নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ট্রেন পরিচালনার সামর্থ্য আছে

নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ট্রেন পরিচালনার সামর্থ্য আছে

নুরুল ইসলাম সুজন। রেলপথমন্ত্রী

ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট। ৩৩ বছর কাটিয়েছেন আইন পেশায়। পঞ্চগড়-২ আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত। রেল নিয়ে ভাবনা ও পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন বণিক বার্তার কাছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামীম রাহমান

এই মুহূর্তে রেলওয়ের কোন জায়গাটাতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?

যাত্রীসেবা। রেলওয়ের প্রধান কাজ যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। মানুষ যেন স্বস্তিতে, স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারে, সেটিই আমার মূল লক্ষ্য। এজন্য প্রয়োজনীয় রেলপথ, উন্নত কোচ-ইঞ্জিন দরকার। রেল খাত দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। সংস্কারের অভাবে লাইনগুলো অকেজো হয়ে যাচ্ছে। পুরনো কোচ-ইঞ্জিনে যাত্রীসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। ত্রুটি রয়েছে সিগন্যালিং ব্যবস্থায়ও। সবার আগে এই চিত্রটি আমি বদলাতে চাই। নিরাপদ, সহজ, সুলভ ও দ্রুত যাতায়াত—এই ব্যবস্থাগুলো সবার আগে করতে হবে। এই কাজটি ঠিকমতো হলে তারপর চেষ্টা করব রেলের সম্পদগুলো কাজে লাগানোর। শুধু বাণিজ্যিক কার্যক্রমই নয়, দাতব্য ও সেবামূলক কাজেও রেলের সম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা আমাদের আছে।

৮০টির বেশি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলছে। এই ধারা বন্ধে আপনার ভূমিকা কী হবে?
যে ট্রেনগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলছে, তার সবক’টিই আমি মন্ত্রণালয়ে যোগ দেয়ার আগে লিজ দেয়া। লোকবলের অভাবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেয়া হয়েছিল। আমি এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। এজন্য পরিকল্পনা করছি, যে ট্রেনগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলছে, চুক্তি শেষ হওয়ার পর সেগুলো রেলওয়ের মাধ্যমে চলবে। নতুন করে কোনো ট্রেন লিজ দেয়া হবে না।

ঢাকা-জামালপুর রুটে একটি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

ঢাকা-জামালপুর রুটে একটা ট্রেন বেসরকারি খাতে দেয়ার কথাবার্তা চলছিল। আমি এটার সঙ্গে যুক্ত হতে পারিনি। আমি চাই না বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নতুন কোনো ট্রেন পরিচালিত হোক। আমি মনে করি, নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেই ট্রেন পরিচালনার সামর্থ্য রেলওয়ের আছে। আমরা চেষ্টা করছি, সেই সামর্থ্য আরো বাড়ানোর।

সড়ক নয়, রেলপথনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়তে পাঁচ বছরে কী উদ্যোগ নেবেন?
আগামী পাঁচ বছরে আমাদের লক্ষ্য হবে, সব জেলায় ট্রেন নিয়ে যাওয়া। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ হচ্ছে। আরেকটি প্রকল্পে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে দ্রুতগতির (হাইস্পিড) ট্রেন চলাচলের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। শুরুতে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে দ্রুতগতির ট্রেনের চিন্তাভাবনা ছিল। পরে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে এটিকে কক্সবাজার পর্যন্ত নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে যশোর পর্যন্ত নতুন রেলপথ তৈরি হচ্ছে। ভাঙ্গা থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত নতুন রেলপথ বানানো হচ্ছে। এই কাজগুলো হাতে আছে। পাশাপাশি বিদ্যমান মিটার গেজ লাইনগুলো ব্রড গেজে রূপান্তর হচ্ছে। নতুন স্টেশন বানানোর পাশাপাশি বন্ধ স্টেশন চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আধুনিক ও যুগোপযোগী ব্যবস্থাপনায় স্টেশন পরিচালনার পরিকল্পনা হচ্ছে। জরাজীর্ণ স্টেশন ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছি। ক্যাটারিং সার্ভিসের উন্নয়ন, উন্নত কোচ-ইঞ্জিন সংগ্রহসহ সবদিকেই আমাদের নজর আছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে পাঁচ বছরে রেলওয়ের চেহারা বদলে যাবে।

রেলপথে পণ্য পরিবহনকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন?
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর ও ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পণ্য পরিবহন হচ্ছে। এই রুটে বছরে লক্ষাধিক কনটেইনার পরিবহন করা হয়। তবে কনটেইনার রাখার সমস্যা রয়েছে। এ কারণে আমরা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আরো কনটেইনার পরিবহন করতে পারছি না। আমরা জয়দেবপুর বা ঢাকার আশপাশে জায়গা খুঁজছি, যেখানে কনটেইনার রাখার ব্যবস্থা করা হবে। কমলাপুরে যে জায়গা আছে, তাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কনটেইনার রাখা সম্ভব হয় না। নতুন জায়গা পেলে কনটেইনার পরিবহন বাড়ানো হবে। ভারতের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যেও ট্রেন যেন প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারে, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্যও নতুন ট্রেন চালু করা হচ্ছে।

দক্ষ ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাব—রেলের একটা বড় সমস্যা। জনবল সংকট কাটাতে আগামী পাঁচ বছরে আপনার পরিকল্পনা কী?
জনবল তো আর এমনিতে দক্ষ হবে না, কাজ করতে করতে দক্ষতা বাড়বে। পাশাপাশি প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। আজকে যে লোকটাকে নিয়োগ দিলাম, সে তো প্রথম দিন থেকেই দক্ষ হবে না। অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়েই সে দক্ষ হয়ে উঠবে। দক্ষ জনবলের পাশাপাশি জনবলের বেশ ঘাটতি আছে রেলওয়ের। অচিরেই প্রায় ২০ হাজার লোক আমরা রেলওয়েতে যুক্ত করব। সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, রেলওয়ের জনবল থাকার কথা ৪০ হাজারের কিছু বেশি। কিন্তু কর্মরত আছে ২৫ হাজারের মতো। ১৫ হাজার শূন্য পদ পূরণের পাশাপাশি আরো ১০ হাজার নতুন জনবল নিয়োগ দিতে একটি প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। অনুমোদন পাওয়া গেলে ৫০ হাজারের একটা বিশাল জনবল তৈরি হবে আমাদের।

সৈয়দপুর ও পাহাড়তলীতে বড় দুটি রেল কারখানা আছে। মাঝেমধ্যেই এসব কারখানার সাফল্যের খবর শুনতে পাই। আপনি কি মনে করেন, এসব কারখানা থেকেই একদিন রেলের প্রয়োজনীয় রোলিং স্টক পাওয়া সম্ভব?
রোলিং স্টকের অনেকগুলো অবশ্যই এসব কারখানা থেকে পাওয়া সম্ভব। সেই সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। এর আগে আমরা উৎপাদন করেও দেখিয়েছি। পার্বতীপুরে আমি কয়েকদিন আগেই দেখে এসেছি। শিগগির পাহাড়তলী যাব। এই কারখানাগুলোর কার্যক্রম বেগবান করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব। লোকবলের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। নতুন জনবল পেলেই কারখানাগুলো কার্যকর হয়ে উঠবে। আমি স্বপ্ন দেখি, দেশের মাটিতেই রেলের জন্য প্রয়োজনীয় কোচ, ওয়াগন, ইঞ্জিন তৈরি হবে। এর জন্য কাজ করে যাব। বেসরকারিভাবেও অনেকে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আমরা এই উদ্যোক্তাদের স্বাগত জানাই।

বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে। মধ্যম আয়ের দেশে একজন যাত্রী ট্রেনে উঠলে আপনি তার জন্য কী কী সেবা নিশ্চিত করবেন?
মধ্যম আয়ের দেশে একজন ট্রেন যাত্রী নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছবেন। পাবেন সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। স্বল্প খরচে দ্রুত চলাচল করতে পারবেন। আমরা এরই মধ্যে ১৫টা অত্যাধুনিক কোচ আমদানি করেছি। এসব কোচে যে সুযোগ-সুবিধা আছে তা উন্নত দেশগুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। মধ্যম আয়ের দেশের মানুষ ট্রেনে যাতায়াতে এ ধরনের কোচ পাবেন।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার আগে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।  আপনি কি আইন পেশা মিস করছেন?
মন্ত্রী হিসেবে যোগদানের আগে ১০ বছর সংসদ সদস্য ছিলাম। তখন নিয়মিত আমার চেম্বারে যেতাম। প্র্যাকটিস করতাম। আইন পেশাটি আমার আত্মার সঙ্গে মিশে আছে। মন্ত্রী হলেও এখনো সবার সঙ্গে যোগাযোগ আছে। কিন্তু যেহেতু মন্ত্রণালয়ের একটা দায়িত্বে আছি, তাই কোর্টে যেতে পারি না। কিন্তু মন আদালতে পড়ে আছে। সবসময় আদালতকে মিস করি।

সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

সুত্র:বণিক বার্তা, মার্চ ১৩, ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।