অস্বাভাবিক বেশি ব্যয়ে রেলের ১০০ কোচ মেরামত প্রকল্প!

অস্বাভাবিক বেশি ব্যয়ে রেলের ১০০ কোচ মেরামত প্রকল্প!

ইসমাইলআলীঅকেজো/অব্যবহৃত ১০০টি যাত্রীবাহী কোচ পুনর্বাসন তথা মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। এজন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে রেলের যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে অকেজো এ কোচগুলো মেরামতে ব্যয় ধরা হয়েছে সমজাতীয় অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে প্রকল্পটির ব্যয় নিয়ে শুরুতেই দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।

সম্প্রতি প্রকল্পটি মূল্যায়নে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে জানানো হয়, ৫০টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ কোচ রেলওয়ের সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে মেরামত করা হবে। এজন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আগামী দুই বছরে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

বৈঠকের তথ্যমতে, প্রস্তাবিত প্রকল্পটির আওতায় প্রতিটি ব্রডগেজ কোচের জন্য মেকানিক্যাল যন্ত্রাংশ কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৭ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। আর সমজাতীয় চলমান প্রকল্পের আওতায় এ ব্যয় ৬৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। এছাড়া প্রস্তাবিত প্রকল্পটির আওতায় প্রতিটি ব্রডগেজ কোচের জন্য ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রাংশ কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা। সমজাতীয় চলমান প্রকল্পের আওতায় এ ব্যয় পাঁচ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।

একইভাবে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির আওতায় প্রতিটি মিটারগেজ কোচের জন্য মেকানিক্যাল যন্ত্রাংশ কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। আর সমজাতীয় চলমান প্রকল্পের আওতায় এ ব্যয় ৫২ লাখ ১৪ হাজার টাকা। এছাড়া প্রস্তাবিত প্রকল্পটির আওতায় প্রতিটি মিটারগেজ কোচের জন্য ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রাংশ কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। সমজাতীয় চলমান প্রকল্পের আওতায় এ ব্যয় মাত্র চার লাখ ৪৯ হাজার টাকা।

এ হিসাবে প্রকল্পটির আওতায় প্রতিটি ব্রডগেজ কোচ মেরামতে মেকানিক্যাল স্পেয়ার পার্টসের (খুচরা যন্ত্রাংশ) দাম ধরা হয়েছে অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে প্রায় ৩৯ শতাংশ বেশি। আর ইলেকট্রিক্যাল স্পেয়ার পার্টসের দাম ধরা হয়েছে অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে প্রায় ৬৮৮ শতাংশ বেশি। একইভাবে প্রতিটি মিটারগেজ কোচ মেরামতে মেকানিক্যাল স্পেয়ার পার্টসের দাম ধরা হয়েছে অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। আর এ কোচের জন্য ইলেকট্রিক্যাল স্পেয়ার পার্টস কেনায় দাম ধরা হয়েছে অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে প্রায় ৩৭৭ শতাংশ বেশি।

প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বৈঠকে জানানো হয়, আগের প্রকল্পটি কয়েক বছর আগের নেয়া। তাই প্রতি বছর পাঁচ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করা হয়েছে। এছাড়া আগের প্রকল্পটির আওতায় কোচগুলো পুনর্বাসন তথা মেরামতে এমএস শিট ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত প্রকল্পটিতে এসএস শিট ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

বৈঠকে আরও জানানো হয়, সমজাতীয় চলমান প্রকল্পের আওতায় মোট সাতটি পাওয়ার কার মেরামত করা হয়েছে। আর প্রস্তাবিত প্রকল্পটির আওতায় ২৮টি পাওয়ার কার মেরামত করা হবে। এ কারণেও প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

যদিও উল্লিখিত যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেন রেলওয়ের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তারা বলেন, আগের প্রকল্পটি তিন বছর আগের নেয়া। তাই প্রতি বছর পাঁচ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে তিন বছরে ১৫ শতাংশ ব্যয় বাড়বে। আর এমএস শিটের পরিবর্তে এসএস শিট ব্যবহারে ব্যয় আরও পাঁচ শতাংশ কিছুটা বাড়তে পারে। এ হিসাবে মিটারগেজ কোচের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ মেকানিক্যাল ব্যয় বৃদ্ধি যৌক্তিক। কিন্তু ব্রডগেজ কোচে ৩৯ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

তারা আরও বলেন, পাওয়ার কার মেরামত সংখ্যা বাড়ায় ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রাংশ কেনায় মোট ব্যয় বাড়তে পারে। তবে একক দর মিটারগেজে ৩৭৭ শতাংশ ও ব্রডগেজে ৬৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সলিমুল্লাহ বাহার শেয়ার বিজকে বলেন, প্রকল্পটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বৈঠকে বেশকিছু মন্তব্য এসেছে। এগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি পুনর্গঠন করা হবে। এরপর তা যাবে মন্ত্রণালয়ে। তারপর পাঠানো হবে পরিকল্পনা কমিশনে। তাই প্রকল্প প্রস্তাবনা চূড়ান্ত হওয়ার আগে ব্যয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

প্রকল্পটির ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে মেরামত করা হলেও রেলওয়ের নিজস্ব জনবল দিয়ে তা সম্ভব নয়। এজন্য শ্রমিক আউট সোর্স করতে হবে। ফলে মিটারগেজ কোচগুলোর জন্য শ্রমিকের মজুরি ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা এবং ব্রডগেজ কোচগুলোর জন্য চার কোটি ২০ লাখ টাকা। এছাড়া একটি গাড়ি কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ লাখ টাকা।

এদিকে ব্রডগেজ কোচগুলোর মেকানিক্যাল যন্ত্রাংশ কেনায় ব্যয় হবে ৪৭ কোটি ছয় লাখ টাকা এবং মিটারগেজ কোচগুলোর জন্য ২৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা। আর ব্রডগেজ কোচগুলোর ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রাংশ কেনায় ব্যয় হবে ২৮ কোটি ১১ লাখ টাকা ও মিটারগেজ কোচগুলোর জন্য ১৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে রেলের বহরে যুক্ত হয়েছে ২৭০টি কোচ। আরও ৩৫০টি কোচ কেনার জন্য চুক্তি করা হয়েছে। নতুন কোচ আসায় বিভিন্ন ট্রেনে পুরনোগুলো প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। নতুন বেশকিছু ট্রেনও চালু করা হয়েছে। এ অবস্থায় অস্বাভাবিক ব্যয়ে পুরনো কোচ মেরামত করা কতটুকু যৌক্তিক তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র:শেয়ার বিজ, মার্চ ৮, ২০২১

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।