তীব্র সংকটে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল : একদিনেই কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনের ৩ ইঞ্জিন বিকল!

তীব্র সংকটে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল : একদিনেই কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনের ৩ ইঞ্জিন বিকল!

গতকাল সকাল ৮টা ২০ মিনিটে সিলেটের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন কালনী এক্সপ্রেস। কিন্তু পথিমধ্যে পরপর তিনবার বিকল হয় ট্রেনটির ইঞ্জিন। এতে গন্তব্যে পৌঁছতে ট্রেনটির সাড়ে ৫ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। এ কারণে বিভিন্ন সেকশনে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে বেশ কয়েকটি ট্রেন।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৭টায় সিলেট থেকে কালনী এক্সপ্রেস (৭৭৪ নং ট্রেন) ছেড়ে আসে ঢাকার উদ্দেশে। ৮টা ২০ মিনিটে ট্রেনটি কুলাউড়া পৌঁছলে ২৯১৮ নং ইঞ্জিনটি বিকল হয়ে যায়। এরপর ২৩০৭ নং রিলিফ ইঞ্জিন দেয়া হয় কালনী এক্সপ্রেসকে। কুলাউড়া স্টেশনে রিলিফ ইঞ্জিনটি লাগানোর পর সেটিও বিকল হয়ে যায়। এরপর ঢাকা ছেড়ে আসা সুরমা মেইল ট্রেন থেকে ইঞ্জিন নিয়ে (ট্রেনটিকে লাইনে বসিয়ে রেখে ইঞ্জিন অন্যত্র সরিয়ে নেয়া) কালনীতে লাগানো হয়। সুরমা মেইলের ২৪১২ নং ইঞ্জিনটি দিয়ে কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনটি ভানুগাছ-শ্রীমঙ্গল সেকশনে গিয়ে বিকল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল স্টেশনে আটকে থাকা ১৩ নং জালালাবাদ এক্সপ্রেসের ২৬০৮ নং ইঞ্জিনটি দিয়ে লাইন ক্লিয়ার করা হয় বেলা ২টা ১০ মিনিটে। পরে আখাউড়া থেকে ২৯১০ নং রিজার্ভ ইঞ্জিন পাঠিয়ে কালনী এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনটিকে গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় বেলা ২টা ২৫ মিনিটে।

রেলের অপারেশন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, একদিনে একটি ট্রেনের তিনটি ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা বিরল। হঠাৎ করেই ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা বাড়ছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হচ্ছে, যা একই রুটের অন্যান্য ট্রেনেরও শিডিউল বিপর্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে রেলের ইঞ্জিন সরবরাহ ও মেরামত বাড়ানো না গেলে রেলসেবা ভঙ্গুর হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

জানা গেছে, সর্বশেষ মে মাসে রেকর্ডসংখ্যক ইঞ্জিন বিকল হয় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে। আন্তঃনগর, মেইল, লোকাল ও গুডস ট্রেন মিলিয়ে ২৯টি ইঞ্জিন বিকল হয়। অর্থাৎ প্রতিদিনই কোনো না কোনো ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হচ্ছে। ২৯টি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকলের কারণে আরো ১৭টি ট্রেন বিভিন্ন সেকশনে বিলম্বিত হয়েছে। ২৯টি বিকলের ঘটনায় আন্তঃনগর ট্রেনেই সবচেয়ে বেশি ১১টি ইঞ্জিন বিকল হয়েছে।

রেলওয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে লোকোমোটিভের সংখ্যা ১৫০টি। এর মধ্যে কার্যকর রয়েছে ১০৫টি। এছাড়া ওয়ার্কশপে রয়েছে ২০, মেরামতের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে ২৫টি। যদিও সর্বশেষ ওয়ার্কিং টাইম টেবিল অনুযায়ী বিদ্যমান ট্রেনগুলো স্বাভাবিক পরিচালনায় ন্যূনতম ১১১ থেকে ১১৫টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন। তবে ১০০টি ইঞ্জিন দিয়ে কোনো রকমে ট্রেন পরিচালনা করে আসছে রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ। সর্বশেষ গতকাল ১১১টি ইঞ্জিনের চাহিদার বিপরীতে প্রকৌশল বিভাগ থেকে সরবরাহ দেয়া হয়েছে মাত্র ৯৮টি। এ কারণে প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় স্বল্প ইঞ্জিন সরবরাহ ও ইঞ্জিন বিকলের ঘটনায় রেলের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে বলে স্বীকার করেছে খোদ প্রকৌশল বিভাগও।

রেলের পাওয়ার সেকশনের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পূর্বাঞ্চল রেলের ১৫০টির মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশ বা ৪৭টি ইঞ্জিন অর্থনৈতিক আয়ুষ্কালের মধ্যে রয়েছে (২০ বছর)। এছাড়া ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ৩৪টি এবং ৩০ বছরের অধিক বয়সী ইঞ্জিন রয়েছে ৬৯টি। অর্থাৎ পূর্বাঞ্চল রেলের মোট ইঞ্জিনের ১০৩টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। ফলে যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোর শিডিউল কোনো রকমে ঠিক রাখা হলেও রেলের জন্য লাভজনক মালবাহী ট্রেনগুলো বসিয়ে রাখা হয়। পশ্চিমাঞ্চলে ১২৪টি ইঞ্জিন থাকলেও নিয়মিত সর্বোচ্চ ১০০টি পাওয়া যায়। পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ থাকায় বিভিন্ন সময় শিডিউল টাইমে গন্তব্যে পৌঁছতে না পারাসহ পথিমধ্যে ইঞ্জিন বিকলের সংখ্যা বাড়ছে বলে স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।

পূর্বাঞ্চলে রেলের বহরে সর্বশেষ ইঞ্জিন যুক্ত হয় ২০১১ সালে। ওই সময় দক্ষিণ কোরিয়া থেকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ১১টি এবং ২০১৩ সালে পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ৩৯টি ইঞ্জিন আমদানি করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও রেলের বহরে কোনো ইঞ্জিন আমদানি হয়নি। এতে চাহিদা বাড়লেও ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় লাভজনক রুটে ট্রেন বৃদ্ধি করতে পারছে না রেলওয়ে। এমনকি নির্ধারিত রুটের ট্রেনগুলোয় শিডিউল বিপর্যয়, ট্রেনের যাত্রা বাতিল ছাড়াও পথিমধ্যে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাত্রী ভোগান্তির পরিমাণ বাড়ছে।

ইঞ্জিন বিকলের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ঈদের কারণে ইঞ্জিনগুলোর ওপর বিশেষ চাপ পড়েছে। সাপ্তাহিক বন্ধ না থাকায় দুই সপ্তাহ ধরে টানা চলতে থাকা ইঞ্জিনগুলো হঠাৎ করেই বিকল হচ্ছে। বর্তমানে রেলওয়ের ওয়ার্কশপও ঈদ-পরবর্তী ছুটি কাটিয়ে খোলা হয়েছে। আশা করছি, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সুত্র:বণিক বার্তা, জুন ১৯, ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।