শিরোনাম

১১ বছর ঝুলে থেকে বাতিল হচ্ছে রেলের ৭০ ইঞ্জিন কেনা

১১ বছর ঝুলে থেকে বাতিল হচ্ছে রেলের ৭০ ইঞ্জিন কেনা

ইসমাইল আলী: ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনায় ২০১১ সালের আগস্টে প্রকল্প নেয় রেলওয়ে। প্রায় ১১ বছরে প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ। ইঞ্জিনগুলো কেনায় ২০১৮ সালের অক্টোবরে চুক্তি সই হলেও আর অগ্রগতি হয়নি। যদিও ১৮ থেকে ৬০ মাসের মধ্যে ইঞ্জিনগুলো সরবরাহের কথা ছিল। তবে কঠিন শর্তের ঋণ প্রস্তাবে আপত্তি তোলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এতে আটকে যায় ইঞ্জিন কেনার প্রক্রিয়া।

অবশেষে বাতিল হতে যাচ্ছে রেলের ৭০ ইঞ্জিন কেনার প্রকল্পটি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (্আইএমইডি)। গত ২৭ জুন এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়।

প্রকল্পটির সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনাপূর্বক কয়েকটি সুপারিশ প্রদান করেছে আইএমইডি। এর মধ্যে রয়েছে, ইঞ্জিন সরবরাহকারী কোম্পানি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও ব্যাংক গ্যারান্টি ফেরত, প্রকল্পটি বাতিল ও পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান এবং প্রয়োজনে ইঞ্জিন কেনার জন্য নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা।

যদিও প্রকল্পটির জন্য এ পর্যন্ত পাঁচ কোটি পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাতিল হলে এ অর্থ গচ্চা যাবে। আর দরপত্র বাতিল হলে প্রকল্পটি অগ্রগতি শূন্যতে নেমে আসবে।

তথ্যমতে, ২০১১ সালে ৭০ ইঞ্জিন কেনা প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট (সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ঋণের ব্যবস্থা করা) বা অন্য কোনো সহজ শর্তের উৎস থেকে ঋণ নেয়ার সুপারিশ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ইঞ্জিনগুলো কেনায় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর ও ২০১৩ সালের জুলাইয়ে দুই দফা দরপত্র আহ্বান করেও দরদাতা পাওয়া যায়নি। ২০১৪ সালে তৃতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করা হলে দুইটি কোম্পানি শেষ পর্যন্ত যোগ্য বিবেচিত হয়। আর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে ইঞ্জিনগুলো কেনায় বাণিজ্যিক চুক্তি সই হয়।

পাশাপাশি দরপত্রের সঙ্গে প্রাপ্ত ঋণপ্রস্তাব নিয়ে দরকষাকষি ও ঋণচুক্তি সইয়ের ব্যবস্থা গ্রহণে তা ইআরডিতে পাঠানো হয় ২০১৮ সালের জুনে। দরকষাকষির একপর্যায়ে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি ও আগস্টে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনমনীয় ঋণ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভায় প্রস্তাবটি নিয়ে দুই দফা আলোচনা হয়। পরে বিভিন্ন দপ্তরের মতামতের ভিত্তিতে গত বছর ৪ নভেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় ইআরডি।

এতে ইআরডি জানায়, ‘কোরিয়ান কোম্পানি কর্তৃক প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ায় প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য সরকার কর্তৃক এত উচ্চ হার সুদে অনমনীয় গ্রহণের পরিবর্তে কোরিয়ান সরকারের নমনীয় উৎসের বা অন্য কোনো উৎসের নমনীয় প্রকৃতির ঋণ সংগ্রহ করা বাঞ্ছনীয় হবে।’

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ নভেম্বর হুন্দাই রোটেমকে চিঠি দিয়ে সহজ শর্তের ঋণ সংস্থানের প্রস্তাব দেয়া হয়। তবে সে প্রস্তাবে অনাগ্রহ প্রকাশ করে হুন্দাই। এর পরিবর্তে চুক্তি বাতিল ও চুক্তির সময় জমা দেয়া এক লাখ ১৫ হাজার ডলারের ব্যাংক গ্যারান্টি ফেরতের অনুরোধ করে কোম্পানিটি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পিআইসি সভা আহ্বান করা হয়। সভায় চুক্তি বাতিল ও ব্যাংক গ্যারান্টি ফেরত দেয়ার আইএমইডি ও সিপিটিইউয়ের (সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট ইউনিট) মতামত গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।

পরে এ বিষয়ে মতামত চেয়ে সিপিটিইউ ও আইএমইডতে চিঠি দেয় রেলওয়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত এপ্রিলে মতামত দেয় সিপিটিইউ। সংস্থাটি জানায়, ৭০ ইঞ্জিনের ‘ক্রয়চুক্তির ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইন, বিধি (পিপিএ ২০০৬ ও পিপিআর ২০০৮) ও আদর্শ দলিলগুলোয় উপযুক্ত শর্ত অনুসরণ করা হয়নি। ক্রয়চুক্তি পর্যালোচনায় দেখা যায়, তহবিল প্রাপ্যতা ব্যতিরেকে ক্রয়চুক্তিটি করা হয়েছে এবং ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হওয়া সাপেক্ষে ক্রয়চুক্তিটি কার্যকর হবে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে।’ এতে ব্যাংক গ্যারান্টি ফেরত দেয়ার বিষয়ে মতামত দেয় সিপিটিইউ।

এদিকে আইএমইডির প্রতিবেদনে চারটি সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইআরডি ও হুন্দাইয়ের চিঠি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাণিজ্যিক চুক্তি বাতিল করে পারফরমেন্স গ্যারাটি ফেরত দেয়ার বিষয়ে সিপিটিইউ গত ৩ এপ্রিল মতামত প্রদান করেছে। এর আলোকে ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুযায়ী রেলপথ মন্ত্রণালয় চুক্তি বাতিল করে পারফরমেন্স গ্যারান্টি ফেরত দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়টি বিবেচনা করবে।

দ্বিতীয়ত, আরডিপিপি (সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) অনুযায়ী পুনরায় দরপত্র আহ্বান করার বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ট্রেন্ডারার্স ফাইন্যান্স পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে কিনা তা মন্ত্রণালয় খতিয়ে দেখতে পারে। বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় বিদ্যমান চুক্তি বাতিল করা হলে প্রকল্পটি বাতিল করা হবে নাকি জিওবি (সরকারি অর্থায়ন) অংশের অর্থায়নে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) সংশোধন করে প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান থাকবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থার সমন্বয়ে পিএসসি বা আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে প্রকল্পের পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা সমীচীন হবে।

তৃতীয়ত, ১০ বছরে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি মাত্র শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ বিবেচনায় প্রকল্পটি সংশোধন বা এ অবস্থাতে প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণ করার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। চতুর্থত, ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত অনুশাসন/নির্দেশনা অনুসরণপূর্বক মিটারগেজ লোকোমোটিভের সংখ্যা পুনঃনির্ধারণ করে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা সমীচীন হবে।

জানতে চাইলে ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনা প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ মাহবুব চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, হুন্দাইয়ের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের বিষয়ে আইএমইডির সুপারিশ পাওয়া গেছে। এখন রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি প্রকল্পটি বাতিলের বিষয়েও যদি মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয় অথবা সংশোধনের কথা বলা হয় সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, ৭০টি ইঞ্জিন কেনার চুক্তিমূল্য ছিল ২৩ কোটি ৯৪ লাখ ৫৭ হাজার ডলার। এজন্য বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড (এসসিবি) ও জাপানের সুমিতোমো মিটসুই ব্যাংকিং করপোরেশন (এসএমবিসি) কঠিন শর্তে ঋণ দিতে চেয়েছিল। আর ইঞ্জিনগুলো কেনায় মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৬৫৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। তবে বর্তমান অবস্থায় ইঞ্জিনগুলো কিনতে গেলে ব্যয় বেড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যদিও বর্তমানে ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনার প্রয়োজন নেই বলেই মনে করছেন রেলের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, ২০১০ সালে রেলের ইঞ্জিন সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল। তবে এরই মধ্যে রেলের বহরে ৪১টি মিটারগেজ ইঞ্জিন যুক্ত হয়েছে। ফলে ওই প্রকল্পটি এখন আর দরকার নেই। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্পটি বাতিল করা উচিত। এর পরিবর্তে ২০টি ইঞ্জিন কিনলেই চলবে। এজন্য পৃথক প্রকল্প নেয়াই উত্তম।

উল্লেখ্য, ৭০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৩০টি সম্পূর্ণ ফিটিং অবস্থায় কেনার কথা ছিল। বাকিগুলোর মধ্যে ২৫টি অর্ধ-উম্মুক্ত (হাফ নকডাউন) ও বাকি ১৫টি পুরো উম্মুক্ত অবস্থায় (ফুল নকডাউন) কেনা হতো। এ ইঞ্জিনগুলো দেশে এনে রেলের নিজস্ব ওয়ার্কশপে সংযোজন করা হবে।

সূত্র:শেয়ার বিজ


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।