রেলওয়ের ৩০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত (পর্ব-১)

রেলওয়ের ৩০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত

রেলের উন্নয়নে ৩০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২০১৬-২০৪৫ মেয়াদি এ মহাপরিকল্পনার বিভিন্ন দিক নিয়ে শেয়ার বিজের ধারাবাহিক আয়োজন। আজ ছাপা হচ্ছে প্রথম পর্ব:

ইসমাইল আলী: রেলওয়ের সেবার মানোন্নয়নে প্রচুর বিনিয়োগ করছে সরকার। প্রতি বছর এ খাতে বাড়ানো হচ্ছে বরাদ্দ। এর পরও সংস্থাটির সেবায় খুব বেশি গতি আসেনি। এবার রেলের পরিকল্পিত উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রণয়ন করা হচ্ছে ৩০ বছর মেয়াদি (২০১৬-২০৪৫) মাস্টারপ্ল্যান। এর আওতায় ছয় পর্বে ২৬২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে রেলওয়ে। আর এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় লাখ ২৪ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা।

সম্প্রতি রেলওয়ের মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। গত সপ্তাহে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে তা আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কারিগরি সহায়তায় মাস্টারপ্ল্যানটি প্রণয়ন করছে সিপিসিএস ট্রান্সকম লিমিটেড ও ই.জেন কনসালটেন্টস লিমিটেড।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমানে রেলওয়ের একটি মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। তবে সেটির সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। সব দিক পর্যালোচনা করে শিগগিরই এটি চূড়ান্ত করা হবে।

প্রসঙ্গত, রেলের উন্নয়নে প্রথম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয় ২০১৩ সালে। তবে ২০১১ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ২০ বছর এটির কার্যকাল ধরা হয়। সেটিতে চার পর্বে ২৩৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। তবে শুরুতেই হোঁচট খায় মহাপরিকল্পনাটি। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রথম পর্বের বেশিরভাগ প্রকল্পই বাস্তবায়িত হয়নি। তাই নতুন করে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয় গত বছর। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬-২০৪৫ মেয়াদের জন্য মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে রেলওয়ের চলমান ৪৩টি প্রকল্পকে মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথম পর্বের (২০১৬-২০২০) আওতায় এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার ৪৩১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর বাইরে প্রথম পর্বে আরও ৭৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে আরও এক লাখ ৪৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।

প্রথম পর্বে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যমুনা নদীর ওপর রেলসেতু নির্মাণ, নারায়ণগঞ্জে নতুন লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ নির্মাণ, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডাবল লাইন নির্মাণ, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর, ভাঙ্গা-বরিশাল-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণ, আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ, বগুড়া-বঙ্গবন্ধু রেলসেতু সংযোগ রেলপথ নির্মাণ, পাহাড়তলী কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ আধুনিকায়ন, ডেমু মেরামতে পৃথক ওয়ার্কশপ নির্মাণ, গাজীপুরের ধীরাশ্রমে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, ৪০টি ব্রড গেজ ইঞ্জিন কেনা প্রভৃতি।

মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় দ্বিতীয় পর্বে (২০২১-২০২৫) ৬৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে ব্যয় হবে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলো হলোÑঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড ট্রেন চলাচলে এক্সপ্রেস রেলপথ নির্মাণ, টঙ্গী-ভৈরববাজার রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর, বিদ্যমান ভৈরব ও তিস্তা রেলসেতু পুনর্নির্মাণ, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যমান রেলক্রসিংগুলোতে ওভারপাস বা ফ্লাইওভার নির্মাণ, চট্টগ্রামে ইন্টার-মোডাল টার্মিনাল নির্মাণ, বিদ্যমান লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর, প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রড গেজ ইঞ্জিন কেনা, কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়, পশ্চিমাঞ্চলের মেইন লাইন রেলপথ সংস্কার।

মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় তৃতীয় পর্বে (২০২৬-২০৩০) ৩৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে ব্যয় হবে ৯২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্রড গেজ কোচ ও ইঞ্জিন কেনা, কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য সরঞ্জাম উন্নয়ন, আবদুল্লাহপুর-পাবর্তীপুর ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ, আখাউড়া-সিলেট ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ, ফৌজদারহাটে দ্বিতীয় টার্মিনাল নির্মাণ, পুরনো কোচ-ইঞ্জিন পুনঃস্থাপন, নতুন তিস্তা সেতু নির্মাণ ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পুনর্নির্মাণ উল্লেখযোগ্য।

মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় চতুর্থ পর্বে (২০৩১-২০৩৫) ২৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯০ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা। পঞ্চম পর্বে (২০৩৬-২০৪০) আরো ১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। আর ষষ্ঠ পর্বে (২০৪১-২০৪৫) সুনির্দিষ্ট প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়নি। এক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ রাখা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা।

এদিকে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে ব্যয় নির্ধারণ করা হলেও অর্থায়নের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল হক বলেন, ৩০ বছরে দেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতির আকার ও পরিবহন চাহিদা অনেক পরিবর্তন হয়ে যাবে। সে সময়ের চাহিদা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে না পারলে মাস্টারপ্ল্যান কোনো কাজে আসবে না। এ ধরনের উদাহরণ এর আগেও অনেক দেখা গেছে। তাই পরিকল্পনা প্রণয়নের আগে এর ভিত্তি নির্ধারণ করা জরুরি। তার ভিত্তিতে রেলওয়ের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা উচিত ছিল। এছাড়া মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ করাও জরুরি। এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা না থাকলে তা পূর্ণাঙ্গও বলা যাবে না।


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।