টিকিট বিক্রিতে থাকছে না আসন সংরক্ষণ পদ্ধতি

টিকিট বিক্রিতে থাকছে না আসন সংরক্ষণ পদ্ধতি

সুজিত সাহা : বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাহিদার তুলনায় টিকিটের অপ্রতুলতা দীর্ঘদিনের। এর পরও বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনের নির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক টিকিট অনুরোধ ও ভিআইপিদের জন্য ব্লক (সংরক্ষণ) করে রাখা হয়। সর্বশেষ দুই ঈদে ভিআইপি বাদে অনুরোধের টিকিট সংরক্ষণ পদ্ধতি তুলে নিয়েছিল রেলওয়ে। এবার সারা বছরের জন্য অনুরোধের টিকিট সংরক্ষণ পদ্ধতি তুলে নিচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত টিকিট ৪৮ ঘণ্টা আগে উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে সংস্থাটি।

গত ২৬ নভেম্বর রেল ভবনে অনুষ্ঠিত মাসিক পরিচালন পর্যালোচনা সভায় (ওআরএম) কাউন্টারের টিকিট ও অনলাইনের টিকিট একই তারিখে উন্মুক্ত করার পাশাপাশি ভিআইপিদের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত টিকিটগুলো ৪৮ ঘণ্টা আগে কাউন্টার বা অনলাইনে উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর ফলে ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত টিকিট আগে ন্যূনতম ১২ ঘণ্টা আগে উন্মুক্ত হলেও এখন থেকে ৪৮ ঘণ্টা আগে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হবে। পাশাপাশি বিশেষ বিবেচনায় সিএনএস সফটওয়্যারে টিকিট ব্লক করে রাখার পদ্ধতি বাতিলের সুপারিশ করা হয়। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম), বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম), প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিএম) ও প্রধান পরিবহন কর্মকর্তাকে (সিওপিএস) দায়িত্ব দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ ২২ ডিসেম্বর ট্রেনের টিকিটের সব ধরনের টিকিট ব্লকিং বন্ধের নির্দেশনা দেয় রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. মিয়া জাহান। এজন্য সিএনএস লিমিটেডকে সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে নির্দেশনা দেয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ভিআইপি ছাড়া আসন সংরক্ষণ পদ্ধতি বাতিলের বিষয়টি মূলত সিসিএম দপ্তর দেখাশোনা করে। আমাদের কাছে এখনো এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি। এলে জনস্বার্থে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

রেলওয়ের ২০১২ সালের পরিপত্র অনুযায়ী সব আন্তঃনগর ট্রেনে সংসদ সদস্য, বিচারপতি, ভিআইপি, প্রতিবন্ধী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও অন্যান্য কোটায় নির্ধারিতসংখ্যক আসন সংরক্ষণ করার নিয়ম রয়েছে। ২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ের উপপরিচালক/টিসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই পরিপত্রে আগের আসন সংরক্ষণ-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জারীকৃত সব আদেশ বাতিল করা হয়। তার পরও প্রভাবশালীদের চাপে কম্পিউটার সিস্টেমে বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনে চাহিদা অনুযায়ী টিকিট সংরক্ষণ করে রাখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি সারা দেশের বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনের কম্পিউটার সার্ভার রুমে অটো কোটা বা ভিআইপিদের জন্য নির্ধারিত টিকিট ছাড়াও বিভিন্ন অনুরোধের টিকিট সংরক্ষণের অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে টিকিট কালোবাজারিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সংস্থাটির প্রতিবেদন রেলপথ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়ার পর সিলেট স্টেশনের টিকিট বিক্রিতে বেশকিছু অনিয়মের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় রেলপথ মন্ত্রণালয়।

গত ১৯ নভেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দেয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ১২ জন রেলকর্মী টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন স্টেশন ম্যানেজার, স্টেশন মাস্টার, সিএনএসের ফিল্ড কম্পিউটার অপারেটর, বুকিং ক্লার্ক, কুক কাম ওয়েটার, আরএনবির হাবিলদার, প্রধান বুকিং ক্লার্ক ও বুকিং সহকারী। এছাড়াও সিলেট স্টেশন সংলগ্ন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও মালিক রেলকর্মীদের সঙ্গে যোগসাজশে টিকিট কালোবাজারিসহ বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলেও ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে।

রেলের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পরিপত্র অনুযায়ী ২০১২ সালের হিসাবে রেলের ৪৬টি আন্তঃনগর ট্রেনের ভিআইপিদের জন্য আসন সংরক্ষণের নির্দেশনা ছিল। এরপর রেলে যুক্ত হওয়া প্রতিটি আন্তঃনগর ট্রেনেই একই নিয়মে আসন সংরক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলের তূর্ণা (৭৪১ ও ৭৪২ নং ট্রেন), একতা (৭০৬), সুন্দরবন (৭২৫), মহানগর গোধূলী (৭০৩ ও ৭২২), উদয়ন (৭২৩ ও ৭২৪), অগ্নিবীণা (৭৩৬), এগারসিন্ধুর (৭৩৭ ও ৭৫০), উপবন (৭৩৯ ও ৭৪০), চিত্রা (৭৬৪), নীলসাগর (৭৬৬), রংপুর (৭৭১), উপকূল (৭১২), জয়ন্তিকা (৭১৭), সুবর্ণ এক্সপ্রেস (৭০২) ট্রেনের ভিআইপি কোটার টিকিট ট্রেন ছাড়ার ১২ ঘণ্টা আগে কাউন্টারে সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করার নিয়ম রয়েছে। এছাড়া বাকি ট্রেনগুলোর ভিআইপি টিকিট ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার ১৬ ঘণ্টা আগে যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করতে হয়।

তূর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেনে ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত থাকে ৬২টি টিকিট, মহানগর প্রভাতী ও গোধূলী ট্রেনে ৬০টি করে, সুবর্ণ এক্সপ্রেসে ৬৮টি করে সর্বোচ্চ পরিমাণে টিকিট ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত। এর মধ্যে সুবর্ণ এক্সপ্রেসে বিচারপতিদের জন্য চারটি, সংসদ সদস্যের জন্য চারটি, ভিআইপি ৮টি (স্নিগ্ধা), বিশেষ কোটা ১২টি (শোভন চেয়ার), ভিআইপি আটটি (শোভন চেয়ার), বিশেষ কোটা ১২টি (শোভন চেয়ার) এবং প্রতিবন্ধী কোটায় শোভন চেয়ার শ্রেণীর টিকিট সংরক্ষিত থাকে ২০টি। অন্যান্য ট্রেনে নিয়মিত কোটার পাশাপাশি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কোটায় টিকিট সংরক্ষণ করা থাকে।

কিন্তু এর বাইরেও তদবিরের মাধ্যমে অনেকেই বিভিন্ন ট্রেনের টিকিট চাইলে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অনুকূলে বিভাগীয় বাণিজ্য কর্মকর্তার মাধ্যমে টিকিট সংরক্ষণ করে রাখা হয়। নির্ধারিত সময়ে ট্রেনের টিকিট উন্মুক্ত হওয়ার সময় ভিআইপি কোটার বাইরেও অনুরোধের টিকিটগুলো কম্পিউটার সিস্টেমে ব্লক করে রাখা হয়। ফলে একটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ৯০০ টিকিট থাকলেও সেখানে ভিআইপি ছাড়াও অনুরোধের টিকিট ব্লক করে রাখার কারণে সাধারণ যাত্রীরা টিকিট পেতে বিড়ম্বনার শিকার হয়। প্রায় সব ট্রেনেই প্রারম্ভিক স্টেশন থেকে শেষ স্টেশন বা গন্তব্য স্টেশনের টিকিটের সংখ্যা কম থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট না পাওয়ার ঘটনা ঘটছে। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে সাধারণ যাত্রীরা ট্রেনের টিকিটের জন্য ভোগান্তির মধ্যে পড়বে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সুত্র:বণিক বার্তা, জানুয়ারি ০২, ২০২০


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।