শিরোনাম

ট্রেনের ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা বেড়েই চলেছে

ট্রেনের ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা বেড়েই চলেছে

নূপুর দেব:

নোয়াখালী রেলস্টেশন থেকে আন্ত নগর ট্রেন উপকূল এক্সপ্রেস (৭১১ নম্বর) প্রতিদিন সকাল ৬টায় ছেড়ে দুুপুর ১১টা ৫০ মিনিটে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছানোর কথা সময়সূচিতে উল্লেখ আছে। ১৬ বগিতে (কোচ) যাত্রী নিয়ে গত মঙ্গলবার ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে গেলেও পথিমধ্যে ইঞ্জিনের ত্রুটিজনিত কারণে তিন ঘণ্টা ১৫ মিনিট বিলম্বে বিকেল ৩টায় ঢাকায় পৌঁছায়।

ঢাকা থেকে সোমবার রাত সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসা চট্টগ্রাম মেইলও ইঞ্জিনের ত্রুটির কারণে নির্ধারিত সময়সূচি থেকে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট বিলম্বে গন্তব্যে পৌঁছায়। ট্রেনটি মঙ্গলবার সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে আসার কথা ছিল। কিন্তু এসেছে সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে।

সিলেট থেকে সোমবার রাত ১০টা ৫০ মিনিটে মেইল ট্রেন জালালাবাদ এক্সপ্রেস চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। যাত্রীবাহী চার বগির ট্রেনটি গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে আসার সময়সূচি থাকলেও চার ঘণ্টা পাঁচ মিনিট বিলম্বিত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইঞ্জিনে ত্রুটির কারণে এই ট্রেনগুলোর যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে। শুধু এই ট্রেনগুলোই নয়, ইঞ্জিনে ত্রুটির কারণে ট্রেনের সময়সূচি রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে ট্রেনে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। গত ১ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত ১১ দিনে ১২টি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে তিনটি আন্ত নগর, সাতটি মেইল ও দুটি মালামাল পরিবহনের ট্রেন রয়েছে। ইঞ্জিন বিকলের কারণে এসব ট্রেনের মধ্যে একটিতে সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা ১০ মিনিট যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে। এ ছাড়া ওই ১২টি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকলের প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া আরো পাঁচটি ট্রেনে। এই ট্রেনগুলোর (পাঁচটি) মধ্যে একটি সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা ২৭ মিনিট বিলম্বিত হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের জুন মাসে ২৮টি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হলেও চলতি বছরের এক মাসেই ৩৩টি, ২০১৭ সালের মে মাসে ১৮টি ও ২০১৮ সালের মে মাসে ২৫টি, এপ্রিল ২০১৭ সালে ১৮টি ও এপ্রিল ২০১৮ সালে ৩২টি, গত বছর মার্চে ১৩টি হলেও ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সালে ১৫টি ও ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে ৩১টি, জানুয়ারি ২০১৭ সালে ১৩টি ও জানুয়ারি ২০১৮ সালে ২১টি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়েছে। আর ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হলে সেগুলো খুলে আবার ইঞ্জিন না লাগানো পর্যন্ত ট্রেনগুলোর যাত্রা বিলম্বিত হয়।

চলন্ত ট্রেনে ইঞ্জিন বিকল, ইঞ্জিনের ত্রুটিসহ ইঞ্জিনসংকটের কারণেও বিভিন্ন ট্রেনের যাত্রা বিলম্বিত হচ্ছে অহরহ। পূর্বাঞ্চল রেলের হিসাব মতে, সর্বশেষ গত ১ জুলাই থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত দিনে সর্বোচ্চ ৩৮টি ট্রেনের যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে। দেখা গেছে, ওই ট্রেনগুলোর মধ্যে একটির সর্বনিম্ন ২০ মিনিট এবং আরেকটির সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা ৪০ মিনিট বিলম্বিত হয়েছে যাত্রা। তবে এর মধ্যে বেশির ভাগ ট্রেন ছাড়তে বিলম্ব হয়েছে বিলম্বে ইঞ্জিন আসার কারণে। গত ৮ জুলাই সংকটের কথা জানিয়ে একটি চিঠি পূর্ব রেলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়েছে চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের দপ্তর থেকে।

জানা গেছে, ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ট্রেন ইঞ্জিন বিলম্বে আসার কারণে আন্ত নগর, মেইল/লোকাল এবং গুডস ট্রেন বিলম্বে ছাড়তে হচ্ছে। এ কারণে সময়ানুবর্তিতা বিঘ্নিত, রেলওয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নসহ যাত্রীসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

এর আগে গত ১৩ মে একই দপ্তর থেকে পথিমধ্যে ট্রেন ইঞ্জিন বিকল এবং অন্যান্য ত্রুটির কারণে ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে জানিয়ে আরেকটি চিঠি দেওয়া হয় প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলীকে। এ চিঠিতে গত ১ এপ্রিল থেকে ১৩ মে পর্যন্ত ৪৫টি চলন্ত ট্রেনে ইঞ্জিন বিকলের কারণে যাত্রা বিলম্বিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। আবার এসব ট্রেনের কারণে আরো অনেক ট্রেনেরও যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। ওই চিঠিতে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করতে ইঞ্জিনের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূরীকরণসহ এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে পূর্ব রেলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলীকে।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ নিয়ে গঠিত পূর্বাঞ্চল রেলে বিভিন্ন পথে আন্ত নগর, মেইল এক্সপ্রেস, লোকাল ও গুডস ট্রেন চলাচল করতে প্রতিদিন ১১১টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন। এর বিপরীতে প্রতিদিন ইঞ্জিন থাকছে ১০০ থেকে ১০৩টি। গত মঙ্গলবার ছিল ১০৩টি ইঞ্জিন। ইঞ্জিনসংকটের কারণে জোড়াতালি দিয়ে চলছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে। হঠাৎস্য চলন্ত ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে ভেঙে পড়ে বিভিন্ন ট্রেনের সময়সূচি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীরা ট্রেনে বসেই সময় অতিবাহিত করছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ইঞ্জিনের সংকট সামনে আরো প্রকট হবে। ইঞ্জিন বিকলের হার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সংকট পুরোপুরি উত্তরণের জন্য বড় কোনো পদক্ষেপ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রেল কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে ইঞ্জিনসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অতিরিক্ত ইঞ্জিন নেই। বরং নিয়মিত যে ইঞ্জিনগুলো দিয়ে ট্রেনগুলো চলাচল করছে, সেখান থেকেও ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাচ্ছে। ইঞ্জিনসংকটের সমাধান না হলে সামনে নিয়মিত ট্রেন চলাচল করা আরো দুরূহ হয়ে পড়বে।

চলন্ত বিভিন্ন ট্রেনে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ ফারুক আহমেদ। এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার রাতে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ইঞ্জিন বিকল হলে তা আবার মেরামত করা হচ্ছে। অনেক পুরনো ইঞ্জিন আছে। এগুলো ত্রুটি দেখা গেলে মেরামত করে ব্যবহার করা হয়। ইঞ্জিনের সংকট রয়েছে। তা লাঘবে নতুন ইঞ্জিন আমদানি করা হচ্ছে। নতুন ইঞ্জিন এলে সংকট কেটে যাবে।

একই বিষয়ে জানতে একই অঞ্চলের প্রধান যন্ত্র প্রকৌশলী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। পরে তাঁকে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।

সুত্র: কালের কন্ঠ, ১৯ জুলাই, ২০১৮


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।