শিরোনাম

‘গালগল্প’ শুনিয়ে কেনা, ব্যবহার নামকাওয়াস্তে

‘গালগল্প’ শুনিয়ে কেনা, ব্যবহার নামকাওয়াস্তে

আনোয়ার হোসেন:

সরেজমিনে দেখে ও রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমলাপুরের প্ল্যান্টটিতে এখন সারা দিনে দুই থেকে তিনটি ট্রেনের ৪০ থেকে ৫০টি কোচ ধোয়া হয়। বাকিগুলো পুরোনো পদ্ধতিতেই পরিষ্কার করেন শ্রমিকেরা। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র চালু হলে শ্রমিক কম লাগবে, জনবলের পেছনে ব্যয় কমবে—এই দাবিও যথাযথ নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, রেলওয়ে আগের মতো সংখ্যায় শ্রমিক দিয়ে ট্রেন ধোয়ার কাজ করছে।

শ্রমিকেরা বলছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো, যন্ত্র দিয়ে ট্রেন ধোয়ার পরে পানের পিক, চুইংগামসহ কোচের গায়ে লেগে থাকা অন্যান্য দাগ ব্রাশ দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে হয়। ট্রেনের ভেতর ও শৌচাগারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয় পুরোনো পদ্ধতিতেই। সব মিলিয়ে রেলওয়ের ব্যয় কমেনি, বরং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র চালাতে গিয়ে বিদ্যুৎ বাবদ খরচ বেশি হচ্ছে।

এই যন্ত্র কেনার সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিচালক ফকির মো. মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, যন্ত্রে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। তবে ব্যবহারের সুবিধার অভাব রয়েছে। এটা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এ জন্য বেশি ট্রেন ধোয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, প্রকল্প নেওয়ার সময় কেন সুবিধার অভাবের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। জবাবে তিনি বলেন, এটা আগেই ভাবা উচিত ছিল।

যন্ত্র কেনা হয়েছে ঋণে

রেলওয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ২০০টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ কোচ এবং দুটি স্বয়ংক্রিয় ধৌতকরণ ব্যবস্থা কিনতে ১ হাজার
৩৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পের আওতায় ইন্দোনেশিয়া থেকে কোচ আনা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় ধৌতকরণ ব্যবস্থা কেনা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

এই ব্যবস্থা কেনার জন্য শুরুতে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল প্রায় ৩২ কোটি টাকার। পরে যন্ত্রপাতি কিনে এনে বসানো পর্যন্ত প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এই প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

উল্লেখ্য, বর্তমানে রেলওয়ের ৪১টি প্রকল্প চলমান। এসব প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর বড় অংশই বিদেশি সংস্থা বা বিভিন্ন দেশ থেকে বেশ চড়া সুদে নেওয়া ঋণ। এই ঋণ দিয়ে বরাবরই বিলাসী ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে রেলওয়ের বিরুদ্ধে।

সরেজমিন

কমলাপুর স্টেশনে আগে থেকেই ট্রেন ধোয়ামোছার জন্য নির্ধারিত জায়গা আছে। এই জায়গায় রেললাইনগুলো এমনভাবে উঁচু করে বসানো হয়েছে, যাতে ট্রেন রাখলে এর চাকাসহ নিচের অংশে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা থাকে। ধোয়ার জন্য ট্রেন এই লাইনে ওঠানোর পর কোচগুলো রেখে ইঞ্জিন সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর পাইপ দিয়ে পানি ছিটিয়ে ঘষে ঘষে কোচ পরিষ্কার করেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।

এই ধৌতকরণের জায়গার একটি লাইনে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাটি বসানো হয়েছে, যার দুই পাশে টিনের বেড়া, ওপরে ছাউনি। এর ভেতর একসঙ্গে ১৩ থেকে ১৪টি কোচ প্রবেশ করতে পারে। সরেজমিনে গত সোমবার বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, স্বয়ংক্রিয় ধৌতকরণ প্ল্যান্টটিতে কোনো ট্রেন নেই। তিন থেকে চারজন কর্মী বালু ও ময়লা পরিষ্কারের কাজ করছেন। তাঁরা জানান, ওই দিন সকালে এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় দুটি ট্রেন ধোয়া হয়। এতে ‘ওয়াশিং প্ল্যান্ট’টিতে ময়লা জমে যায়। সেগুলো পরিষ্কার করতে হচ্ছে।

স্বয়ংক্রিয় ধৌতকরণ ব্যবস্থার পাশেই শ্রমিকদের হাতে পরিষ্কার করার লাইনগুলোতে সার বেঁধে ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। শ্রমিকেরা সেগুলো পরিষ্কারের কাজ করছিলেন।

সেই পারদর্শিতা বাস্তবে নেই

রেলে আন্তনগর ট্রেনের কোচ আছে প্রায় ৭০০টি। এগুলো দিয়ে ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে ১০০–এর মতো ট্রেন নানা গন্তব্যে চলাচল করে। এর বাইরে আছে মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেন। এর মধ্যে আন্তনগর ট্রেনই প্রতিনিয়ত ধোয়া হয়। কাজটি করা হয় যাত্রা শুরুর স্টেশনে।

ট্রেন পরিচ্ছন্নতার কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা রেলওয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, কমলাপুরে দিনে ২৫ থেকে ২৬টি ট্রেন (রেক) ধোয়ামোছার কাজ করতে হয়। সব ট্রেনই সকালে ও সন্ধ্যায় অল্প সময়ের মধ্যে ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় যে ওয়াশিং প্ল্যান্ট বসানো হয়েছে, তাতে দু-তিনটির বেশি ট্রেন ধোয়া যাচ্ছে না। এর দুটি কারণ উল্লেখ করেন তিনি—প্রথমত, যন্ত্রটি দিয়ে বেশি ট্রেন ধুতে গেলে সেটি বিকল হওয়ার ভয় আছে। দ্বিতীয়ত, ওয়াশিং প্ল্যান্টে ট্রেন ধোয়ার পর আবার শ্রমিকদের দিয়ে সেই ট্রেন পরিষ্কার করতে হয়।

রেলওয়ে সূত্র বলছে, স্বয়ংক্রিয় ওয়াশিং প্ল্যান্টে মূলত ট্রেনের দরজা-জানালা বন্ধ করে বাইরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটানো হয়। এরপর দুই পাশের দুটি বড় ব্রাশ দিয়ে কোচ মুছে দেওয়া হয়। শেষে ৯টি পাখা দিয়ে জোরে হাওয়া ছাড়ার মাধ্যমে কোচ শুকানো হয়। কিন্তু এরপর শ্রমিকদের ভেতরে ঝাড়ু দেওয়া ও শৌচাগার পরিষ্কার এবং ট্রেনের গায়ে লেগে থাকা পানের পিক বা চুইংগামের মতো দাগ পরিষ্কার করতে হয়।

শ্রমিক কমেনি

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ট্রেন ধোয়ামোছার কাজটি দীর্ঘদিন ধরেই কিছু অস্থায়ী শ্রমিক করে আসছেন। কমলাপুরে তিন পালায় প্রায় ৭০ জন কর্মী এই কাজ করেন। একেকজনের বেতন মাসে ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা। স্বয়ংক্রিয় ওয়াশিং প্ল্যান্ট চালু হলে শ্রমিকের চাহিদা কমে যাবে বলা হলেও তা হয়নি। এখনো আগের সমান শ্রমিকই কাজ করেন।

রেলের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কমলাপুরে একসঙ্গে পাঁচ-ছয়টি স্বয়ংক্রিয় ওয়াশিং প্ল্যান্ট বসালে সব ট্রেন ধোয়া সম্ভব হবে। তবে এরপরও শ্রমিক লাগবে। বিদ্যুৎ ব্যয় বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, এখনই এই যন্ত্রে নানা ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। কত দিন সচল থাকবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। রাজশাহীর প্ল্যান্টটি বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে। সেটির পাইপ ফুটো হয়ে গেছে। যদিও প্রকল্প পরিচালক দাবি করেন, পাইপ মেরামত করা হয়েছে।

স্বয়ংক্রিয় ওয়াশিং প্ল্যান্ট চালুর সময় পানির ব্যয় কমে যাবে বলে দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছিল, সনাতন পদ্ধতিতে যে পরিমাণ পানি খরচ হয়, এর চেয়ে প্রায় ৯০ শতাংশ কম পানি লাগবে। তা ছাড়া একবার ব্যবহৃত পানি শোধন করে আবার কাজে লাগানো যাবে। সরেজমিনে পানি পুনরায় ব্যবহারের কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

রেলের কোচ ধোয়ার কাজে নিয়োজিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা হিসাব দেন, একেকটি স্বয়ংক্রিয় ওয়াশিং প্ল্যান্টের পেছনে ১৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ৭০ জন শ্রমিকের পেছনে বছরে ব্যয় ১ কোটি টাকার কিছু বেশি (একেকজনের বেতন মাসে ১২ হাজার টাকা ধরে)। ফলে যন্ত্র কেনার সমপরিমাণ টাকা দিয়ে সনাতন ব্যবস্থায় প্রায় ১৮ বছর শ্রমিকদের বেতন দেওয়া যেত। ওই কর্মকর্তার প্রশ্ন, এই যন্ত্র কি ১৮ বছর চলবে?

‘কেউ হয়তো চাপ দিয়েছে’

রেলওয়ে সূত্র বলছে, তাদের সব বড় প্রকল্পে কিছু যন্ত্র কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়, যা তেমন প্রয়োজনীয় নয়। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা প্রভাবশালীদের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে গিয়েই এসব কেনাকাটা করা হয়। যেমন গত আট বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে চারটি ‘ট্যাম্পিং মেশিন’ (লাইন মেরামতে ব্যবহৃত) কেনা হয়েছে। এসব যন্ত্রের প্রতিটির দাম ১৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা। এখন মোটামুটি সব কটিই বিকল।

সূত্র জানায়, ওয়াশিং প্ল্যান্ট কেনা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এনএস করপোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে। বাংলাদেশে এর সহযোগী ঠিকাদার নেক্সট জেনারেশন গ্রাফিকস লিমিটেড। সূত্রের দাবি, এই কেনাকাটার পেছনে ভূমিকায় ছিলেন চট্টগ্রামের একজন প্রভাবশালী সাংসদ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, আসলে এসব যন্ত্র বা যান কেনার জন্য পেছন থেকে কেউ একজন চাপ (পুশ) দিতে থাকেন। স্বয়ংক্রিয় ওয়াশিং প্ল্যান্টও এমনই প্রকল্প হতে পারে। যন্ত্র কিনতে হবে। তবে তা যদি উদ্দেশ্য পূরণ না করতে পারে, তাহলে কিনে লাভ কী। তিনি আরও বলেন, রেলে ডেমু ট্রেন একটি লোকসানি প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। এর কারণ, এটি কেনার আগে দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

উল্লেখ্য, ৬৩৪ কোটি টাকায় কেনা ২০টি ডেমু ট্রেনের বেশির ভাগই এখন বিকল। আর রেলওয়ের বছরে লোকসান প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।