অবকাঠামো দুর্বলতায় চুরি হচ্ছে পুরনো যন্ত্রাংশ

অবকাঠামো দুর্বলতায় চুরি হচ্ছে পুরনো যন্ত্রাংশ

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পুরনো সেইল ডিপোয় বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে বিপুল পরিমাণ পুরনো যন্ত্রাংশ। দীর্ঘদিন অবিক্রীত পড়ে থাকায় মরিচা ধরে এগুলো নষ্ট হচ্ছে। ঘটছে চুরির ঘটনাও। অপ্রতুল অবকাঠামো ও নিরাপত্তা দুর্বলতায় রাষ্ট্রীয় এসব সম্পদ নষ্ট ও চুরি হলেও ডিপোর অবকাঠামো উন্নয়নে নজর নেই কর্তৃপক্ষের।

গত ৩১ জানুয়ারি গভীর রাতে সেইল ডিপোর দেয়াল টপকে একদল চোর প্রায় এক হাজার কেজি স্ক্র্যাপ লোহা সরিয়ে নেয়। স্ক্র্যাপগুলো গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার সময় পাহাড়তলী পুলিশ ফাঁড়ির টহল দল এসব স্ক্র্যাপসহ একজনকে আটক করে। এ ঘটনায় খুলশী থানায় একটি মামলাও করে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী।

রেলের পুরনো যন্ত্রাংশ চুরির একটি ঘটনায় টহল পুলিশের কারণে ঠেকানো গেলেও এ রকম ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। তবে এজন্য ডিপোর অবকাঠামো দুর্বলতাকেই দায়ী করছে রেলের নিরাপত্তা বিভাগ।

এ বিষয়ে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর চিফ ইন্সপেক্টর মো. ছালামত উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কাজ হলো, সেইল ডিপোর মালপত্র পাহারা দেয়া। তবে ডিপোর অবকাঠামোগত সমস্যা থাকায় পাহাড়ি এলাকার এ গুদামের মালপত্রের নিরাপত্তা দেয়া কঠিন। ডিপোর চারপাশের দেয়াল টপকিয়ে অধিকাংশ সময়ই মালপত্র চুরি হয়ে যায়। আমরা বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলের ডিপোর উন্নয়ন ও সংস্কার করতে তাগাদা দিয়ে বিভিন্ন সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন ডিপোর দায়িত্বরত কর্মকর্তারা। পাহাড়তলীতে অবস্থিত পুরনো সেইল ডিপোর দক্ষিণ, উত্তর ও পূর্ব পাশের বাউন্ডারি ওয়াল উঁচু করা এবং ওয়ালে কাঁটাতার দেয়ার তাগিদ জানিয়ে ২০১৪ সালে রেলের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর চিঠি দেন জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী মো. রাহিদ হোসেন। এর পরের দুই বছরেও একই ধরনের চিঠি দেন তিনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ডিপোর চারপাশের সংরক্ষণ দেয়াল উঁচু করতে পারেনি রেলওয়ের প্রকৌশল দপ্তর। রেলওয়ে মহাব্যবস্থাপকসহ প্রকৌশল দপ্তরকে এজন্য বারবার তাগাদা দেয়া হলেও মালপত্র সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ এ ডিপোটি সংস্কার করেনি রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার পুরনো স্ক্র্যাপ পণ্য ডিপোয় পাঠানো হলেও ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে।

গত সোমবার রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পুরনো সেইল ডিপোয় সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ ক্যাটাগরির স্ক্র্যাপ খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। অধিকাংশ স্ক্র্যাপ যন্ত্রাংশই নষ্ট হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি না করার কারণে। এর মধ্যে রয়েছে অকেজো ও পরিত্যক্ত ইঞ্জিন, লোকোমোটিভের টাকা, স্প্রিং, বগি, লোহা, সিলভার, তামা, স্টিল, এমএস শিপপ্লেট, এম এস স্ক্র্যাপ, বাফার হ্যালিকল স্প্রিং, স্টিল স্প্রিং, কপার স্ক্র্যাপ, অ্যালুমিনিয়াম স্ক্র্যাপ ও পুরনো বাল্ব।

পাহাড়তলী এলাকায় রেলের নিজস্ব স্টোর গুদামে পূর্বাঞ্চল রেলের পুরনো যন্ত্রাংশ বা স্ক্র্যাপ মজুদ করা হয়। এসব স্ক্র্যাপ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর অনুমোদনসাপেক্ষে প্রতি তিন মাস অন্তর বিক্রির জন্য নিলামে তোলা হয়। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই স্ক্র্যাপের ওজন মজুদকালীন ওজনের চেয়ে কম পাওয়া যায়। মূলত মরিচা ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়া এবং চুরি হয়ে যাওয়ার কারণে এমনটি হয়। আর এর দায় গিয়ে পড়ে স্টোর বিভাগে দায়িত্বরত উপসহকারী প্রকৌশলীদের ওপর। এ কারণে অনেক সময় অবসরোত্তর সুবিধা পেতে ভোগান্তির শিকার হন তারা।

২০০৩ সালে রেলের স্টোর বিভাগ থেকে অবসরে যান উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের। কিন্তু স্টোরে রেলের পুরনো মালপত্র ও যন্ত্রাংশের হিসাবসংক্রান্ত জটিলতায় দীর্ঘদিন অবসরোত্তর সুযোগ-সুবিধা পাননি তিনি। সবশেষে ২০১৪ সালে মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পেনশনের আবেদন মঞ্জুর করলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় গ্র্যাচুইটি পাননি অবসরপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তা। একই পদে চাকরি করা কাশেম আলী মোল্লা ২০০০ সালে অবসরে গেলেও এখনো কোনো ভাতা পাননি। ২০০৫ সালে অবসরে যাওয়া দবির উদ্দিন দীর্ঘদিন স্টোর বিভাগে কাজ করেও অবসরোত্তর ভাতা ছাড়াই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

রেলের স্টোর বিভাগের মালপত্র নষ্ট হওয়ার বিষয়ে আপত্তি দিয়েছেন রেলওয়ে অডিট অধিদপ্তরও। ২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল নিরীক্ষা ও হিসাবরক্ষণ অফিসার মো. নুরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক অডিট আপত্তিতে দেখা যায়, পাহাড়তলীর পুরনো সেইল ডিপোয় খোলা আকাশের নিচে অবিক্রীত অবস্থায় মালপত্র ফেলে রাখার কারণে রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে মোট ২ কোটি ৩৪ লাখ ৬২ হাজার ১৭৮ টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। লোহাজাতীয় মালপত্র হওয়ায় অবিলম্বে সেসব বিক্রি ছাড়াও পুরনো সেইল ডিপোর অবকাঠামো উন্নয়ন ও ডিপোটি আধুনিকায়নের পরামর্শ দেয়া হয়।

ডিপোর দায়িত্বরত কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রেলের একাধিক বিভাগের মালপত্র ডিপোয় মজুদ রাখায় দরপত্র আহ্বানের আগে সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নিতে হয়। এরপর রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের অনুমোদন নিয়ে দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়ন শেষে মালপত্র বিক্রি করতে হয়। তবে ডিপোর অবকাঠামোগত দুর্বলতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান মালপত্র সংগ্রহ করতে এসে ফেরত চলে যায়। অনেক সময় বাজারের সঙ্গে স্ক্র্যাপ পণ্যের দামের পার্থক্য থাকলে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো চিঠির মাধ্যমে স্ক্র্যাপ সংগ্রহে সময়ক্ষেপণ করে। এতে খোলা আকাশের নিচে থাকা স্ক্র্যাপ পণ্য পড়ে থেকে নষ্ট হতে থাকে।

সুত্র:বণিক বার্তা,জানুয়ারি ০৬, ২০১৮

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।