রেলের আয় বেড়েছে এক বছরে ১৮৩ কোটি টাকা

রেলের আয় বেড়েছে এক বছরে ১৮৩ কোটি টাকা

সুজিত সাহা :
বাংলাদেশ রেলওয়ের এক বছরের আয় বেড়েছে ১৮৩ কোটি টাকা। এ নিয়ে টানা দুই বছর আয় বাড়ল প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু আয়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখালেও লোকসানের ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি রেল।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেলের সর্বমোট আয় ছিল ৯৩৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর পরের অর্থবছরে রেলের আয় কমে হয় ৯০৪ কোটি টাকা। তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেলের আয়ে বড় ধরনের উন্নতি হয়। সে বছর রেলওয়ে ১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা আয় করে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বেশি। সর্বশেষ অর্থবছরেও রেলওয়ে আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রেখেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেলওয়ে আয় করেছে ১ হাজার ৪৮৬ কোটি ১৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ১৮২ কোটি ৩৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেশি। অর্থাৎ টানা দুই বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আয় করেছে রেলওয়ে।

রেলের সর্বশেষ অর্থবছরের আয়ের হিসাব শেষ হয়েছে সম্প্রতি। এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর রেলওয়ের প্রধান অর্থ উপদেষ্টা ও হিসাব অধিকর্তার দপ্তর থেকে রেলভবনে পাঠানো প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেলের সর্বমোট আয় হয়েছে ১ হাজার ৪৮৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে আয় করেছে ৮৯৩ কোটি ৯৭ লাখ ২১ হাজার টাকা। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে আয় করেছে ৫৯২ কোটি ১৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা। আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৮৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করেছে রেলওয়ে। তবে পূর্বাঞ্চল রেলের আয় ৫৬ কোটি টাকা বাড়লেও পশ্চিমাঞ্চল রেলের আয় বেড়েছে ১২৬ কোটি টাকা।

রেলের হিসাব বিভাগের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বশেষ অর্থবছরে যাত্রী খাতে আয় হয়েছে ৯০৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৫৮৬ কোটি ও পশ্চিমাঞ্চলে ৩১৯ কোটি টাকা। যাত্রী ব্যতীত খাতে আয় হয়েছে ১৯০ কোটি, পণ্য পরিবহন খাতে ২৮৬ কোটি, বিবিধ খাতে ২৭৬ কোটি টাকা আয় হয়েছে। যদিও বিবিধ খাতের আয় ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে কমেছে সর্বশেষ অর্থবছরে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিবিধ খাতে ৩০৬ কোটি টাকা আয় হলেও সর্বশেষ অর্থবছরে আয় হয়েছে ২৭৬ কোটি টাকা। এ খাতে আয় বাড়লে সর্বশেষ অর্থবছরের রেলের আয় প্রবৃদ্ধি ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত বলে মনে করছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, কয়েক বছর ধরে রেলওয়ের সেবার মান বাড়াতে কাজ করছে সরকার। সরকার রেলের মাধ্যমে দেশের সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সাজাতে চায়। এজন্য বেশকিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর সুফল হিসেবেই রেলের আয় বাড়তে শুরু করেছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রেলের আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কমে রেলওয়ে আগের মতোই লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে জানান মন্ত্রী।

রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইন্দোনেশিয়া থেকে ১০০টি মিটার গেজ কোচ এবং ভারত থেকে ১২০টি ব্রড গেজ কোচ আমদানির মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর রেলের বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনে নতুন করে কোচ সংযোজন শুরু হয়। কোচ সংকটে ধুঁকতে থাকা রেলওয়ে নতুন কোচের মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশন অনুযায়ী কোচ দেয়া হয়। এরপর পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেন চালুর পাশাপাশি পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস চালু করা হয়। জনপ্রিয় আন্তঃনগর ট্রেনের ঘাটতি কম্পোজিশনে নতুন কোচ সংযোজন করে পুরনো কোচগুলো অন্যান্য ট্রেনে দেয়া হয়। এছাড়া আন্তঃনগর ট্রেনের বেশকিছু কোচ ওয়ার্কশপে মেরামত ও টাইপ পরিবর্তন করে দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রেনে সংযোজন করা হয়। এতে করে মাত্র তিনটি নতুন ট্রেন বাড়লেও কোচের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যাত্রী খাতে আয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন তারা।

রেলের সংশ্লিষ্ট একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রেলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি কোচ ও ইঞ্জিন সরবরাহ বাড়ানো গেলে এখনো রেল একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে থাকত। চাহিদা থাকলেও গত এক দশকে রেলের কোচ ও ইঞ্জিন আমদানির প্রকল্পগুলো অজানা কারণে ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হলেও শুধু কোচ ও ইঞ্জিন আমদানি তুলনামূলক কম হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী যাত্রীসেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সর্বশেষ এক বছরে মাত্র ২২০টি কোচ আমদানি করায় রেলের আয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। রেলের সবগুলো ট্রেনে পর্যাপ্ত কোচ ছাড়াও চাহিদা অনুযায়ী ইঞ্জিন আমদানি করা গেলে রেলের আয় দ্রুত বাড়ানোর মাধ্যমে রেলওয়ে আগের মতো লাভজনক খাতে পরিণত করা সম্ভব বলে মনে করেন তারা।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিট লোকসান ছিল ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। ওই সময়ে রেলের ব্যয় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সর্বশেষ অর্থবছরেও রেলের ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ হিসাবে ধীরে হলেও রেলের আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কমে আসছে। চলতি অর্থবছরে রেলওয়ে ২ হাজার কোটি টাকার আয় লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে পারলে রেলের লোকসান এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসবে বলে মনে করছেন রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা।

সুত্র:বণিক বার্তা, অক্টোবর ২০, ২০১৮

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।