মিটারগেজ ডাবল লাইনে গচ্চা ২,১৭৬ কোটি টাকা

মিটারগেজ ডাবল লাইনে গচ্চা ২,১৭৬ কোটি টাকা

ইসমাইলআলীটঙ্গী-ভৈরববাজার রেলপথ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প শেষ হয়েছে ২০১৮ সালের জুনে। তবে ডাবল লাইনটি রয়ে গেছে মিটারগেজেই। ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি এ প্রকল্পে। এতে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে করিডোর তথা আন্তর্জাতিক রুটে যুক্ত হতে পারছে না চট্টগ্রাম। আবার দেশের উত্তর বা দক্ষিণাঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সরাসরি কোনো ট্রেনও চালানো যাবে না।

এতে টঙ্গী-আখাউড়া রুটে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণে নতুন প্রকল্প নিতে হচ্ছে। এজন্য মাত্র তিন বছর আগে নির্মিত লাইন তুলে ফেলতে হবে। ফলে গচ্চা যাচ্ছে টঙ্গী-ভৈরববাজার ডাবল লাইন নির্মাণের দুই হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। আর টঙ্গী-আখাউড়া রুটে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ২৫২ কোটি টাকা।

সূত্রমতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীতকরণের অংশ হিসেবে ২০০৬ সালে নেয়া হয় টঙ্গী-ভৈরববাজার ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প। সে সময় এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। রেলপথটি পাঁচ বছরের মধ্যে নির্মাণ শেষ করার কথা ছিল। তবে কয়েক দফা মেয়াদ বৃদ্ধির পর ২০১৮ সালের জুনে শেষ হয় প্রকল্পটি। আর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ১৭৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

প্রকল্পটির আওতায় টঙ্গী-ভৈরববাজার রুটে ৬৪ কিলোমিটার মেইন লাইন ও ২২ কিলোমিটার লুপ লাইন ডাবল লাইন করা হয়েছে। পাশাপাশি চারটি মেজর ও ৩১টি মাইনর ব্রিজ এবং ৩১টি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। তবে লাইন বা সেতু-কালভার্টে কোথাও ডুয়েলগেজের অপশন রাখা হয়নি।

তথ্যমতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের মধ্যে টঙ্গী-ভৈরববাজার ডাবল লাইন মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে সাত ফুটের কনক্রিট সিøপার ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ ৯ ফুটের কংক্রিট সিøপার ব্যবহার করা হলে এক সি পারেই ব্রডগেজ তথা ডুয়েলগেজ রেলপথ চালু করা যেত। ফলে রেলপথটিতে ব্রডগেজের ব্যবস্থা রাখতে খুব বেশি বিনিয়োগ করতে হতো না। আবার ডুয়েলগেজ রেলপথ চালু করতে সময়ও লাগত কয়েক মাস। শুধু অতিরিক্ত একটি রেলপাত সংযোজন করলেই চলত।

যদিও বর্তমান অবস্থায় ব্রডগেজ তথা ডুয়েলগেজ রেলপথ চালু করতে প্রচুর সময় ব্যয় হবে। পুরো রেললাইন তুলে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। এমনকি রেলপথে থাকা ব্রিজ-কালভার্টগুলোও ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। এতে বিনিয়োগও করতে হবে অনেক বেশি।

এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের আখাউড়া-লাকসাম অংশটির মিটারগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রস্তাব ২০১৬ সালে পাঠানো হয় একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। তবে প্রকল্পটি ফেরত দেন প্রধানমন্ত্রী। সে সময় তিনি নির্দেশনা দেন দেশে আর কোনো মিটারগেজ রেলপথ হবে না। নতুন রেলপথ ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজ নির্মাণের নির্দেশনা দেয়া হয় সেই একনেক সভায়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে আখাউড়া-লাকসাম অংশটিতে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি টঙ্গী থেকে আখাউড়া ও লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করা হয়। এর ভিত্তিতে সম্প্রতি টঙ্গী-আখাউড়া ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সম্ভাব্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান।

এতে বলা হয়েছে, টঙ্গী থেকে ভৈরববাজার হয়ে আখাউড়া সেকশনটির দৈর্ঘ্য ৯৭ দশমিক ১০ কিলোমিটার। টঙ্গী থেকে ভৈরববাজার জংশন পর্যন্ত নবনির্মিত অংশটি তথা আপ লাইনটিতে ৯০ পাউন্ডের রেল ব্যবহার করা হয়েছে। আর পুরনো তথা ডাউন লাইনটিতে ৭৫ পাউন্ডের রেল রয়েছে। তবে নবনির্মিত লাইনটি ভবিষ্যতে ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তরের অপশন আছে।

এ রুটে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর ও অবকাঠামোগত স্থাপনা রয়েছে, যেমনÑঘোড়াশাল, নরসিংদী, ভৈরববাজার নদীবন্দর, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আখাউড়া। বর্তমানে টঙ্গী-ভৈরববাজার-আখাউড়া রুটে দৈনিক ৫২টি ট্রেন চলাচলের ক্যাপাসিটি রয়েছে। তবে মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজ বা ব্রডগেজে রূপান্তর করে গেলে ট্রেন চলাচলের গতি বাড়ানো যাবে। এতে ৬০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানো হলে দৈনিক ১০১টি ও ৮০ কিলোমিটার গতিতে চালালে ১৩০টি ট্রেন দৈনিক এ রুটে পরিচালনা করা সম্ভব।

এদিকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হলে একই রেলপথে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ ট্রেন পরিচালনা করা যাবে। তবে ব্রডগেজ চালানোর হার বাড়ালে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়বে। পাশাপাশি কনটেইনার পরিবহন বৃদ্ধির মাধ্যমে রেলের আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। এছাড়া মাতারবাড়ীর বন্দর চালু হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বৃদ্ধি পাবে। সে সময় এ রেলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রতিবেদনে মিটারগেজ ট্রেনের ডিজাইন স্পিড ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার ও ব্রডগেজ ট্রেন ১২০ কিলোমিটার ধরা হয়েছে। তবে পরিচালনাগত স্পিড ধরা হয়েছে মিটারগেজ ট্রেনে ঘণ্টায় ৮০ ও ব্রডগেজ ট্রেনে ১০০ কিলোমিটার। এর পরিপ্রেক্ষিতে টঙ্গী-ভৈরববাজার-আখাউড়া ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৩০ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

এদিকে নির্মাণব্যয়ের মধ্যে জমির কাজে ৬৮২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, ট্রাক তথা রেলপথ নির্মাণে তিন হাজার ৫১ কেটি ১১ লাখ টাকা, সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশনে ৫৪৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে এক হাজার ৭০৩ কেটি ৩১ লাখ টাকা, অন্যান্য কাজে ২৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, জেনারেল রিকোয়ারমেন্ট বাবদ ১৫৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা, পরিবেশগত সেফগার্ড খাতে ১৮ কোটি ১২ লাক টাকা এবং দৈনিক কাজে (প্রভিশনাল) ছয় কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয় হবে।

এর বাইরে পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, কর ও অন্যান্য খাতে ব্যয় ৮০২ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ৮ শতাংশ ফিজিক্যাল কনটিনজেন্সি বাবদ ৬৭২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ও ২ শতাংশ প্রাইস কনটিনজেন্সি বাবদ ১৬৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে টঙ্গী-ভৈরববাজার-আখাউড়া ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাাণের ব্যয় হবে ৯ হাজার ২৫১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বা ১১১ কোটি ৫৮ লাখ ডলার।

সূত্রমতে, প্রকল্পটির জন্য কমপক্ষে ৯০ কোটি ডলার বা সাত হাজার ৪৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকা বৈদেশিক সহায়তা দরকার। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আংশিক তথা মাত্র ২০ কোটি ডলার (এক হাজার ৬৫৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা) ঋণ দিতে আগ্রহী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। যদিও বাকি ৭০ কোটি ডলার ঋণের জন্য সংস্থাটিকে প্রস্তাব দিয়েছে রেলওয়ে। জানতে চাইলে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগের পরিকল্পনা সঠিক ছিল না। তাই ব্যয় সাশ্রয়ের যুক্তিতে শুধু মিটারগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ করা হয়েছিল। সাধারণত একটি রেলপথ থেকে ২০-৩০ বছর সেবা পাওয়া যায়। সেখানে নতুন নির্মিত রেলপথটি পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে তুলে ফেলতে হবে। এতে একদিকে অর্থের অপচয় হবে, অন্যদিকে নতুন রেলপথ নির্মাণ করতে গেলে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে।


সূত্র:শেয়ার বিজ, মার্চ ২৫, ২০২১

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।