চুক্তির তিন বছর পেরুনোয় ১৬% বেশি দাম চায় হুন্দাই

চুক্তির তিন বছর পেরুনোয় ১৬% বেশি দাম চায় হুন্দাই

ইসমাইল আলী: ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনায় ২০১১ সালে প্রকল্প নেয় রেলওয়ে। আর ২০১৮ সালের অক্টোবরে ইঞ্জিনগুলো কেনায় দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে চুক্তি সই করে রেলওয়ে। তবে ঋণচুক্তি না হওয়ায় এখনও ইঞ্জিন কেনা হয়নি। এরই মধ্যে তিন বছর পেরিয়ে যাওয়ায় ইঞ্জিনগুলো সরবরাহে ১৬ শতাংশ বেশি দাম চাইছে হুন্দাই রোটেম।

চুক্তিমূল্যের চেয়ে বেশি দামে ইঞ্জিন কেনার সুযোগ না থাকায় হুন্দাইয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়নি রেলওয়ে। আর ইঞ্জিনগুলো কেনায় দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে কঠিন শর্তে ঋণ নেয়ার কথা ছিল। তবে এ ঋণ প্রস্তাবে আপত্তি তুলেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এক্ষেত্রে সহজ শর্তে বিকল্প কোনো উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ইঞ্জিনগুলো কেনার প্রক্রিয়া ঝুলে যেতে পারে।

তথ্যমতে, ৭০টি ইঞ্জিন কেনায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর প্রায় ২৩ কোটি ৯৪ লাখ ৫৭ হাজার ডলার বা দুই হাজার ৩৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বাণিজ্যিক চুক্তি সই করে রেলওয়ে। ১৮ থেকে ৬০ মাসের মধ্যে ইঞ্জিনগুলো সরবরাহ করার কথা ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমের। বর্তমানে ইঞ্জিনগুলো সরবরাহে ২৭ কোটি ৭৮ লাখ বা দুই হাজার ৩৮৮ কোটি ৮২ লাখ ডলার চাইছে হুন্দাই।

এদিকে ২০১৮ সালে ইঞ্জিনগুলো কেনায় চুক্তি হলেও মূলত ২০১৫ সালে দরপত্র দাখিল করেছিল হুন্দাই রোটেম। এতে ছয় বছর পেরিয়ে যাওয়ায় ভেন্ডর ও লেবার চার্জ এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে হুন্দাই ইঞ্জিনগুলোর সরবরাহ মূল্য ১৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল গত আগস্টে। তবে চুক্তির আওতায় এ ধরনের সুযোগ না থাকায় ইঞ্জিনের সরবরাহ মূল্য বাড়ানোয় আপত্তি জানায় রেলওয়ে। এ বিষয়ে হুন্দাইকে চিঠি দেয়া হলেও তারা উত্তর দেয়নি।

যদিও মূল্য বৃদ্ধি করা না হলে ইঞ্জিন সরবরাহে মৌখিকভাবে অপারগতা প্রকাশ করে হুন্দাই রোটেম। এক্ষেত্রে তারা দরপত্রের সঙ্গে জমা দেয়া ব্যাংক গ্যারান্টি তথা পিজি ফেরত চায়। তবে লিখিতভাবে এ সিদ্ধান্ত জানায়নি কোম্পানিটি। আবার রাজধানীর রেলভবনে অবস্থিত প্রকল্প অফিস থেকে পিজি বুঝে নিতে হুন্দাইয়ের দায়িত্বশীল কাউকে আসতে বলা হলেও তারা কেউ

যোগাযোগ করেনি। ফলে প্রকল্পটির কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে আছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ৭০ লোকোমোটিভ প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ মাহবুব চৌধুরী শেয়ার বিজকে বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ইঞ্জিন কেনায় বাড়তি মূল্য দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি হুন্দাইকে জানানো হয়েছে। তবে তারা লিখিতভাবে কিছু জানায়নি। যদি তারা আগের দরে ইঞ্জিন সরবরাহ করতে সম্মত না হয়, তাহলে দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করা হবে।

এদিকে ৭০ ইঞ্জিনের জন্য ঋণ নেয়ার প্রস্তাবে সম্প্রতি আপত্তি তোলে ইআরডি। এক্ষেত্রে কঠিন শর্তের অনমনীয় ঋণের পরিবর্তে সহজ শর্তে নমনীয় ঋণ নেয়ার সুপারিশ করা হয়। রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে এ সুপারিশ করে ইআরডি।

এতে বলা হয়েছে, ‘কোরিয়ান কোম্পানি কর্তৃক প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ায় প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য সরকার কর্তৃক এত উচ্চ হার সুদে অনমনীয় গ্রহণের পরিবর্তে কোরিয়ান সরকারের নমনীয় উৎসের বা অন্য কোনো উৎসের নমনীয় প্রকৃতির ঋণ সংগ্রহ করা বাঞ্ছনীয় হবে।’ এর সঙ্গে অর্থ বিভাগের মতামতও যুক্ত করে দেয় ইআরডি। অর্থ বিভাগও পৃথক চিঠিতে একই মতামত ব্যক্ত করেছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ইঞ্জিনগুলো কেনার জন্য বিকল্প উৎস খুঁজতে নতুন করে পিডিপিপি (প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) তৈরি করে ইআরডিতে পাঠাতে নির্দেশনা দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

সূত্রমতে, ২০১৮ সালের ৭ জুন ইঞ্জিনগুলো কেনার ঋণ প্রস্তাবটি অনুমোদনে ইআরডি পাঠায় রেলপথ মন্ত্রণালয়। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (এসসিবি) ও জাপানের সুমিতোমো মিটসুই ব্যাংকিং করপোরেশন (এসএমবিসি) থেকে নেয়া হচ্ছে এ কঠিন শর্তের ঋণ। সরবরাহকারীর ঋণ তথা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় নেয়া এ ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি দুই লাখ ৩২ হাজার ডলার।

২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর ইআরডি জানায়, ঋণের বিষয়ে এসসিবির সঙ্গে দরকষাকষি সম্পন্ন হয়েছে। তবে তা কঠিন শর্তের হওয়ায় অনমনীয় ঋণবিষয়ক স্থায়ী কমিটির অনুমোদন গ্রহণের অনুরোধ করা হয়। এজন্য ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি অনমনীয় ঋণ-বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভায় এ ঋণের বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে কিছু জটিলতা থাকায় তার ব্যাখ্যা চেয়ে প্রস্তাবটি ফেরত পাঠায় কমিটি।

করোনার কারণে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়টি অনেক দিন ঝুলে ছিল। তবে গত বছর ২৭ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন অনমনীয় ঋণ-বিষয়ক স্থায়ী কমিটি ঋণ প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। এরপর এসসিবি ঋণচুক্তি খসড়া প্রস্তাবনা পাঠালে বিভিন্ন শর্ত নিয়ে আবার দরকষাকষি শুরু করে ইআরডি। এক্ষেত্রে রেলপথ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত চাওয়া হয়। সবার মতামত পাওয়ার চূড়ান্ত বিবেচনায় ঋণটি নিয়ে আপত্তি তোলে ইআরডি।

দরপত্রের শর্তানুযায়ী, ৭০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৩০টি সম্পূর্ণ (ফিটিং) অবস্থায় সরবরাহ করা হবে। বাকি ইঞ্জিনগুলোর মধ্যে ২৫টি অর্ধ উন্মুক্ত (হাফ নকডাউন) ও বাকি ১৫টি পুরো উš§ুক্ত (ফুল নকডাউন) অবস্থায় সরবরাহ করা হবে। এ ইঞ্জিনগুলো দেশে এনে রেলের নিজস্ব ওয়ার্কশপে সংযোজন করা হবে।

সূত্র:শেয়ার বিজ,  ২০ নভেম্বর ২০২১


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।