শিরোনাম

বাস্তবায়নে ব্যয় হবে সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা

বাস্তবায়নে ব্যয় হবে সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা

ইসমাইল আলী:
রেলওয়ের সেবার মানোন্নয়নে প্রচুর বিনিয়োগ করছে সরকার। প্রতি বছর এ খাতে বাড়ানো হচ্ছে বরাদ্দ। এরপরও সংস্থাটির সেবায় খুব বেশি গতি আসেনি। তাই রেলের পরিকল্পিত উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রণয়ন করা হচ্ছে ৩০ বছর মেয়াদি (২০১৬-২০৪৫) মাস্টারপ্ল্যান। এর আওতায় ছয় পর্বে ২৩০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে রেলওয়ে। আর এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা।

৩০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান সম্প্রতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগিরই রেলপথ মন্ত্রণালয়ে তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে। এশীয় উন্নয়নের ব্যাংকের (এডিবি) কারিগরি সহায়তায় মাস্টারপ্ল্যানটি প্রণয়ন করেছে সিপিসিএস ট্রান্সকম লিমিটেড ও ই.জেন কনসালট্যান্টস লিমিটেড।
তথ্যমতে, বর্তমানে রেলওয়ের চলমান ৪৩টি প্রকল্পকে মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলোসহ প্রথম পর্বে (২০১৬-২০২০) বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প রাখা হয়েছে ৮৩টি। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৪৭ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সম্ভাব্য বিদেশি সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৭ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। বাকি অর্থ সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করতে হবে। তবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ব্যবহারের সুপারিশও রয়েছে।

প্রথম পর্বে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যমুনা নদীর ওপর রেল সেতু নির্মাণ, নারায়ণগঞ্জে নতুন লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ নির্মাণ, আখাউড়া-সিলেট রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডাবল লাইন নির্মাণ, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর, ভাঙ্গা-বরিশাল-পায়রা বন্দর রেলপথ নির্মাণ, আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ, বগুড়া-বঙ্গবন্ধু রেল সেতু সংযোগ রেলপথ নির্মাণ, পাহাড়তলী কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপ আধুনিকায়ন, ডেমু মেরামতে পৃথক ওয়ার্কশপ নির্মাণ, গাজীপুরের ধীরাশ্রমে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, ৪০টি ব্রডগেজ ইঞ্জিন কেনা উল্লেখযোগ্য।

মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় দ্বিতীয় পর্বে (২০২১-২০২৫) ৬৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এতে ব্যয় হবে এক লাখ ১৯ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সম্ভাব্য বিদেশি সহায়তা দরকার হবে ৭২ হাজার ৮১২ কোটি টাকা। বাকি অর্থ সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ অথবা পিপিপির আওতায় বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যবহার করা হবে।

-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণ, টঙ্গী-ভৈরব বাজার রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর, বিদ্যমান ভৈরব ও তিস্তা রেল সেতু পুনর্নির্মাণ, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যমান রেল ক্রসিংগুলোতে ওভারপাস বা ফ্লাইওভার নির্মাণ, চট্টগ্রামে ইন্টার-মোডাল টার্মিনাল নির্মাণ, বিদ্যমান লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর, প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রডগেজ ইঞ্জিন কেনা, কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়, পশ্চিমাঞ্চলের মেইন লাইন রেলপথ সংস্কার।

মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় তৃতীয় পর্বে (২০২৬-২০৩০) ৩৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে ব্যয় হবে ৯৪ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। বিদেশি অর্থায়ন সংগ্রহকে এক্ষেত্রে জোড় দেওয়া হলেও তা না পাওয়া গেলে সরকারি বিনিয়োগ বা পিপিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় পর্বে প্রকল্পগুলোর মধ্যে ব্রডগেজ কোচ ও ইঞ্জিন কেনা, কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য সরঞ্জাম উন্নয়ন, আবদুল্লাহপুর-পার্বতীপুর ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ, আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ, ফৌজদারহাটে দ্বিতীয় টার্মিনাল নির্মাণ, পুরোনো কোচ-ইঞ্জিন পুনঃস্থাপন, নতুন তিস্তা সেতু নির্মাণ, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পুনর্নির্মাণ উল্লেখযোগ্য।

মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় চতুর্থ পর্বে (২০৩১-২০৩৫) ২৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৬ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। পঞ্চম পর্বে (২০৩৬-২০৪০) ১৪টি ও ষষ্ঠ পর্বে (২০৪১-২০৪৫) ছয়টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৮২ হাজার ৬৪৯ কোটি ও ১২ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। তবে প্রয়োজন অনুপাতে নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ রয়েছে। শেষ তিন পর্বেও বিদেশি অর্থায়ন সংগ্রহকে জোড় দেওয়া হয়েছে। তা না পাওয়া গেলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামছুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ৩০ বছরে দেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতির আকার ও পরিবহন চাহিদা অনেক পরিবর্তন হয়ে যাবে। সে সময়ের চাহিদা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে না পারলে মাস্টারপ্ল্যান কোনো কাজে আসবে না। এ ধরনের উদাহরণ এর আগেও অনেক দেখা গেছে। তাই পরিকল্পনা প্রণয়নের আগে এর ভিত্তি নির্ধারণ করা জরুরি। তার ভিত্তিতে রেলওয়ের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা উচিত ছিল। এছাড়া মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ করাও জরুরি। এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা না থাকলে তা পূর্ণাঙ্গ বলা যাবে না।

জানতে চাইলে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে ২০ বছর মেয়াদি রেলওয়ের একটি মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। তবে সেটির সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি চূড়ান্ত হলেও সময়ের সঙ্গে তা আধুনিকায়ন করা হবে।

প্রসঙ্গত, রেলের পরিকল্পিত উন্নয়নে প্রথম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয় ২০১৩ সালে। তবে ২০১১ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত ২০ বছরে এটির কার্যকাল ধরা হয়। সেটিতে চার পর্বে ২৩৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। তবে শুরুতেই হোঁচট খায় মহাপরিকল্পনাটি। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রথম পর্বের বেশিরভাগ প্রকল্পই বাস্তবায়ন হয়নি। তাই নতুন করে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬-২০৪৫ মেয়াদের জন্য মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এবারও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে গিয়ে তিন বছর পেরিয়ে যাওয়ায় প্রথম পর্বের অনেক প্রকল্পই অবাস্তবায়িত থাকবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

সুত্র:শেয়ার বিজ, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৯


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।