লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রেলের অর্জন মাত্র ১৪%

লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রেলের অর্জন মাত্র ১৪%

শামীম রাহমান :

রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য অর্জনে অনেক দূর পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে যাত্রী, পণ্য, পার্সেল ও অন্যান্য খাতে সংস্থাটির রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৮৫৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ১১৬ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যের মাত্র ১৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বাংলাদেশ রেলওয়ের অপারেশন শাখা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

লক্ষ্যের তুলনায় কম রাজস্ব আহরণের কারণ হিসেবে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার কথা বলছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। পাশাপাশি অর্থবছরের শেষ মাসগুলোয় লক্ষ্য ও অর্জনের মধ্যে পার্থক্য কমে আসবে বলে মনে করছেন তারা।

রেলের অপারেশন শাখা সূত্রে জানা যায়, স্টেশনগুলো প্রতি ১০ দিন পর  অর্থাৎ প্রতি মাসে তিনবার আয়ের রিটার্ন পাঠায়। পাঠানো রিটার্ন যোগ করে মাসিক, প্রান্তিক ও বার্ষিক রাজস্ব আয় হিসাব করা হয়। অপারেশন শাখার চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের (জুলাই ২০১৭-জানুয়ারি ২০১৮) খাতভিত্তিক রাজস্ব আয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন বাবদ রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৫৩০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৮২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। লক্ষ্য অনুযায়ী, এ খাতে অর্জন ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ।

একইভাবে পণ্য পরিবহন বাবদ ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আয়ের লক্ষ্য ছিল ২১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ২৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। লক্ষ্য অনুযায়ী, এ খাতে অর্জন মাত্র ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

পার্সেল পরিবহন বাবদ চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা আয়ের লক্ষ্য ছিল রেলওয়ের। আয় হয়েছে দেড় কোটি টাকা। অর্জন মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এর বাইরে বিবিধ খাতে আরো ৫১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য থাকলেও অর্জিত হয়েছে মাত্র ৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্জন ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ।

সব মিলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৮৫৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা আয়ের লক্ষ্য ছিল রেলওয়ের। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ১১৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ রাজস্ব অর্জিত হয়েছে।

লক্ষ্যের তুলনায় রাজস্ব আয় পিছিয়ে থাকার বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, অর্থবছরের এখনো দু-তিন মাস   বাকি। এ অবস্থায় রাজস্ব আহরণ কম হচ্ছে— তা আমরা এখনই বলতে চাচ্ছি না। সচরাচর দেখা যায়, অর্থবছরের শেষভাগে এসে রাজস্ব আদায় বেড়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, যাত্রী, পণ্য, পার্সেল, বিবিধ খাতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য কিছুটা বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। এ কারণে লক্ষ্যের তুলনায় আদায়ের পার্থক্য কিছুটা বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে আমরা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণের চেষ্টা করে যাচ্ছি।

এদিকে অপারেশন শাখার হিসাবের তুলনায় রেলওয়ের অর্থ শাখার হিসাবে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। অর্থ শাখার হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (ডিসেম্বর, ২০১৭) যাত্রী, পণ্য, পার্সেল ও বিবিধ খাত থেকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৩১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৯৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। লক্ষ্যের বিপরীতে রাজস্ব অর্জনের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

অপারেশন ও অর্থ শাখার রাজস্ব আয়ের হিসাবের মধ্যকার পার্থক্য প্রসঙ্গে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ) জহুরুল ইসলাম বলেন, পার্থক্যটা তৈরি হয়েছে মূলত অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমের কারণে। বিভিন্ন স্টেশন থেকে যে রিটার্ন আসে, সেটার ভিত্তিতে অপারেশন শাখা রাজস্ব আয়ের হিসাব তৈরি করে। অপারেশন শাখার হিসাবের তুলনায় আমরা সবসময় দুই মাস পিছিয়ে থাকি। অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমের কারণেই এমনটি হয়। তবে এখন দুই শাখার তথ্যে পার্থক্য থাকলেও বছর শেষে রাজস্ব আদায়ের অংকটি একই দাঁড়ায়।

বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তির তুলনায় বাস্তব লক্ষ্য অর্জনে বড় ধরনের পার্থক্যের কারণ হিসেবে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাকে দায়ী করে তিনি বলেন, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ধরা হয়। রাজস্ব আহরণে বাড়তি চাপ তৈরি করতেই এমনটি করা হয়। এ কারণেই লক্ষ্য ও বাস্তব অর্জনের মধ্যে পার্থক্যটি চোখে লাগছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর যাত্রী পরিবহন খাতে সংস্থাটির মোট আয় হয়েছিল ৫৩৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর সেখান থেকে ১৭৯ কোটি বেড়ে এ খাতে আয় দাঁড়ায় ৭১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

একইভাবে পণ্য পরিবহন খাতে ২০১৫-১৬ অর্থবছর আয় হয়েছিল ১৮২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর আয় হয় ২৬৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। পার্সেল পরিবহন খাতে ২০১৫-১৬ অর্থবছর ১৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা আয় করে রেলওয়ে। পরের অর্থবছর আয় হয় ১৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

বিবিধ খাতে ২০১৫-১৬ অর্থবছর ১৩০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা আয় করে রেলওয়ে। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছর বিবিধ খাতে সংস্থাটি ২৬৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা আয় করে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, গত অর্থবছর আমরা সাড়ে ১৩শ কোটি টাকা আয় করেছিলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি অর্থবছর সরকার আমাদের ২ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয় তা ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করে। আমরা এ লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আহরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি, গত বছরের তুলনায় যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে রেলওয়ের আয় বেশি হবে। তবে লাগেজ ভ্যান সংকটের কারণে পার্সেল খাতে হয়তো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।

অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত লক্ষ্য ও অর্জনের মধ্যে বড় পার্থক্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, জানুয়ারির হিসাবে হয়তো পার্থক্যটা একটু বেশিই ছিল। ফেব্রুয়ারিতে তা অনেকটাই কমে এসেছে।

সুত্র:বণিক বার্তা, মার্চ ৩১, ২০১৮

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।