২০১৮ সালে নির্মাণ শেষ হচ্ছে না দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ

২০১৮ সালে নির্মাণ শেষ হচ্ছে না দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ

ইসমাইল আলী: চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমারের সীমান্ত ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১০ সালে। ২০১৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এতে ৮৭৪ শতাংশ ব্যয় বাড়ে প্রকল্পটির। সে সময় দোহাজারী-কক্সবাজার অংশটি অবশ্যই ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে এখনও শুরুই হয়নি রেলপথটি নির্মাণ। ফলে আগামী বছর ডিসেম্বরের মধ্যে এ অংশটি নির্মাণ শেষ হবে না।

এদিকে প্রকল্পটির অর্থায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে এখনও ঋণচুক্তিও সই হয়নি। এছাড়া প্রকল্পটির পরিচালক নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। রেলওয়ের কর্মকর্তার পরিবর্তে একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রকল্প পরিচালক

হিসেবে পদায়ন করেছে জনপ্রশাসন। তবে রেলওয়ের কর্মকর্তারা তা মেনে নিতে রাজি নয়। এর বিরুদ্ধে মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন তারা।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ২০১০ সালে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। তবে জমি অধিগ্রহণ, ডুয়েল গেজ রেলপথ ও হাতি চলাচলের যুক্তিতে ২০১৬ সালে সংশোধনের সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ নির্মাণ শুরুর আগে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয় ১৬ হাজার ১৮২ কোটি ১৩ লাখ টাকা বা ৮৭৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। তবে এ ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবেও রেলপথ নির্মাণে গতি আসেনি।

প্রকল্পটির সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনকালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কিছু সিদ্ধান্ত দেয়। এর মধ্যে প্রথমটি ছিলÑ ‘দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩১ কিলোমিটার রেলপথ আবশ্যিকভাবে ডিসেম্বর, ২০১৮ সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে।’ দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি ছিলÑ পর্যটন খাতসহ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের লক্ষ্যে প্রকল্পটি ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রকল্পভুক্ত করতে হবে।

এরই মধ্যে প্রকল্পটির ফাস্ট ট্র্যাক ভুক্ত করা হয়েছে। তবে নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি। এমনকি প্রকল্পটির ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়াও এখনও সম্পন্ন হয়নি। এছাড়া পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি। ফলে একনেকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী বছর ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ হবে না। এদিকে ২০১৬ সালের অক্টোবরে দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেলপথ প্রকল্পে অর্থায়নে সম্মতি জানায় এডিবি। তবে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও ঋণচুক্তি সই হয়নি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। এরই মধ্যে কারিগরি মূল্যায়ন শেষ করা হয়েছে। এরপর তা এডিবির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। তাদের মতামত পাওয়ার পর আর্থিক প্রস্তাবনা মূল্যায়ন করা হবে। সবশেষে প্রস্তাবটি যাবে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে। ঠিকাদার নিয়োগ শেষ করতে সব মিলিয়ে দুই-তিন মাস সময় লাগবে।

তিনি আরও বলেন, এডিবির সঙ্গে ঋণ চুক্তি না হলেও অর্থায়ন নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তবে কাজ শুরু পিছিয়ে গেছে। বছরের শেষ নাগাদ মূল কাজ শুরু করা যাবে। ফলে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রেলপথটি নির্মাণ শেষ হচ্ছে না। তবে ঠিকাদারকে তাগিদ দেওয়া হবে দুই অংশের মধ্যে দোহাজারী-কক্সবাজার প্যাকেজটি আগে শুরুর করার জন্য।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঠিকাদার নিয়োগের পর প্রকল্পের মোবালাইজেশন (প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংস্থান) করতে কয়েক মাস লাগবে। এরপর হবে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা। আর পরামর্শক নিয়োগ সম্পন্ন না হলে কাজ শুরু করা যাবে না। এছাড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে পশুপাখির বিচরণ ক্ষতিগ্রস্ত না করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর। ফলে চাইলেও নির্মাণকাজে খুব বেশি গতি আনা যাবে না।

এদিকে গত ফেব্রুয়ারি থেকে প্রকল্পটির পরিচালক নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। সূত্র জানায়, প্রকল্পটিতে গ্রেড-২ বা গ্রেড-৩-এর কর্মকর্তাকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগের বিধান ছিল। আর রেলওয়েতে এ পদমর্যাদার কর্মকর্তা নেই। তাই একজন অতিরিক্ত সচিবকে (গ্রেড-২) প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তবে তার অধীনে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান রেলওয়ের কর্মকর্তারা। তারা এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রীকে স্মারকলিপি প্রদান করে। এতে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আসা অতিরিক্ত সচিবকে এক মাসের ছুটি দেওয়া হয়। এখনও তাকে পদায়ন না করে বসিয়ে রেখেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। আর রেলওয়ের একজন গ্রেড-৪ কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্বে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এতে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিঘিœত হতে পারে বলে মনে করেন রেলওয়ের অনেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তাদের বক্তব্য, বড় প্রকল্পে যোগ্যতাহীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বাস্তবায়ন বিঘ্নিত হবে। এ নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন রেলওয়ের প্রকৌশলীরা।

এদিকে সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে রেলপথ নির্মাণে আপত্তি তোলে পরিবেশ অধিদফতর। বেশকিছু দুর্লভ গাছ কাটতে হবে বলে আপত্তি জানানো হয়। সব মিলিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন খুবই কঠিন হবে বলে মনে করেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সংশোধিত প্রস্তাবে প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২২ সাল। এর আগে রেলপথটি নির্মাণ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

সুত্র:শেয়ার বিজ,৪ এপ্রিল২০১৭


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।