শিরোনাম

পদ্মা সেতু রেললিংক প্রকল্পে ছয়গুণ বেড়েছে পরামর্শক ব্যয়


।। নিউজ ডেস্ক ।।
পদ্মা সেতু রেললিংক প্রকল্পের চলতি বছরের জুলাইয়ে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঘোর কাটছেই না। দীর্ঘ ৬ বছরের অগ্রগতি মাত্র ৫৪ শতাংশ। সময় বাড়ল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।

ইতোমধ্যে আরেক দফা ব্যয় বেড়ে ছয়গুণে দাঁড়িয়েছে। সময় বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে পরামর্শক ব্যয়ও। প্রতিশ্রুতি ছিল, মূল পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন সড়ক যানের সঙ্গে চলবে ট্রেনও। এমন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আর কোনো পথ থাকছে না। আশা ছেড়ে দিয়েছেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তবে স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যেতেও পদে পদে বাধায় পড়ছে রেল।

মূল সেতুর রেলপথ স্থাপন করতে প্রায় দেড় বছর চিঠি চালাচালি করছে রেল, অনুমতি মেলছে না। কবে, কখন অনুমতি মেলবে, তাও নিশ্চিত নয়। এমন অবস্থায় আরেক দফা পরামর্শক ব্যয় ৪০৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সালে মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনকালে পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা। পরে আরও পাঁচবার ব্যয় বাড়িয়ে ৯৪০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা করা হয়। নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৩৫০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। একদিকে স্বপ্নে হোঁচট, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে ব্যয় বাড়ছে। এমন অবস্থায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, ঋণচুক্তি মোতাবেক অর্থ বরাদ্দ পাওয়া না গেলে ঠিকাদারকে দণ্ডসুদ প্রদান করতে হবে। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি আরও ব্যাহত হবে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির অনুমোদন করা হয় ২০১৬ সালে। শুরুতে ঢাকা থেকে মাওয়া ও নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত প্রায় ১৭১ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে একই দিন পদ্মা সেতু দিয়ে সড়ক যানের সঙ্গে ট্রেনও চালানো হবে, এমন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সেতুর দুই পাশে ৪০ কিলোমিটার রেলপথ স্থাপন শুরু হয়। পদ্মা সেতু আগামী জুনে চালু হচ্ছে। এখনো মূল সেতুতে রেলকে কাজ (রেললাইন স্থাপন) করার সুযোগ দেয়নি সেতু কর্তৃপক্ষ। রেল বলছে, সেতুর কাজের অনুমতি পাওয়া যায়নি, কবে পাওয়া যাবে, সেটাও অনিশ্চিত।

অনুমতির প্রথম দিন থেকে কমপক্ষে ৬ থেকে ৮ মাস সময় লাগবে সেতুয় রেলপথ বসানোসহ আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে। এতে পরামর্শক নিয়োগের মেয়াদ বাড়ানোর সঙ্গে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে রেলপথ নির্মাণে ডিজাইন রিভিউ টিমেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্টের (সিএসসি) সঙ্গে রেলওয়ের চুক্তি ছিল চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

এখন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সংশোধিত মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। যেখানে নতুন করে আবারও পরামর্শক খাতে ৪০৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে প্রস্তবনাটি রেলওয়ে থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই প্রস্তাবনাটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর কথা রয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এ প্রকল্পটি ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প।

প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যথাযথ অগ্রগতির স্বার্র্থে প্রস্তাবটি সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতি অনুসরণ করে অনুমোদন প্রয়োজন।

করোনা এবং লকডাউনের কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে। এদিকে ২০১৬ সালে মূল ডিপিপি অনুমোদনকালে পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৯৪০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। প্রস্তাব অনুযায়ী যা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৩৫০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

এদিকে সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো এক পত্রে জানা যায়, ঢাকা-মাওয়া, মাওয়া-ভাঙ্গা এবং ভাঙ্গা-যশোর সেকশনের নির্মাণকাজের অগ্রগতি যথাক্রমে ৪৭, ৭৪ এবং ৪১ শতাংশ।

সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৫০.৫০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৫১.৮২ শতাংশ (মবিলাইজেশন অ্যাডভান্সসহ)। ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত এ প্রকল্পটি সুষ্ঠু বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০২১-২২ অর্থবছরের এডিপি জিওবি ৩২৭১.৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

এর সঙ্গে অতিরিক্ত জিওবি ৫২৫.১১ কোটি টাকাসহ অর্থাৎ ৩৭৯৭.০০ কোটি টাকা চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপিতে) বরাদ্দের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ পাওয়া না গেলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দণ্ডসুদ প্রদান করতে হবে জানিয়ে পত্রে আরও বলা হয়, যথাসময়ে বরাদ্দ এবং অর্থছাড় পাওয়া না গেলে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ব্যাহত হবে।

এদিকে মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পে আরও ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সময়ও বাড়তে পারে। দীর্ঘ ৬ বছরে ৫০ শতাংশের মতো কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। প্রকল্পে থাকা বড় ব্রিজগুলোর কাজ এগোয়নি।

অর্থাৎ ধীরগতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কারণে ভবিষ্যতে নির্মাণ পরামর্শক তথা নির্মাণব্যয় আরও বাড়তে পারে। এমন অবস্থায় যথাসময়ে প্রকল্প সমাপ্ত করতে হলে নতুন পদ সৃষ্টিসহ জনবল বাড়ানো প্রয়োজন।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেন যুগান্তরকে জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বৃদ্ধির সঙ্গে পরামর্শক খাতে ব্যয় বাড়াতে ৪০৯ কোটি ৫১ লাখ টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ফাস্ট ট্র্যাকের এ প্রকল্পটি যথাযত বাস্তবায়নের স্বার্থে প্রস্তাবটি দ্রুতসময়ের মধ্যেই অনুমোদিত হবে। প্রস্তাবটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই এটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে, এমনটা আশা করছি।

তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন গতি বাড়াতে পদ্মা সেতুর রেল অংশে কাজের অনুমতি জরুরি হয়ে পড়ছে। রেলওয়ের পক্ষ থেকে মূল সেতুতে কাজের অনুমতি পেতে বহুবার সেতু কর্তৃপক্ষ বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এখনো অনুমতি পাওয়া যায়নি, কখন পাওয়া যাবে, সেটিও নিশ্চিত নয়। অনুমতির প্রথম দিন থেকে শুধু মূল সেতুয় কাজ করতে ৬ থেকে ৭ মাস সময় লাগবে।

পুরো প্রকল্পেই কাজ চলছে, বর্তমানে কাজের সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৫৪ শতাংশ। আমরা এতোমধ্যে বাড়তি জনবল চেয়েছি। বাড়তি জনবলের সঙ্গে বাড়তি সরঞ্জামেরও প্রয়োজন হবে।

এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন যুগান্তরকে বলেন, পদ্মা সেতুর রেলওয়ে অংশে কাজ শুরু করতে সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। কিন্তু সেতুর রেল অংশের কাজ সমাপ্ত করতে ৬ মাসের বেশি সময় লাগবে।

সেই ক্ষেত্রে একই দিন সেতু দিয়ে সড়ক যানের সঙ্গে ট্রেন চালানো অসম্ভব হয়ে উঠছে। তবে আমরা এখনো আশা ছাড়িনি। পরামর্শক ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, লকডাউন এবং করোনার কারণে কাজের গতি কমেছিল।

তা পুষিয়ে নিতে জনবল ও সরঞ্জাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে। এতে পরামর্শক ব্যয় বাড়ছে। সংশোধিত প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, এ প্রকল্পটি অনুমোদনকালে নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে এক দফা বাড়ানোর পর তা দাঁড়ায় ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ২১ হাজার ৩৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ঋণ দিচ্ছে চীন। বাকি ১৮ হাজার ২১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা বাংলাদেশ সরকারের তহবিল থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে।

সূত্রঃ কালের কণ্ঠ


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।