নকশাগত ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করা হোক

নকশাগত ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করা হোক

সারা বিশ্বে রেলকে সবচেয়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে রেল ব্যবস্থাও নিরাপদ নয়। হরহামেশাই দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে বিপুল প্রাণহানি ও পরিবহনের ক্ষতি হচ্ছে। আর এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং ও ক্রসিংয়ের বাড়তি উচ্চতা। বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো ধরনের আদর্শ নকশা না করে এবং কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই বেশির ভাগ লেভেল ক্রসিং তৈরি করা হয়েছে। ভুল নকশা আর ভুল পরিকল্পনায় নির্মাণ করা এসব লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি। এতদিন রেল দুর্ঘটনার জন্য বৈধ-অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে গেটকিপার না থাকার অভিযোগই আসত বেশি। এবার উঠে এসেছে লেভেল ক্রসিংয়ে নকশাগত ত্রুটির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনতে বিষয়টি পর্যালোচনাপূর্বক দ্রুত লেভেল ক্রসিংয়ের মান উন্নয়ন ও নকশাগত ত্রুটি সংশোধনে রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় লেভেল ক্রসিং একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও বাংলাদেশে এটিকে সবসময়ই অবহেলার দৃষ্টিতেই দেখা হয়েছে। প্রায় আড়াই হাজারের ওপর বৈধ ও অবৈধ লেভেল ক্রসিং থাকলেও এগুলোর মান নিয়ে বিস্তারিত কোনো গবেষণাই হয়নি। এগুলোর নির্মাণ প্রক্রিয়া, নকশা কেমন হওয়া উচিত, প্রকৌশলগত কোনো গাইডলাইন আছে কিনা, তাও জানা যায় না। লেভেল ক্রসিং নির্মাণ তদারকির দায়িত্ব কার, তাও স্পষ্ট নয়। ফলে সিটি করপোরেশন, এলজিইডি, সওজ নিজেদের মতো করে এটি তৈরি করছে। লেভেল ক্রসিং নির্মাণে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সহায়তাও নেয়া হয় না। ফলে নানা ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা থেকে যাচ্ছে, যা দুর্ঘটনার শঙ্কা আরো বাড়িয়ে তুলছে। এক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নিয়মিত রেললাইন পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। চালকদের সচেতন করতে হবে এবং প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। লেভেল ক্রসিংগুলোয় যেহেতু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি, সেক্ষেত্রে কীভাবে এর মান উন্নয়নের মাধ্যমে দুর্ঘটনার পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। বাংলাদেশে চলাচল করা ভারী যানবাহনগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়াও এ ধরনের দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ। বাংলাদেশে অধিকাংশ লেভেল ক্রসিংয়ে রাস্তা ভাঙা ও খানাখন্দময়। পেভমেন্টজনিত ত্রুটিও বিদ্যমান। ফলে লেভেল ক্রসিংয়ে এসে গাড়িচালকরা গাড়ির গতি কমিয়ে আনতে বাধ্য হন। হঠাৎ করে গতি পরিবর্তন করায় অনেক সময় গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। আবার বর্ষা ও গরমের সময় লেভেল ক্রসিংগুলো পিচ্ছিল হয়ে থাকে। ফলে এখান দিয়ে গাড়ি চলাচলের সময় ব্রেকিং সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করে না। মূলত লেভেল ক্রসিং নির্মাণকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। লেভেল ক্রসিংয়ের আগে একাধিক স্পিড ব্রেকার তৈরি করে থাকে সড়ক বিভাগ। দুর্ঘটনার এটিও একটি কারণ কিনা, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে সড়কের উচ্চতার সঙ্গে রেলপথের উচ্চতার সামঞ্জস্য রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি লেভেল ক্রসিং নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে এবং সঠিক পরিকল্পনা ও নকশায় সেগুলো নির্মাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকিও নিশ্চিত করা আবশ্যক।

বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা ইংল্যান্ডের। দেশটিতে কয়েক হাজার লেভেল ক্রসিং ও আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ফ্রিকোয়েন্সিতে রেল চললেও দুর্ঘটনার সংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেক কম। এর পেছনে কাজ করেছে দেশটির রেল বিভাগের গাইডলাইন ও আইন। লেভেল ক্রসিং তৈরি, পরিচালনা ও নকশা ইত্যাদিসংক্রান্ত শক্ত গাইডলাইন রয়েছে। মহাসড়কের লেভেল ক্রসিং কোন নকশা, কোন কাঁচামাল ও কীভাবে নির্মিত হবে, তার পূর্ণাঙ্গ বিধান রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ঢাল কেমন হবে, কোন ধরনের গাড়ি চলবে, রেলের গতি কেমন হবে প্রভৃতির বিস্তারিত রয়েছে এতে। মানুষ ও পশু চলাচলের লেভেল ক্রসিং কেমনভাবে নির্মিত হবে, তারও বিস্তারিত বিধান রয়েছে ইংল্যান্ডে। ভারতেও রেলের লেভেল ক্রসিং নির্মাণের একটি কার্যকর গাইডলাইন রয়েছে, যা সড়ক ও রেল বিভাগ মেনে চলে। এমনকি ক্রসিং নির্মাণের আগে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ ও অনুমতি নিতে হয়। বাংলাদেশ সরকার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে জোর দিয়েছে। নতুন রেল কোচ ও ইঞ্জিন আসছে। ফলে রেল চলাচলের ফ্রিকোয়েন্সিও বেড়ে উঠবে। সেক্ষেত্রে লেভেল ক্রসিং নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা ও এর নিরাপত্তা নিশ্চিতে একটি কার্যকর গাইডলাইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেটি মেনে চলতে অন্যদেরও তাগিদ দিতে হবে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ব্যতিরেকে বা নির্ধারিত নকশার বাইরে গিয়ে লেভেল ক্রসিং নির্মাণ না করা হয়, তা নিশ্চিত করতে তদারকি জোরদার করতে হবে। এর ঢাল কতটুকু হবে, কী উপকরণ দিয়ে এটি নির্মিত হবে—সবকিছুর বিস্তারিত লিখিত থাকা এবং তা মেনে চলা আবশ্যক।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্তরাও লেভেল ক্রসিংয়ের ত্রুটির বিষয়টি স্বীকার করে তাদের সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে এমনটি ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া লেভেল ক্রসিং নির্মাণসংক্রান্ত কোনো গাইডলাইন না থাকায় ত্রুটি বাড়ছে। সড়ক-মহাসড়কে লেভেল ক্রসিং নির্মাণে লোড এক্সেল বিবেচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জরুরি নিয়মিত তদারকি ও অরক্ষিত ক্রসিংকে প্রযুক্তির সাহায্যে সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। উন্নত দেশগুলোয় স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় লেভেল ক্রসিং নিয়ন্ত্রিত হয়। আমাদের এখানে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কিছু স্থানে চালু করা যেতে পারে। সবার আগে দরকার লেভেল ক্রসিং নির্মাণে পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন। এক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থার রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের সময় রেলের অনুমোদন নিতে হয়। ক্রসিংগুলোয় প্রতিবন্ধক ও অবকাঠামো তৈরি এবং কর্মী নিয়োগের পর ১০ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দেয়ার পরই অনুমতি পাওয়া যায়। ফলে অনুমোদিত ক্রসিং সুরক্ষিত রাখা রেলের দায়িত্ব। অথচ প্রতিবন্ধক, পাহারাদার এবং ট্রেন চলাচলের খবরাখবর জানা যায় এমন ব্যবস্থা আছে মাত্র ৪৪৮টি ক্রসিংয়ে। অর্থাৎ বৈধ বাকি ৯৬৪টি ক্রসিংয়েও কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। এসব ক্রসিংয়ে সতর্কবার্তা-সংবলিত সাইনবোর্ড টানিয়ে দায় সারছে রেল কর্তৃপক্ষ, যা হতাশাজনক।

রেল সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে বহু প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। কিন্তু রেলের অন্যতম বড় সমস্যা রেলক্রসিং সুরক্ষিত করার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছে না। বৈধ রেলক্রসিংগুলোয় গেটম্যান নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা আর অবৈধ রেলক্রসিংগুলোর ব্যাপারে জানা যায়, স্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্বারা এগুলো স্থাপিত হয়। কিন্তু এগুলো অরক্ষিত মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকতে পারে না। কাঠামোগত ত্রুটি দূরীকরণে রেলপথ মন্ত্রণালয়কেই উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে নির্মিত লেভেল ক্রসিংয়ের ত্রুটি সংশোধন করা প্রয়োজন। কাঠামোগত দুর্বলতার কারণেই দেশের অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই কিছু বিষয় সংশোধনের মাধ্যমে এটি দূর করা কঠিন নয়।

সূত্র:বণিক বার্তা, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২১


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।