সাইনবোর্ডেই দায় সারা!

সাইনবোর্ডেই দায় সারা!

‘ইহা একটি অবৈধ লেভেল ক্রসিং। নিজ দায়িত্বে পারাপার হউন। পারাপারে দুর্ঘটনা ঘটলে কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে’- ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কোড্ডা এলাকায় গেলে সড়কের পাশেই দেখা মিলবে এমন একটি সাইনবোর্ডের। সেখানে নেই কোনো রেলগেট, তাই এই লেখাটি দিয়েই যেন দায় সেরেছেন রেলের কর্মকর্তারা। শুধু সেখানেই নয়, দেশের পূর্বাঞ্চল রেলপথের আখাউড়া-আশুগঞ্জ-মুকুন্দপুর অংশে এমন ৩০টি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং রয়েছে।

এই লেভেল ক্রসিংগুলো দিয়ে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করছে। তাছাড়া আখাউড়ার মোগরা ও বাইপাস এলাকা দিয়ে প্রতিদিন ঢাকা-আগরতলা পথের দুটি আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে। লেভেল ক্রসিংগুলো পারাপারের সময় প্রায় প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। ঝরছে প্রাণ। ক্ষতি হচ্ছে ট্রেন ও যানবাহনের। গত বছর মোগরা এলাকায় অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে একটি মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে নিহত হন একজন, তবু সেদিকে নজর নেই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের। তারা সাইনবোর্ডে সাবধানবাণী লিখেই দায় সেরেছেন। এসব এলাকার চলাচলকারীদের অনেকে তাই এই সাবধানবাণীকে রসিকতা করে বলেন, ‘এটা নিজ দায়িত্বে পরপারে যাওয়ার নোটিশবোর্ড!’

সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ম না মেনে বিভিন্ন সময় রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করেছে। এ বিষয়ে আগে থেকে রেলওয়ের অনুমতি নেয়ার নিয়ম থাকলেও সড়ক নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ ওই নিয়ম মানেনি। আর এ কারণেই ‘বৈধতা’ পেয়ে গেছে অবৈধ এই লেভেল ক্রসিংগুলো।

আখাউড়া জংশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আখাউড়া-মুকুন্দপুর সেকশনে আখাউড়া রেলওয়ে উচ্চবিদ্যালয় সংলগ্ন রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এছাড়া দুর্গাপুর, রামধননগর, আজমপুর, রাজাপুর, কালাছড়া ও মুকুন্দপুরে এলজিইডির সড়কের ওপর অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে।
আখাউড়া-আশুগঞ্জ সেকশনে আখাউড়া রেল জংশনের কুমারপাড়ার রেললাইন পার করে যে রাস্তা রয়েছে ওই রাস্তাটি রেলওয়ের আবাসিক এলাকার। নির্মাণও করে রেলওয়ে। সেই লেভেল ক্রসিংটিও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে দীর্র্ঘদিন যাবত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কোড্ডায় সওজ; জারুলতলা, ভাতশালা, চিনাইর, সোহাতা, রামরাইল এলাকার অবৈধ লেভেলক্রসিং এলজিইডি; ভাদুঘরের ডালিবাড়ি, ফাটাপুকুর ও উত্তরপাড়া, শিমরাইলকান্দির ক্রসিংটি তৈরি করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা। দারিয়াপুর, বড় হরণপুরেরটি সওজের আর তালশহরের অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের রাস্তাটি নির্মাণ করেছে এলজিইডি। এই লেভেল ক্রসিংগুলোর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট রেলপথের আখাউড়া-আশুগঞ্জ-মুকুন্দুপুর সেকশনের প্রায় ৩০টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। আর বৈধ মাত্র ১১টি। অবৈধ ক্রসিংগুলোর মধ্যে ২১টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আখাউড়া রেল জংশন প্রকৌশল বিভাগ।

সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ১৬ মার্চ রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ থেকে আখাউড়া উপজেলা প্রকৌশলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নির্বাহী প্রকৌশলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশুগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলীকে চিঠি দেয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, তাদের দফতরের নির্মাণ করা রাস্তা অবৈধভাবে রেললাইন অতিক্রম করেছে। এগুলো জননিরাপত্তার জন্য হুমকি। সে কারণে পত্রে এই রাস্তাগুলো বন্ধ করতে বলা হয়েছে। আর তা না হলে রেলওয়ে ১৮৯০ সালের আইনের ১২৮ ধারা মোতাবেক সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আখাউড়া পৌর শহরের দুর্গাপুরের লেভেল ক্রসিংটিও অনিরাপদ। প্রতিনিয়ত আশঙ্কা থাকে ছোট-বড় দুর্ঘটনার। ওই লেভেল ক্রসিংয়ের পাশের পান দোকানদার সাইফুল ইসলাম (৩০) জানান, ট্রেন এলে অনেক সময় তিনি নিজেই দোকান থেকে নেমে গিয়ে চলাচলকারী লোকজনের পথ আগলে দাঁড়ান। নিজেও সবসময় দুর্ঘটনার আতঙ্কে ভোগেন বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে আখাউড়া জংশনের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘যতগুলো অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং রয়েছে সেগুলোতে গেট নির্মাণ করার জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছে। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে ওইসব অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে গেট নির্মাণ করা হবে।’

সুত্র:মানব কন্ঠ

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।