মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনে চলছে ট্রেন

মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনে চলছে ট্রেন

জয়শ্রী ভাদুড়ী:

মেয়াদোত্তীর্ণ ৭৩ শতাংশ ইঞ্জিন দিয়ে চলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল ২০ বছর হলেও ৬৬ বছরের পুরনো ইঞ্জিন রয়েছে রেলের বহরে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জাদুঘরে ঠাঁই পাওয়া কানাডার জিএম বি-১২ মডেল এখনো ভরসা রেল বিভাগের। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন, জরাজীর্ণ লাইন, ঝুঁকিপূর্ণ রেল সেতু দিয়ে চলাচলে কমছে রেলের গতি, বাড়ছে দুর্ঘটনা।

এ ব্যাপারে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রেলওয়ে আধুনিকায়নে আগে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমি দায়িত্ব নিয়ে দেখি ৭৩ শতাংশ রেল ইঞ্জিনের মেয়াদ পার হয়ে গেছে। ওয়াগন নেই, রেলপথের মেরামত নেই। এ লাইনে সব ট্রেন চলছে। তিনি আরও বলেন, রেলের আধুনিকায়নে ব্রডগেজ লাইনের ৪০টি ইঞ্জিন আনার চুক্তি হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৩০টি ইঞ্জিন কেনার চুক্তি প্রক্রিয়াধীন। এর মধ্যে ১০টি ব্রডগেজ এবং ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন ভারত উপহার হিসেবে আমাদের দিচ্ছে। এগুলো জানুয়ারির মধ্যে পেঁৗঁছাবে। তবে ইঞ্জিন বাড়ানোর আগে লাইন বাড়াতে হবে নয়তো ট্রেনের গতি বাড়ানো সম্ভব হবে না।বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র জানায়, স্বাধীনতার সময় রেলওয়েতে লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন ছিল ৪৮৬টি। বর্তমানে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২৭৩টিতে। তবে এসব ইঞ্জিনের মধ্যে ১৯৫টির মেয়াদ নেই। মিটারগেজ ও ব্রডগেজের ৩৯টি মিলিয়ে বর্তমানে ৭৮টি ইঞ্জিনের কার্যদক্ষতা রয়েছে। অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে চলছে রেলওয়ের সেবা। রেলে ২০০৭-০৮ সালে সচল ইঞ্জিন ছিল ২৮৫টি। ২০১০-১১ সালে কমে হয় ২৫৯টি, ২০১১-১২ সালে ইঞ্জিন ছিল ২৯৫টি, ২০১২-১৩ সালে ২৫৮টি, ২০১৩-১৪ সালে ২৯৩টি, ২০১৫-১৬ সালে ২৭৮টি, ২০১৬-১৭ সালে ২৭৩টি ইঞ্জিন ছিল। বর্তমানে এই ২৭৩টি ইঞ্জিন রয়েছে রেলওয়েতে। এর মধ্যে ব্রডগেজ ইঞ্জিন রয়েছে ৯৪টি। বাকি ১৭৯টি রয়েছে মিটারগেজ ইঞ্জিন। মিটার গেজের ১৪০টি ইঞ্জিনই মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব ইঞ্জিনের মধ্যে ৪৫টি ইঞ্জিনের বয়স ২১-৩০ বছর, ৩১টি ইঞ্জিনের বয়স ৩১-৪০ বছর এবং ৬৪টি ইঞ্জিনের বয়স ৪১-৬০ বছরের বেশি। আর ৯৪টি ব্রডগেজ ইঞ্জিনের মধ্যে ২৪টির বয়স ৩১-৪০ বছরের মধ্যে। ৩১টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন ৪১ বা তারও বেশি বছর ধরে চলছে।

সূত্র জানায়, ১৯৬১ সালে আমেরিকা থেকে ২২শ’ সিরিজের (এমইজি-৯) ১১টি, ১৯৬৯ সালে কানাডা থেকে ২৩শ’ সিরিজের (এমইএম-১৪) ৮টি, কানাডা থেকে ১৯৭৮ সালে ২৪শ’ সিরিজের (এমইএম-১৪) আরও ৯টি এবং ১৯৮১ সালে হাঙ্গেরি থেকে ৩৩শ’ সিরিজের (এমএইচজেড-৮) তিনটি ইঞ্জিন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জন্য আনা হয়েছিল। ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২৯শ’ সিরিজের (এমইআই-১৫) একটি ইঞ্জিন আনা হয়। এসব ইঞ্জিনের ইকোনমিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর নির্ধারিত। আমেরিকা থেকে আনা ১১টির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে ৩৮ বছর আগেই। কানাডা থেকে প্রথম ধাপে আনা ৮টি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ৩০ বছর আগেই। দ্বিতীয় ধাপে কানাডা থেকে আনা ৯টির আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ হয়ে ৪১ বছর হয়েছে। হাঙ্গেরি থেকে আনা তিনটির আয়ুষ্কাল উত্তীর্ণ হয়ে ৩৮ বছর হয়েছে। এসব ইঞ্জিনের অনেকগুলোর পায়ের ডিজিটাল ব্রেক কাজ করে না। ‘ডেডম্যান ফুট প্যাডেল’ কাজ করছে না। হাতের ব্রেক কাজ করলেও জরুরি পায়ের ব্রেক কাজ করছে না। সামনে বিপদ চোখে পড়লেও ট্রেন থামাতে পারেন না চালক। এরকম ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে সুবর্ণ এক্সপ্রেস। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের সহকারী এক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বলেন, এক সময় বি-১২ মডেলের ইঞ্জিনের গতি ছিল ৬৫-৭৫ কিলোমিটার। এখন এর গতি ৩০-৩৫ কিলোমিটারের বেশি ওঠে না। এসব ইঞ্জিনের জ্বালানি খরচও বেশি। বি-১২ মডেলের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ এখন কোথাও পাওয়া যায় না। জিআই তার দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে ব্রেকসহ নাট-বল্টু। রেলওয়ের কমলাপুর বগি ওয়ার্কশপের কর্মী ফজলু মিয়া বলেন, প্রতিদিন প্রায় ১০-১২টি ইঞ্জিন মেরামতের জন্য ওয়ার্কশপে আসে। অধিকাংশ ইঞ্জিন জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা হয়। জাপানি ইঞ্জিনগুলোর যন্ত্রপাতি বাজারে পাওয়া যায় না। কর্মী সংকট থাকায় দ্রুত মেরামত করাও সম্ভব হয় না।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, রেলওয়েতে উন্নয়ন করতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। বিনিয়োগ হচ্ছে কিন্তু গুরুত্ব বিবেচনা করা হচ্ছে না। টেকসই উন্নয়নে কৌশল জরুরি বিষয়। তিনি বলেন, সরকার অবকাঠামো তৈরি করবে কিন্তু সেবা দেওয়ার সময় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ থাকবে। কারণ, সরকারি ছত্রছায়ায় উন্নয়ন হলেও সেবা সঠিকভাবে পাওয়া যায় না। সড়ক, নৌ, আকাশপথে যাত্রী পরিবহনে বেসরকারি বিনিয়োগ রয়েছে। শুধু রেলে সরকারিভাবে সেবা দেওয়া হয়। রেল সেবাকে নিরাপদ এবং লাভজনক করতে চাইলে দ্রুত গতিতে চলার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। রেলপথে লেভেলক্রসিং, হাটবাজার সরিয়ে রেলের নিরাপদে চলার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

সুত্র:বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৫ নভেম্বর, ২০১৯


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।