আমদানিকৃত ট্রেনের কোচ কেনায় কারসাজি

আমদানিকৃত ট্রেনের কোচ কেনায় কারসাজি

মাকসুদ আহমদ:
ইন্দোনেশিয়া থেকে লাল-সবুজের আদলে আমদানি করা ১শ’ কোচ নিয়ে ফায়দা লোটা ও কারসাজির তথ্য ক্রমশ ফাঁস হতে শুরু হয়েছে। ডাইনিং কার বা খাবার গাড়িতে ২৫টি সিট থাকার কথা থাকলেও রয়েছে মাত্র ১৫টি। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার ইনকা কর্পোরেশনকে ২৫টি সিটের নক্সা অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। একটি কোচে সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। খাবার গাড়ি হিসেবে ১৩টি কোচ আমদানি করা হয়েছে। আমদানি করা এসব কোচে মোট ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ৩০ লাখ। উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ জুন থেকে এসব কোচের ব্যবহার শুরু হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেন দিয়ে। আরও অভিযোগ রয়েছে, এসব ইন্দোনেশিয়ান কোচের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স এমআরটি ইন্টারন্যাশনালকে বাদ দিতে নানা অভিযোগ দেখিয়ে এডিজি (আরএস) সামছুজ্জামানের পক্ষের রাজশাহীর এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে নিম্নমানের আরও ১শ’ ইন্দোনেশিয়ান কোচ আমদানির প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে, রেল রুটে সবচেয়ে দ্রুততম ট্রেন সোনার বাংলাসহ দেশের দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে চলমান এক্সপ্রেস ট্রেনগুলোতে ব্যবহৃত ট্রেনের কোচগুলো সার্ভিস চুক্তি মেয়াদের মধ্যেই অচলাবস্থার কবলে পড়ছে। প্রকল্প পরিচালকের অর্থবাণিজ্যের কারণেই এসব কোচ অচলাবস্থার কবলে পড়ছে বলে পরিচালন বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে যাত্রী সুবিধা দিতে পারছে না রেল কর্তৃপক্ষ। উদ্বোধনের মাত্র এক মাসের মধ্যেই এসব কোচের ত্রুটি- বিচ্যুতি ও পরিচালন ক্ষমতা কমে এলেও ২ বছরের সার্ভিস চুক্তি মেয়াদে থাকা এসব কোচের বিষয়ে এক বছরেও কোন সিদ্ধান্ত নেননি প্রকল্প পরিচালক। তবে সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে ইন্দোনেশিয়ায় পরিভ্রমণকারী কর্মকর্তাদের দফায় দফায় তলব করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও কেন আরও ১০০টি কোন কেনার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ এসব কোচের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ও রেল ভবনে কর্মরত কয়েক কর্মকর্তার দুর্নীতির কারণে সরকার ক্ষতির সম্মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অপরদিকে, গত বছরের ১৪ জুলাই পূর্বাঞ্চলীয় চীফ কর্মাশিয়াল ম্যানেজার (সিসিএম) সরদার শাহাদাত আলী ট্রেনটি পরিদর্শনের পর অর্ধশত ত্রুটি- বিচ্যুতি দিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় জিএম বরাবর একটি পরিদর্শন রিপোর্ট প্রদান করলেও পূর্বাঞ্চলীয় জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল হাইও এ ব্যাপারে কোন উদ্যোগ নেননি। গত বছরের ২৪ জুলাই সিসিএম কর্তৃক স্বাক্ষরিত রিপোর্টে সদ্য চালু হওয়া এসব কোচের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরা হয়েছে মেরামতের নিমিত্তে। অভিযোগ রয়েছে, ৪৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১শ’টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ লাইনের কোচ ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানির জন্য প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন প্রকৌশলী মোঃ শামসুজ্জামান। তবে এসব কোচ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠলেও বর্তমানে তিনি এসব কোচের সঙ্গে জড়িত নই বলে দাবি করছেন। অথচ সরকারের ক্ষতি করে নিজের ফায়দা লোটা শেষ হলেও ভোগান্তিতে পড়ছে যাত্রীরা। এদিকে, পরিচালন বিভাগকে বাণিজ্যিক বিভাগকে চিঠি দিয়েও কোন কাজ হচ্ছে না।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক ইন্দোনেশিয়ার ইনকা কর্পোরেশন নামক এসব কোচের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন যেমন করেছেন তেমনি কোচের বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলাপ- আলোচনাও চালিয়েছেন এডিজি (আরএস) মোঃ শামসুজ্জামান। এমনকি রেলের উভয় জোনের কয়েক কর্মকর্তাকেও ওই প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছেন লুজ টুলস ও মেশিনারিজ এমনকি পরিবর্তনযোগ্য যন্ত্রাংশের বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যও। এছাড়াও এ পর্যন্ত ৫৯টি মিটারগেজ কোচ আমদানির পর তিনদফায় ইন্দোনেশিয়ার ইনকা কর্পোরেশনের টিম পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপে অবস্থান নিয়েছে। গত আগস্টে সর্বশেষ চালানে আসা ২২টি কোচের চলনক্ষমতা ও বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা -নিরীক্ষার জন্য প্রায় ২০ সদস্যের একটি টিম পাহাড়তলী রেলওয়ে কারখানায় এসব কোচ পর্যবেক্ষণ করে ইন্দোনেশিয়া ফিরে গেছে।

পূর্বাঞ্চলীয় পরিচালন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইন্দোনেশিয়া থেকে ১০০টি মিটার গেজ ও ৫০ টি ব্রডগেজ ট্রেন আমদানি করা হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। স্টেনলেস স্টীলের তৈরি এসব কোচের মধ্যে রয়েছে ১৩টি এসি স্লিপার কক্ষ ও নন-এসি স্লিপার কক্ষ ৫টি। ২৪টি এসি চেয়ার কোচ, ৩৬টি শোভন চেয়ার কোচ, ১৩টি খাবার গাড়ি ও ৮টি পাওয়ার কার। ২০১৩ সালে রেল ভবনে আয়োজিত এক সভায় ১০০টি মিটার গেজ ও ৫০টি ব্রড গেজ কোচ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের(এডিবি) সহায়তায় এসব কোচ কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এসব কোচ কেনার ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা। এডিবির ঋণ ৮শ’ কোটি টাকা বা ১০ কোটি ডলার এবং সরকারের ফান্ড থেকে ২৮২ কোটি টাকা সরবরাহ করার কথা ছিল। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের রেলওয়ের ফাইন্যান্সিং চুক্তি(এফ এফ এ) এর তৃতীয় কিস্তির টাকার প্রদান করা হয়েছিল এডিবি থেকে।

পূর্বাঞ্চলীয় চীফ কর্মাশিয়াল ম্যানেজার সরদার শাহাদাত আলী স্বাক্ষরিত গত ২৪ জুলাইয়ের ট্রেন পরিদর্শন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি গত ১৪ জুলাই সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনটি পরিদর্শন করেছেন। ট্রেনের শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত বার্থ/কেবিনের সিঙ্গেল কুপে স্থাপিত টেবিলটি কমপক্ষে ৫ ইঞ্জি ফাঁকা রেখে ত্রুটিপূর্ণভাবে স্থাপন করা হয়েছে। লুকিং গ্লাস অতিশয় ক্ষুদ্র। কেবিনের আপার সিট তুলনামূলকভাবে অনেক উপরে ফলে যাত্রী উঠতে অনেক কষ্ট হয়। যাত্রী নামার হ্যান্ডেলটি এবং পাদানিগুলোর অবস্থানও ঠিক নেই। দরজার উপরের অংশে একটি লক ছাড়া আর কোন লক নেই। বেসিনের স্পেস যেমন ছোট তেমনি গভীরতাও অনেক কম। ফলে পানি গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে এবং নোংরা হচ্ছে।

টয়লেটের প্যান কমোড অপেক্ষা মেঝে অনেক নিচু, ফলে নোংরা পানি মেঝেতে জমে যাচ্ছে, টয়লেটের টিসু হোল্ডারগুলো অনেক দুর্বল, ফলে টিসু টান দিলে হোল্ডারসহ খুলে পড়ছে। টয়লেটের দরজায় একটি মাত্র লক দেয়া হয়েছে। ফলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক টয়লেট ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোন কোচের অভ্যন্তরেই ফায়ার এক্সটিংগুয়িশার রাখার কোন কেসিং নেই। ১৪০৩ নম্বর কোচে প্রতিবন্ধীদের জন্য যে টয়লেট রয়েছে তার দরজাটি সমানভাবে লাগানো যাচ্ছে না ফলে ব্যবহার অনুপযোগী। ওয়াশপিটে কোচের ফ্লোর যথাযথভাবে পরিষ্কার না করায় অল্প সময়ের মধ্যে নোংরা হয়ে পড়েছে। নামাজের কক্ষে জায়নামাজ নেই। বরং ক্যারেচ ফিটারের একটি ট্রাংক রাখা হয়েছে, যা নামাজ পড়তে অসুবিধার সৃষ্টি হচ্ছে।

১৪০৩ নম্বর কোচে প্রতিবন্ধীদের টয়লেটে বাতি নেই। ১২০৩ এবং ১৩০২ নম্বর কোচের ফ্লোর অত্যন্ত নোংরা, ১২০২ ও ১৩০৩ নং কোচের টয়লেটের দরজার লক নষ্ট, টিসু হোল্ডার ভেঙ্গে পড়েছে। ১৩০৪ ও ১০১৩ নং নম্বর কোচের বেসিন, টয়লেট ব্যবহার অনুপযোগী। ১২০১ নং কোচের দরজার লক নষ্ট। নন এসি কোচগুলোতে একটি ফ্যানের চেয়ে আরেকটি ফ্যানের দূরত্ব অনেক বেশি। ফলে মাঝের সারিতে বাতাস অনুভূত হয়নি। এসি সিগ্ধা কোচগুলোর ৫৫ নম্বর সিটের উপরে এসির কোন ব্লোয়ার বা ছিদ্র নেই।

সুত্র:দৈনিক জনকন্ঠ,৬ ডিসেম্বর ২০১৭

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।