চীনের সঙ্গে ঋণ চুক্তি নভেম্বরে

চীনের সঙ্গে ঋণ চুক্তি নভেম্বরে

হামিদ-উজ-জামান:
অবশেষে বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পে ঋণ চুক্তি হতে যাচ্ছে চীনের সঙ্গে। দীর্ঘদিন নানা চিঠি চালাচালি এবং জটিলতার অবসান হওয়ায় এ চুক্তি সম্ভব হচ্ছে। তবে এখনও তারিখ চূড়ান্ত না হলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জানিয়েছে আর কোনো জটিলতা নেই। তাই নভেম্বরেই চুক্তি সম্ভব হবে। সেরকম ইঙ্গিতও মিলেছে চীনের পক্ষ থেকে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব কাজী শফিকুল আযম যুগান্তরকে বলেন, আশা করছি শিগগির এ প্রকল্পের জন্য চুক্তি করা যাবে। সে বিষয়ে কাজ করছেন এশিয়া ডেস্কের কর্মকর্তারা। তবে এখনও দিনক্ষণ ঠিক হয়নি।

জানতে চাইলে ইআরডির চীন ডেস্কের উপ-সচিব একেএম মতিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নভেম্বরের মধ্যেই চীনের সঙ্গে চুক্তি করা সম্ভব হবে। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। চলতি অর্থবছর যে ৮টি অগ্রাধিকার প্রকল্পের তালিকা চীনকে দেয়া হয়েছে তার মধ্যে এ প্রকল্পটিও রয়েছে। তিনি জানান, সম্প্রতি চীনের এক্সিম ব্যাংকের বোর্ডসভায় এ প্রকল্পের জন্য ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে চীন সরকারের ঋণ ২৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা এবং বাকি ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। ২০২২ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সমাপ্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। গত বছরের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময়ই এ প্রকল্পে অর্থায়নে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। কিন্তু নানা কারণে পরবর্তী সময়ে অর্থায়ন নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। এ জন্য চুক্তি স্বাক্ষরে বিলম্বিত হতে থাকে। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদের হস্তক্ষেপে সুদ ও শর্ত সংক্রান্ত জটিলতা কেটে গেছে বলে জানিয়েছে ইআরডি। আগের ২ শতাংশ সুদেই ঋণ দিতে রাজি হয়েছে চীন। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকা থেকে খুলনায় রেলপথের নতুন রুট তৈরি হবে। নতুন রেলপথ দিয়ে যাতায়াতে রাজধানী থেকে খুলনার দূরত্ব কমবে ২১২ কিলোমিটার। এ রেলপথ দিয়ে খুলনায় যেতে সময় লাগবে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টা। পদ্মা সেতু নির্মাণ সংযোগ প্রকল্পে চারটি সেকশনে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত নতুন ব্রডগেজ লাইন নির্মাণ হবে। এর মধ্যে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত আড়াই বছরের মধ্যে সম্পন্ন করে ২০১৮ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের দিন থেকে রেল চালুর পরিকল্পনা ছিল। নতুন রুটটি হবে ঢাকা থেকে গেণ্ডারিয়া হয়ে মাওয়া-ভাঙ্গা-নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত।
সূত্র জানায়, এর আগে এ প্রকল্পের ফাইন্যান্সিং অ্যাগ্রিমেন্টের বাণিজ্যিক চুক্তি মূল্যের ৮৫ শতাংশ প্রিফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) এবং ১৫ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে সম্পন্ন হবে এ সংক্রান্ত একটি সারসংক্ষেপ অনুমোদন দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। যা পরে চীন এক্সিম ব্যাংককে অবহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে চীনা এক্সিম ব্যাংক এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য দুটি বিকল্প প্রস্তাব দেয়। প্রথম প্রস্তাবে বলা হয়, বাণিজ্যিক মূল্যের ১৫ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন এবং ৮৫ শতাংশ পিবিসি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে চীনা এস্টেট কাউন্সিলের অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে অর্থায়ন প্রক্রিয়া করতে ৩-৬ মাস অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়, ১৫ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন এবং ৮৫ শতাংশ পিবিসি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে অতিরিক্ত সুদ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সুদের হার আড়াই শতাংশ হবে। কেননা পিবিসি কোটা সংগ্রহের জন্য চীন সরকারকে ওপেন মার্কেট থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু চীনের এ দুটি বিকল্প প্রস্তাব গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ। পরবর্তীকালে আলাপ-আলোচনার পর আগের নিয়ম অনুযায়ী ২ শতাংশ সুদ এবং ৮৫ শতাংশ পিবিসি অর্থায়ন এবং ১৫ শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে চলতি বছর (২০১৭ সাল) প্রকল্পটিতে অর্থায়নের অনুরোধ জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে চীনা এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার পর বাংলাদেশের প্রস্তাব গ্রহণ করেছে চীনা এক্সিম ব্যাংক।
পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক গোলাম ফখরুদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, এখনও দিনক্ষণ জানি না। তবে আশা করছি, শিগগির চীনের সঙ্গে ঋণ চুক্তি করা সম্ভব হবে।

প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে, ভূমি অধিগ্রহণ, ১৬৯ কিলোমিটার মেইন লাইন নির্মাণ, ৪৩ দশমিক ২২ কিলোমিটার লুপ ও সাইডিং ও ৩ কিলোমিটার ডাবলসহ মোট ২১৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেল ট্র্যাক নির্মাণ, ২৩ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট, এক দশমিক ৯৮ কিলোমিটার র‌্যাম্বপস, ৬৬টি মেজর ব্রিজ, ২৪৪টি মাইনর ব্রিজ ও কালভার্ট, একটি হাইওয়ে ওভারপাস, ২৯টি লেভেল ক্রসিং, ৪০টি আন্ডারপাস, ১৪টি নতুন স্টেশন বিল্ডিং নির্মাণ, ছয়টি বিদ্যমান স্টেশনের উন্নয়ন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ, ২০টি স্টেশনে টেলিযোগাযোগসহ কম্পিউটার বেজড রেলওয়ে ইন্টারলক সিস্টেম সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং ১০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী গাড়ি সংগ্রহ করা হবে।

সুত্র:যুগান্তর,২২ অক্টোবর, ২০১৭

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।