ব্যয় কমছে রেলের দুই প্রকল্পে

ব্যয় কমছে রেলের দুই প্রকল্পে

শিপন হাবীব :

রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ দুই উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় কমছে। এ সম্পর্কিত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রেলপথ মন্ত্রণালয়ে গেছে। নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যয় কমানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। প্রকল্প দুটি হল- ‘আখাউড়া-সিলেট মিশ্র গেজ রেললাইন নির্মাণ’ ও ‘জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী মিশ্র গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প’।

আখাউড়া-সিলেট মিশ্র গেজ রেললাইন নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। আর জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী মিশ্র গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। কিন্তু কাজ শুরুর আগেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ব্যয়ের বিষয়টি তদন্ত করা হয়। এতে বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি চিহ্নিত হয়। এ কারণে দুই প্রকল্প থেকে ৪ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা কমাতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ব্যাপারে তার অনুশাসন ৫ নভেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

জানতে চাইলে বুধবার দুপুরে রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব গ্রহণের আগে প্রকল্প দুটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। চীনের সঙ্গে এ দুটি জিটুজি প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ নিয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলপথ বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনা চলছিল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা এসেছে। আমরা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করছি। দুটি প্রকল্পই গুরুত্বপূর্ণ। রেলওয়ের সেবা ও গতি আরও বাড়াতে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী দুটি প্রকল্প থেকে ৪ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা কমাতে হবে। তার নির্দেশনা মোতাবেক আমরা কাজ করছি।’

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জিটুজি প্রকল্পের বিষয়ে পাঠানো অনুশাসনে বলা হয়েছে, আখাউড়া-সিলেট প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় থেকে ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা (২০ দশমিক ৮ শতাংশ) কমাতে হবে। আর জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী প্রকল্পে অনুমোদিত দরপত্র মূল্য থেকে ১ হাজার ৪৯৫ কোটি ৫১ লাখ (১২ দশমিক ৯১ শতাংশ) কমিয়ে প্রকল্পটি সংশোধন করতে হবে। এছাড়া তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ, সুপারিশসহ সার্বিক বিষয়ে যথাযথ পর্যালোচনা করে প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়ার কথা রয়েছে অনুশাসনে।

রেলওয়ে অর্থনৈতিক দফতর সূত্রে জানা যায়, এ ধরনের প্রকল্পে লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার মাটি ভরাটের কাজে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা ধরা হয়। কিন্তু এ দুটি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০০ টাকার বেশি। এছাড়া আখাউড়া-সিলেট চলমান সিঙ্গেল লাইনের পাশে আরেকটি অস্থায়ী সিঙ্গেল লাইন স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা। অস্থায়ী এ লাইনটি নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর কোনো কাজেই আসবে না।

সূত্র জানায়, আখাউড়া সিলেট চলমান সিঙ্গেল রেলপথ ভেঙে ডুয়েলগেজ লাইন স্থাপনে ৫ সংসদ সদস্য ডিও লেটার দিয়েছিলেন। ২৬ আগস্ট এ প্রকল্পের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি লেখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন। ঠিকাদার নিয়োগ এবং চীনা সরকার অর্থায়ন নিশ্চিত করার পরও কাজে দেরি হওয়ার বিষয় উল্লেখ করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে। প্রকল্পের ব্যয় বেশি নয় বলেও চিঠিতে দাবি করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। কাজ দেরি হলে চীন সরকারের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। গত বছর আগস্টে এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানকেও চিঠি দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ বিষয়ে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন বরাবর এটি ডিও লেটার দেন। এর সঙ্গে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদের স্বাক্ষরিত তিনটি ডিও লেটার সংযুক্ত করেন। পত্রের একটি অংশে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সারা দেশের সঙ্গে সিলেট অঞ্চলের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য আখাউড়-সিলেট লাইনটি ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ করা প্রয়োজন। আখাউড়া-সিলেট রেল লাইনটি বর্তমানে মিটার গেজ এবং সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় ট্রেন ক্রসিংয়ে যাত্রীদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয় ও সময় অপচয় হয়’। তিনি শুধু ডুয়েল গেজ নয়- ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণের জন্য সুপারিশ করেন রেলপথমন্ত্রীকে।

জানা যায়, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী মিশ্র গেজ ডাবল লাইন নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ কোটি টাকা। জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর পথে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৪ কোটি টাকা। আখাউড়া-লাকসাম পথে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১৯ কোটি টাকা। একই ধরনের অন্য প্রকল্পের চেয়ে এ ব্যয় কয়েকগুণ বেশি। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী মিশ্র গেজে অনুমোদিত দরমূল্য হতে ১ হাজার ৪৯৫ কোটি ৫১ লাখ (১২ দশমিক ৯১ শতাংশ) কমিয়ে প্রকল্পটি সংশোধন করতে বলা হয়েছে।

রেলওয়ের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরাসরি একজন ঠিকাদারকে কাজ দেয়া হলে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ হলে- প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় অনেক কমে আসতো। ৪ সেপ্টেম্বর যুগান্তরের শেষ পৃষ্ঠায় ‘সিঙ্গেল গেজ ডুয়েল হচ্ছে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ : কয়েক হাজার কোটি টাকা অপচয়ের আয়োজন’- শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছিল, রেলে বাস্তবায়ন হওয়া একই ধরনের প্রকল্পের চেয়ে প্রায় ৭ গুণ বেশি খরচ হচ্ছে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ নির্মাণে। এছাড়া এ রেলপথ নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয়সহ চলমান সিঙ্গেল গেজ থেকে ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণে সিলেটবাসী ও রেলওয়ে সেভাবে লাভ হবে না।

সূত্র:যুগান্তর, ১৩ নভেম্বর ২০২০

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।