেছেন।

এ অবস্থায় গেটকিপারদের চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলে ট্রেন পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হবে। আবার পুনর্বাসন/মান উন্নয়নকৃত গেটগুলোর জন্য নতুন পদ সৃষ্টিসহ আবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা প্রয়োজন হবে। তবে এতে চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যাবে না। তাই দুই প্রকল্পের আওতায় পূর্বাঞ্চলে এক হাজার ৩৮টি ও পশ্চিমাঞ্চলে ৮৫১টি গেটকিপারের পদ রাজস্ব খাতে সৃষ্টি ও বিদ্যমান জনবলকে আইনের ধারা প্রমার্জনপূর্বক রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সার-সংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানোর কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের আগ পর্যন্ত প্রকল্প দুটিতে নিয়োজিত গেটকিপারদের দ্বারা কাজ চালিয়ে নিতে হবে। তাই প্রকল্প দুটি আগামী জুনে শেষ করা হচ্ছে না। এজন্য চলতি অর্থবছর সম্ভাব্য সমাপ্ত প্রকল্পের তালিকা থেকে প্রকল্প দুটি বাদ দিতে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।

জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদার শেয়ার বিককে বলেন, গেটকিপার রেলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদ। তাই প্রকল্প দুটিতে নিয়োজিত গেটকিপারদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুমোদন গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। এজন্য আপাতত জুনে প্রকল্প দুটি শেষ করা হচ্ছে না। আশা করা যায়, দ্রুতই এ সমস্যা সমাধান করা যাবে।

সূত্রঃ শেয়ার বিজ


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।