লুটপাটের আখড়া ময়মনসিংহ রেলস্টেশন

লুটপাটের আখড়া ময়মনসিংহ রেলস্টেশন

বাবুল হোসেন:

ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেট কালোবাজারি করে আসছে ময়মনসিংহের শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট। ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও কতিপয় অসাধু বুকিং সহকারীদের সহায়তায় বহিরাগত ও চিহ্নিত এই সিন্ডিকেট প্রতিদিন আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেট কালোবাজারি করে আসছে। ট্রেনের টিকেট চড়াদামে কালোবাজারে বিক্রি থেকে আয়ের একটা ভাগ যাচ্ছে নানা মহলে! ফলে ট্রেনের টিকেট কালোবাজারে বিক্রির সঙ্গে জড়িত চক্র ও এর মদদদাতারা বার বার চিহ্নিত হলেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। এসব নানা কারণে নিরীহ যাত্রী সাধারণ নির্ধারিত সময়ে লাইনে দাঁড়িয়েও পাচ্ছে না চাহিদার ট্রেনের কোন টিকেট। অথচ ময়মনসিংহ ও গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে কালোবাজারিদের কাছে হাত বাড়ালেই মিলছে আন্তঃনগর সব ট্রেনের টিকেট! অভিযোগ রয়েছে অসাধু বুকিং সহকারীরা নামমাত্র টিকেট লাইনে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের কাছে ছেড়ে বাকি সব টিকেট অনলাইন থেকে তুলে নিয়ে বহিরাগত সিন্ডিকেটকে দিয়ে দিচ্ছে। আর এই টিকেট কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে চড়াদামে।

অভিযোগ উঠেছে, জেল থেকে ছাড়া পাওয়া কালোবাজারি মুহিত বুকিং সহকারীদের যোগসাজশে অনলাইনের সব টিকেট তুলে নিচ্ছে। পরে এসব টিকিট চড়া দামে বিক্রি করছে কালোবাজারে। কালোবাজারে টিকেট বিক্রির বিষয়টি সোজাসাপ্টা স্বীকার করে স্টেশন সুপার জহুরুল ইসলাম জানান, চাহিদার তুলনায় আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর আসন সংখ্যা কম থাকায় এমনটি হচ্ছে। কালোবাজারে ট্রেনের টিকেট বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানান এই কর্মকর্তা। তবে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি এসব ব্যবস্থা ‘আই ওয়াশ’ ছাড়া আর কিছ্ইু নয়। কারণ যাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা দাবি করা হয়েছে পরবর্তীতে তাদের প্রত্যেককেই ন্যক্কারজনকভাবে প্রাইজ পোস্টিং দেয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি এ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান খান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান,‘সর্ষের ভেতর ভূত’ থাকার কারণেই এমনটি হচ্ছে।

সূত্রগুলো আরও জানায়, বুকিং সহকারী লীজা, সীমা, নজরুল, আলতাফ ও আকন্দের বিরুদ্ধে ট্রেনের টিকেট কালোবাজারির পাশাপাশি যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত ১০ দিন আগে সকাল ৮টায় আন্তঃনগর ট্রেনের টিকেট কাউন্টারের কম্পিউটার ওপেন করার ৩০ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে সব টিকেট। অভিযোগ রয়েছে জিআরপি, নিরাপত্তা ও আনসার সদস্যদের উপস্থিতিতে এ সময়ের মধ্যেই বুকিং সহকারীরা সব টিকেট তুলে নিয়ে পরে কালোবাজারি সিন্ডিকেটের সদস্য ইজ্জত আলী, সাত্তার, নগরীর পুরোহিত পাড়ার বাসিন্দা মুহিত ও গফরগাঁওয়ের রিয়াজের হাতে তুলে দিচ্ছে।

প্রশ্নবিদ্ধ উচ্ছেদ কার্যক্রম কেউ বহাল, কেউ নিঃস্ব!

রেলওয়ের জমি থেকে অবৈধ স্থাপনা সরাতে ভূসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করার দু’দিনের মাথায় বন্ধ হয়ে গেছে। ২০১৯ সালের ১৯ নবেম্বর উচ্ছেদ শুরু হয়, চলে পরদিন ২০ নবেম্বর পর্যন্ত। মাত্র দুই দিনের এই উচ্ছেদ অভিযানে শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তবে এর আগে নোটিস ও মাইকিংয়ে উচ্ছেদের খবর পেয়ে রেলওয়ের জমির ওপর গড়ে ওঠা এক হাজারের বেশি স্থাপনা নিজেরাই ভেঙ্গে সরিয়ে ফেলে জবরদখলকারীরা। এর আগে এসব স্থাপনার বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, রেলওয়ের এই উচ্ছেদ কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানিয়েছে নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। উচ্ছেদ অভিযানের ফলে কারও সর্বনাশ হয়েছে, কেউ হয়েছেন নিঃস্ব। কিন্তু উচ্ছেদ কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহাল তবিয়তে রয়েছে অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে প্রভাবশালী জবরদখলকারীদের রক্ষা করতেই কী বন্ধ হয়ে গেছে এই উচ্ছেদ অভিযান? প্রচার রয়েছে, উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করতে জবরদখলকারীরা মোটা অঙ্কের চাঁদা তুলেছেন। চাঁদার সেই টাকা গেছে নানা মহলে। এর পরই বন্ধ হয়ে গেছে বহুল প্রত্যাশিত উচ্ছেদ অভিযান।

বিদ্যুত চুরি

ময়মনসিংহ রেলওয়েতে চলছে বিদ্যুত চুরির মচ্ছব। পরিত্যক্ত আবাসিক কোয়ার্টারসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনায় অবৈধভাবে বাইপাস সংযোগ দিয়ে নির্বিচারে চলছে রেলওয়ের বিদ্যুত চুরি। বছরে বিদ্যুত খাতে রেলওয়ের গচ্ছা যাচ্ছে এক কোটি টাকার ওপরে। অথচ প্রকাশ্য বিদ্যুত চুরি রোধে কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই! ময়মনসিংহ বিদ্যুত বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ (দক্ষিণ) এর নির্বাহী প্রকৌশলী ইন্দ্রজিৎ দেবনাথ জানান, গত ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে ময়মনসিংহ রেলওয়ের নামে ২২ লাখ টাকা বিদ্যুত বিল করা হয়েছে। আর ময়মনসিংহ রেলওয়ের সিনিয়র সাব এ্যাসিসটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার (এসএসএই,বিদ্যুত) আসাদুজ্জামান খান জানান, এই ক্ষেত্রে আদায়যোগ্য বিল মাত্র ১০ লাখ টাকা। বাকি টাকা রেলওয়েকে ভর্তুকি গুনতে হবে। প্রতিমাসেই এই ভর্তুকি গুনতে হয় রেলকে বলে জানান আসাদুজ্জামান খান। বাসা নম্বর ই/১১। কেওয়াটখালি লোকোশেড কলোনি। ডাবল কক্ষের এই বাসাটি বরাদ্দ নিয়েছেন আই ডব্লিউ এর কর্মকর্তা রবীন্দ্রনাথ মজুমদার। নিজে পরিবার পরিজন নিয়ে থাকার পাশাপাশি বাড়তি ছাপড়া ঘর তুলে ভাড়াও দিয়েছেন বহিরাগত দুটি পরিবারকে। বাড়তি ছাপড়া ঘরে রয়েছে অবৈধ বাইপাস বিদ্যুত সংযোগ। এই কলোনির এল/২৭ নম্বর বাসার স্বপন সরকার ও এল/৭২ নম্বর বাসার আবদুল মান্নানসহ বেশিরভাগ বরাদ্দের বাসায় বাড়তি অবৈধ ছাপড়া ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন। এসব প্রতিটি ছাপড়া ঘরেই রয়েছে বাইপাস সংযোগের অবৈধ বিদ্যুত। এই কলোনিতে সিঙ্গেল ও ডাবলসহ মোট ২৫০টি বাসা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫০টি বাসা বরাদ্দ দেয়া আছে। ড্যামেজ ঘোষণা করা বাকি সব বাসা রয়েছে অবৈধ দখলদারদের কব্জায়। সূত্র মতে কেওয়াটখালি ডিফেন্স পার্টি ও কেওয়াটখালি কলোনি জামে মসজিদ পরিচালনার নামেও ভাগাভাগি হচ্ছে ভাড়ার টাকা। প্রতিটি বাসা ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায় ভাড়া আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে ডিফেন্স পার্টির নামে খালাসি আকবর ও আই ডব্লিউ আনোয়ারসহ এলপিআরএ থাকা আবদুল মান্নান এসব টাকা লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ। সূত্রের দাবি উচ্ছেদ কার্যক্রমের আগ পর্যন্ত আবদুল মান্নানের দখলে ছিল সর্বোচ্চ ৬৫ বাসা। আর আনোয়ার ও আকবরের দখল ছিল ২৫টি বাসা। ২৫০টি বাসায় ৩৫০ পরিবার ভাড়া থাকলেও বৈধভাবে বরাদ্দের বাসায় ভাড়াটিয়া ছিল মাত্র ১০০ পরিবার। অভিযোগ রয়েছে আবদুল মান্নানের বাসায় অবৈধ অটোরিক্সা চার্জ করার গ্যারেজসহ অবৈধ বাসায় আয়রন, ফ্রিজ, টিভি, ফ্যান, ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, লাইট ও ১৫০০ ওয়াটের ডাবল হিটারের সংযোগ ছিল। একই চিত্র নিউ কলোনিতেও। রেলওয়ের এই কলোনিতে এরকম বাসা রয়েছে ৮৪টি। রেলওয়ে গত দুই দশক আগে এসব বাসাকে ড্যামেজ ঘোষণা করলেও বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেনি।

সংশিষ্ট সূত্র জানায়, ময়মনসিংহে রেলওয়ের নিউ কলোনিসহ কেওয়াটখালির লোকো স্টাফ কলোনি, পাওয়ার হাউস কলোনি, মালগুদাম, ব্রাহ্মপল্লী, পুরোহিত পাড়া ও গার্ড কলোনিতে সাতটি বাংলো ছাড়াও সিঙ্গেল ও ডাবলসহ আবাসিক কোয়ার্টার রয়েছে ৮৫১টি। অভিযোগ রয়েছে, এক শ্রেণীর ভাড়াটিয়া রেলওয়ের এসব বাসায় থেকে মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অসামাজিক ও অপরাধমূলক কর্মকা-ে লিপ্ত রয়েছে। রয়েছে অবৈধ সংযোগের ছড়াছড়ি। এজন্য ময়মনসিংহ রেলওয়ের নামে প্রতিমাসে বিদ্যুত বিল হচ্ছে ২০-২২ লাখ টাকা। আর আদায় হচ্ছে মাত্র ১০ লাখ টাকার মতো। এই হিসেবে রেলকে প্রতিমাসে অবৈধ বিদ্যুত সংযোগের কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে ১০ লক্ষাধিক টাকা। বছরে লোকসানের এই অঙ্ক শত কোটি টাকার উপরে! ময়মনসিংহ রেলওয়ের সিনিয়র সাব এ্যাসিসটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার (এসএসএই, বিদ্যুত) আসাদুজ্জামান খান রেল কলোনিতে অবৈধ বিদ্যুত সংযোগ থাকার কথা স্বীকার করে জানান, এ জন্য রেলকে প্রতিমাসে ১০ লক্ষাধিক টাকা গুণতে হচ্ছে।

নেশাখোর ও মলম পার্টির অভয়ারণ্য

দিনে টানা পার্টি আর রাতে নেশাখোর ছিনতাইকারীদের দখলে থাকছে ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন। হকারদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ অপেক্ষমাণ যাত্রীরা। রাতে ভাসমান পতিতা ও দিনে পকেটমারদের উৎপাতও কম নয়।

স্টেশন থেকে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ডেকে নিয়ে যাচ্ছে বাস সার্ভিসের শ্রমিকরা। সবকিছু মিলিয়ে শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী এই ময়মনসিংহ রেলস্টেশন পরিণত হয়েছে এক অরাজকতার আখড়ায়। ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, আরএনবি, জিআরপি ও স্টেশন কর্তৃপক্ষের ছত্রছায়াতেই হচ্ছে সবকিছু। স্টেশনে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক হকার ঢোকছে প্ল্যাটফর্মে। অধিকাংশ সময় ওয়েটিংরুম দখলে রাখছে যাত্রীবেশের দুর্বৃত্তরা। যাত্রীদের অভিযোগ, ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন এখন পেশাদার পকেটমার ও মাদক ব্যবসায়ীদের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

রাজস্ব আয়ে রেকর্ড, যাত্রী সেবায় নিয়ে

সেবার মান না বাড়লেও রাজস্ব আয়ে রেকর্ড গড়েছে ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন। দিন দিন রাজস্ব আয় বেড়েই চলেছে। যাত্রী সাধারণের অভিযোগ, রাজস্ব আয়ের বিপরীতে বাড়ছে না সেবার মান। অনেক ক্ষেত্রে তা নি¤œমুখী। এ নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ স্থানীয় নাগরিক নেতৃবৃন্দ। প্ল্যাটফর্ম ও আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে হকার ও হিজড়াদের উৎপাতে অতিষ্ঠ যাত্রীরা। প্ল্যাটফর্ম ও আন্তঃনগর ট্রেনের কামরাগুলো ময়লা আবর্জনায় ভরা ও নোংরা। অনেক ক্ষেত্রে উৎকট দুর্গন্ধযুক্ত। ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের সুপার জহুরুল হক সেবার নি¤œ মান ও হকারদের উৎপাতসহ নোংরা পরিবেশের বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে জানান, নানা অব্যবস্থাপনা ও সীমাবদ্ধতার পরও আশার কথা হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ৮ কোটি ৮১ লাখ ৫৮ হাজার ৭১ টাকা। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই আয় ছিল ৯ কোটি ৮৫ লাখ ৭৬ হাজার ২৮৯ টাকা। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই আয় ছিল ১১ কোটি ৩৬ লাখ ৬৮ হাজার ২৫৪ টাকা। আর সর্বশেষ গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই আয় দাঁড়ায় ১২ কোটি ২৩ লাখ ৯৮ হাজার ৯৩৫ টাকা।

সুত্র:জনকন্ঠ, ১৬ জানুয়ারী ২০২০

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।