রেলে আগুন নেভানোর নিজস্ব ব্যবস্থা নেই

রেলে আগুন নেভানোর নিজস্ব ব্যবস্থা নেই

শিপন হাবীব:
রেলওয়েতে আগুন নেভানোর নিজস্ব কোনো ব্যবস্থাই নেই। প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার রেলপথ, ৪৬০টি স্টেশন, রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবন চরম অগ্নি ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিদিন ৩৬২টি ট্রেন চলছে। এসব ট্রেনের গুটি কয়েকটির মধ্যে ফায়ার এক্সটিংগুইসার থাকলেও অকেজোর সংখ্যাই বেশি। এসব ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ যাত্রী অগ্নিঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।

ন কিংবা স্টেশন, প্রশাসনিক ভবন কিংবা রেলপথ, কোথাও কোনো অঘটনে আগুন লাগলে তা দ্রুত নেভানোর ভালো ব্যবস্থা নেই। গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্টেশনগুলোতে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা না থাকায় সম্পূর্ণ ফায়ার সার্ভিসের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফায়ার সার্ভিস প্রবেশের প্যাসেজও নেই স্টেশনগুলোতে। এমন অবস্থায় খোদ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কমলাপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ প্রায় সব ক’টি বড় বড় রেলওয়ে স্টেশনেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। স্টেশন, ট্রেন পুড়েছে বারবার। চলন্ত ট্রেনের যাত্রীবাহী বগি-ইঞ্জিনেও ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। ১৯৫টি অতি মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন এবং শত শত মেয়াদহীন যাত্রীবাহী বগি নিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাবনাও থাকছে। রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নানা কারণে রেলওয়েতে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

এতে ইঞ্জিন, বগি, রেলপথ, রেলওয়ে ব্রিজসহ স্টেশন এবং রেলওয়ের বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। স্টেশন, ট্রেন ও প্রশাসনিক ভবনগুলোতে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা না থাকায় এবং এসব স্থাপনায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সহজে প্রবেশ করতে না পারায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। গত কয়েক বছরের অগ্নিকাণ্ডে কমলাপুর স্টেশন প্লাটফর্মে বেশ কয়েকটি ইঞ্জিন, যাত্রীবাহী বগিসহ স্টেশন ভবন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সার্ভার পুড়ে ট্রেন চলাচল বন্ধের মতো ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।

এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন যুগান্তরকে জানান, পুরো রেলওয়েতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ রয়েছে। শুধু রেলওয়ে স্টেশন, প্রশাসনিক ভবনই নয়, যে কোনো সময় ট্রেনগুলোতেও আগুন লাগতে পারে। কর্তৃপক্ষ দ্রুত সময়ের মধ্যে পুরো রেলওয়েতে অগ্নিনির্বাপণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা নিয়েছে।

কমলাপুর স্টেশনসহ বড় বড় স্টেশনগুলোতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞ টিম এবং সাধারণ যাত্রীদের সমন্বয়ে উম্মুক্ত আলোচনার ব্যবস্থা করা হবে। ওখান থেকে ওঠে আসা করণীয়গুলো যত দ্রুত সম্ভব রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করবে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন একটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনসহ বিভিন্ন স্টেশন এবং ট্রেনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, রেলে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী চলাচল করে। এখানে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। পুরো রেলওয়েতে অগ্নিনির্বাপণ নিশ্চিতকরণে কী কী করণীয় রয়েছে তার জন্য রেলওয়ে যুগ্ম-সচিবের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এ কমিটি রিপোর্ট জমা দেবে। কমলাপুরসহ রেলওয়ের বিভিন্ন স্থানে কয়েক মাস আগে যেসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তা নির্ণয় করে রিপোর্ট আকারে জমা দেয়ারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

খোদ রেলপথ মন্ত্রণালয়েও আগুন নেভানোর কোনো নিজস্ব ব্যবস্থা নেই। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের প্রধান গেট ইতিমধ্যে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন গাড়ি আসা-যাওয়ার উপযোগী করা হয়েছে। সরেজমিন ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার রেলপথে নাশকতা রোধে রেলের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যাও কম। স্বাধীনতার পর পর বিভিন্ন স্টেশন ও স্টেশন এলাকায় ভূর্গভস্থ পানি তোলার পর যে বড় ইঁদারায় রাখা হতো তাও ভরাট হয়ে গেছে বহু যুগ আগে। কোনো স্টেশনেই আগুন নেভানোর পানি স্টোরেজ ও বালির ব্যবস্থা নেই। সব মিলিয়ে চরম ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে ট্রেন ও যাত্রীসহ স্টেশনগুলো।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার নওরোহ হাসান তালুকদার যুগান্তকে জানান, রেলওয়েতে যে কোনো নাশকতা রোধে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকা জরুরি- যা রেলওয়েতে নেই। আমাদেরও লোকবলের অভাব রয়েছে। যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোতে অগ্নিনির্বাপণে বিশেষ ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের থানাগুলোতেও আগুন নেভানোর ব্যবস্থা নেই। স্টেশন, প্রশাসনিক ভবনসহ প্রতিটি ট্রেনেই অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে স্টেশন ভবন ও প্লাটফর্মের প্রতিটি পিলার দেয়ালে ফায়ার এক্সটিংগুইসার লাগানো দরকার। প্রতিদিন স্টেশনগুলো দিয়ে হাজার হাজার যাত্রীসাধারণ চলাচল করছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

রেলওয়ে প্রকৌশলী বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন তৈরি করা স্টেশন ও রিমডেলিং স্টেশনগুলোতেও অগ্নিনির্বাপণে যথাযথ ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এছাড়া শুধু বড় স্টেশনগুলো নয়, ছোট স্টেশনগুলোতেও নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। স্টেশনগুলোর চার পাশে যথাযথ বেড়া না থাকায় ইচ্ছেমতো সাধারণ মানুষ স্টেশন হয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে। নাশকতাকারীরা যে কোনো সময় এ সুযোগটি ব্যবহার করে বড় ধরনের নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে। একবিংশ শতকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে রেল যোগাযোগকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে রেলের সম্পদ রক্ষার ওপর জোর দেয়া হয়। দেশে তা দারুণভাবে অনুপস্থিত।

রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মিয়া জাহান জানান, সামনের দিনগুলোতে কী করে রেলওয়ে স্টেশন, প্রশাসনিক ভবন, ট্রেন ও বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায় সে দিকেই নজর দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে আন্তঃনগর ট্রেনে অভ্যন্তরীণ কোনো অল্প আগুন নেভানোর ব্যবস্থা আছে। বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমরা নিরুপায় হয়ে পড়ি। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যে সব ফায়ার সার্ভিস আছে তা দূরত্ব ভেদে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পৌঁছতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েই যায়।

সুত্র: যুগান্তর, ১৮ এপ্রিল ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।