নৌ ও সড়কের পর রেলপথে ট্রানজিট চায় ভারত

নৌ ও সড়কের পর রেলপথে ট্রানজিট চায় ভারত

ইসমাইল আলী: বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে আনুষ্ঠানিক নৌ ট্রানশিপমেন্ট চালু হয় গত বছর জুনে। সড়কপথেও সরাসরি যান চলাচলে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও ভারত (বিবিআইএন) চুক্তি সই করেছে। তবে নানা জটিলতায় তা শুরু হয়নি। এবার বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে রেলপথে ট্রানজিট চায় ভারত। এজন্য সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খসড়া পাঠিয়েছে ভারত। এরই মধ্যে তা চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে এমওইউ সইয়ের কথা রয়েছে।

এর আগে চার দেশের মধ্যে রেলপথে বিবিআইএন চালুর জন্যও কাজ করছে ভারত। এজন্য গত বছর একটি চুক্তির খসড়া প্রস্তাব পাঠায় দেশটি। তবে নেপাল ও ভুটানে রেলপথ না থাকায় পরে রেল বিবিআইএনের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এবার দুই দেশের মধ্যে কনটেইনার পরিবহনে চুক্তির প্রস্তাব করলো ভারত।তথ্যমতে, দুই দেশের মধ্যে কনটেইনার পরিবহনে গত ডিসেম্বরে প্রস্তাব দেয় ভারত। এর শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডার স্ট্যান্ডিং বিটউইন কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল) অ্যান্ড কনটেইনার করপোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (কনকর) টু প্রোমোট অ্যান্ড এক্সপান্ড কো-অপারেশন বিটউইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ ইন দ্য ফিল্ড অব কনটেইনার ট্রান্সপোর্টেশন ফর মিউচুয়াল বেনিফিট অব বোথ কান্ট্রিজ’।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে রেলপথে পণ্য পরিবহনে চুক্তি রয়েছে। এর আওতায় বহু বছর ধরেই রেলপথে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি-রফতানি হচ্ছে। এমনকি ভারত হয়ে নেপালেও রেলপথে পণ্য পাঠানো হয়েছে। তাই কনটেইনার পরিবহনে পৃথক কোনো এমওইউর প্রয়োজন ছিল না। এর মাধ্যমে মূলত দুই দেশের মধ্যে রেল ট্রানজিট চালু হবে।এমওএউতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বৃদ্ধিতে উভয় দেশের মধ্যে রেলপথে কনটেইনার পরিবহন চালু করতে দরকার। এজন্য দুই দেশের কনটেইনার কোম্পানি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আর কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য ঈশ্বরদীর ইয়ার্ডকে রেলভিত্তিক অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) হিসেবে উন্নয়ন করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কনটেইনার ট্রেন ও আইসিডি পরিচালনায় সিসিবিএলকে সহায়তা করবে কনকর।

এতে আরও বলা হয়েছে, কনটেইনার পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতে প্রযোজ্য সব ধরনের আইন ও নিয়ম-নীতি অনুসরণ করা হবে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য এমওইউ সই করা হবে। তবে উভয়পক্ষ ৯০ দিনের লিখিত নোটিশের মাধ্যমে এটির মেয়াদ নবায়ন করা যাবে। অন্যথায় তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এ ছাড়া যে কোনো পক্ষ চাইলে লিখিত নোটিশের মাধ্যমে যে কোনো সময় এমওইউ স্থগিত করতে পারবে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, রেলপথে কনটেইনার পরিবহন বাড়ানো ও সিসিবিএলকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে ভারতের কনকর। এজন্য ভারতের প্রস্তাবিত খসড়া পর্যালোচনার মাধ্যমে এমওইউ চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় এটি সই হওয়ার কথা রয়েছে।উল্লেখ্য, সিসিবিএল বাংলাদেশের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। এটি গত বছর ১৭ মে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজের আওতায় নিবন্ধিত। আর কনকর ভারতের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত একটি কোম্পানি। এটি দেশটির নভরত্ন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৮৮ সালের মার্চে নিবন্ধিত হয়।

এদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে কনটেইনার ট্রেন চালুর জন্য ভারতের কনকরকে নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতের ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, নৌপথের চেয়ে রেলে পণ্য পরিবহন ৩০ শতাংশ সাশ্রয়ী। এজন্য পণ্য পরিবহনে রেলপথকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালের সঙ্গে ট্রেন চালুর কথা জানানো হয়।সম্প্রতি এমওইউয়ের খসড়ার ওপর পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। পরে তা চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ও সম্ভাব্য রেলরুটগুলোর সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরা হয়। এতে জানানো হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেলপথে ৮টি ইন্টারচেঞ্জ ছিল। এগুলো হল: বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে, রহনপুর-সিংগাবাদ, বিরল-রাধিকাপুর, কুলাউড়া-মহিষাসন, চিলাহাটি-হলদিবাড়ি, বুড়িমারি-চেংরাবান্ধা ও মোগলহাট-গিতলদহ। এর মধ্যে প্রথম তিনটি রুটে আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচল করছে। চতুর্থ রুটটি (বিরল-রাধিকাপুর) ব্রড গেজে রূপান্তরের পর ট্রেন চলাচলের উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা যেতে পারে।

বাকি চারটি রুটের মধ্যে কুলাউড়া-মহিষাসনের সংস্কার কাজও শুরু করা হয়েছে। চিলাহাটি-হলদিবাড়ি পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। বুড়িমারি-চেংরাবান্ধা ও মোগলহাট-গিতলদহ আপাতত চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে আখাউড়া-আগরতলা নতুন ইন্টারচেঞ্জ চালুর লক্ষ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে। এছাড়া ফেনী-বেলুনিয়া রুটেও নতুন ইন্টারচেঞ্জ চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে।সূত্র জানায়, চার দেশের মধ্যে ট্রেন চলাচলে বিবিআইএন রেল চুক্তির খসড়া গত বছর এপ্রিলে পাঠায় ভারত। সেটি সম্পর্কে মতামত চেয়ে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের মতামত চেয়ে চিঠিও দেয় দেশটি।

বিবিআইএনের আওতায় চার দেশের মধ্যে ট্রেন চলাচলে ৯টি রুট প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত রুট ছিল চারটি। এর প্রথমটি হলো ভারতের দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে বেনাপোল হয়ে ঢাকা, আখাউড়া দিয়ে ভারতের আগরতলা। দ্বিতীয় রুটটি দিল্লি থেকে কলকাতা, পেট্রাপোল-বেনাপোল, ঢাকা হয়ে মৌলভীবাজারের শাহবাজপুর দিয়ে ভারতের মহিষাসন পর্যন্ত। তৃতীয় রুটটি ভারতের দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে বাংলাদেশের খুলনা দিয়ে মংলা বন্দর পর্যন্ত। আর চতুর্থ রুটটি ভারতের ইম্ফল থেকে আগরতলা হয়ে আখাউড়া দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত। এর বাইরে বাংলাদেশ-ভারত-নেপালের জন্য ৩টি ও বাংলাদেশ-ভারত-ভুটানের জন্য ১টি রুট ছিল।

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।

Be the first to comment on "নৌ ও সড়কের পর রেলপথে ট্রানজিট চায় ভারত"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*