ট্রেন লিজ দিয়ে অস্বস্তিতে রেলওয়ে : ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে লাভজনক করা সম্ভব

ট্রেন লিজ দিয়ে অস্বস্তিতে রেলওয়ে : ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে লাভজনক করা সম্ভব

সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও অদক্ষতা আর অব্যবস্থাপনার কারণে রাষ্ট্রকে রেলওয়ে খাতে বিপুল লোকসান দিতে হয় প্রতি বছর। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকারি খাতে যে ট্রেন লোকসান গুনছে বা আয় করছে কম, সেই একই ট্রেন যখন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, তখনই উচ্চ মুনাফা করছে, আয়ও ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিগুণ হয়েছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, শুধু তদারকি জোরদারের মাধ্যমেই আয় বাড়িয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আন্তঃনগর বাদে ৭৩টি লোকাল ট্রেন এখন পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি খাতে। বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া এসব ট্রেন থেকে লিজগ্রহীতা বিপুল অর্থ আয় করছে। কিন্তু লিজ প্রদানের সময় চুক্তিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের আরোপিত শর্তের অধিকাংশই লিজগ্রহীতার পক্ষে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার। ইজারাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান লাভে থাকলেও এ রুটে ট্রেন পরিচালনায় প্রতিদিনই লোকসান গুনছে রেলওয়ে। এসবই রেলওয়ের অপেশাদারিত্বের বহিঃপ্রকাশ।

মূলত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সঠিকভাবে টিকিট বিক্রি ও চেকিং না করায় প্রতিটি ট্রেন থেকেই বড় অংকের আয়বঞ্চিত হতো বাংলাদেশ রেলওয়ে। বিনা টিকিটে ভ্রমণ বন্ধে এখন নিয়মিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অভিযান পরিচালনা হলেও তা যথেষ্ট নয়। গোড়ায় গলদ থাকলে কোনোভাবেই বিনা টিকিটের যাত্রী শূন্যে নামিয়ে আনা যাবে না। ট্রেনের টিকিট যাচাইয়ে নিয়োজিত কর্মচারীর উপস্থিতি এবং যথাযথ দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে হবে। আরেকটি কথা, টিকিট ছাড়া কোনো ব্যক্তির প্লাটফর্মে ঢোকারই নিয়ম নেই। সেজন্য প্লাটফর্ম টিকিট কাটার ব্যবস্থাও চালু আছে অনেক আগে থেকে। স্টেশনের প্রবেশপথে নিয়োজিত কর্মচারীরাও নিশ্চয়ই অনুপস্থিত থাকেন কিংবা ভুয়া যাত্রীদের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ রয়েছে! সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ট্রেনে কামরাপ্রতি অ্যাটেনডেন্ট থাকে। আছে ট্রেন টিকিট এক্সামিনার (টিটিই)। তবে প্রায় সময়ই কামরায় যাত্রীর বিপুল উপস্থিতির কারণে অ্যাটেনডেন্টরা দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। টিকিট চেক করতে গিয়েও হিমশিম খেতে হয় টিটিইকে। অবশ্য নিরাপদ সরকারি চাকরি হওয়ায় রেলের কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে উদাসীনতাও লক্ষ করা যায়। বেসরকারি ব্যবস্থাপনার ট্রেনে অ্যাটেনডেন্টরা প্রতি কামরায় প্রত্যেক যাত্রীর টিকিট চেক করেন। অথচ রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বেশির ভাগ ট্রেনেই টিটিই থাকেন না। থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে টিকিট চেক করা হয় না। এতে আয় থেকে বঞ্চিত হয় রেলওয়ে। এটা দুর্ভাগ্যজনক।

লিজের শর্তের কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসানের দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই। আগামীতে প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়ই লাভবান হয়। সবার আগে প্রয়োজন রেলওয়ের ব্যবস্থাপনা উন্নত করার মাধ্যমে বিদ্যমান ট্রেন থেকে অধিক আয়ের পদক্ষেপ নেয়া। বেসরকারি খাত একই ট্রেনসেবা দিয়ে মুনাফা করতে পারলে বাংলাদেশ রেলওয়ে কেন পারবে না, তা বোধগম্য নয়। আমরা চাইব সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের অংশগ্রহণ রেলওয়েকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রেলওয়েকে আরো কার্যকর ও জনকল্যাণমুখী, সর্বোপরি অর্থনৈতিক অগ্রগতির সহায়ক হিসেবে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্র কীভাবে তৈরি করা যায়, তার পরিকল্পনা নেয়া জরুরি।

প্রথমেই লোকসানের কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তারপর তা দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রেলের লোকসানের প্রধান কারণ অদক্ষতা, অপচয়, দুর্নীতিসহ সার্বিক অব্যবস্থাপনা। ব্যবস্থাপনা উন্নত করে ও সেবার মান বাড়িয়ে লোকসান কমানো শুধু নয়, রেলকে লাভজনক করা সম্ভব। রেলের বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তি বেদখল হয়ে আছে, প্রচুর অর্থ পাওনা আছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে। সম্পত্তি উদ্ধার ও পাওনা টাকা আদায়, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, পণ্য পরিবহন বাড়ানোর উদ্যোগ, লোকোমোটিভ ও কোচ তৈরির সক্ষমতা অর্জন এবং পরিচালনব্যবস্থা যুগোপযোগী করা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষে অবশ্যই স্বনির্ভর হয়ে ওঠা সম্ভব।

সুত্র:বণিক বার্তা, মার্চ ৩১, ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।