টাকার অবমূল্যায়ন: বঙ্গবন্ধু সেতুর ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৯০ শতাংশ

বঙ্গবন্ধু সেতুর ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৯০ শতাংশ

দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে ১৯৯৮ সালে উদ্বোধন করা হয় বঙ্গবন্ধু সেতু। তবে দ্র“তই এতে ফাটল ধরা পড়ে। তখন কমিয়ে আনা হয় ট্রেনের গতি। ফাটলের কারণ উদ্ঘাটনে কয়েক দফা গবেষণাও চলে। ২০১৩ সালে ফাটলগুলো মেরামত করা হয়। সেতুটির ফাটলের কারণ, বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুসন্ধান করেছে শেয়ার বিজ। এ নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের শেষ পর্ব

ইসমাইল আলী: বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে ২ হাজার ৫০৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা ঋণ দেয় তিন দাতা সংস্থা। ১৯৯৪ সালের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ডলার। এরপর থেকে নিয়মিতই অবমূল্যায়ন হয়েছে টাকার মানের। এতে ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২২ বছরে প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়ে গেছে ঋণের পরিমাণ। আগামীতে এটি আরও বাড়বে বলে নিশ্চিত সেতু কর্তৃপক্ষ।এদিকে ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আসল ও সুদ পরিশোধ গত কয়েক বছরে অনেক বেড়েছে। এতে ছয় বছরে প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়। আর ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ২০১১ সালে বাড়ানো হয় সেতুটির টোলের হার। চলতি বছর আবারও টোলের হার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

* ছয় বছরে অতিরিক্ত পরিশোধ ৪৮০ কোটি টাকা
* আয় বাড়াতে টোলের হার বৃদ্ধির উদ্যোগ

তথ্যমতে, যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, নদী শাসন, সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় হয় ৩ হাজার ৯৩৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৬৪ শতাংশ ঋণ দেয় বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন (জেবিআইসি)। সে সময় ডলারের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রার বিনিময় হার ছিল ৪১ টাকা ৮১ পয়সা।ঋণগুলোর গ্রেস পিরিয়ড ছিল নির্মাণ শেষ হওয়ার পর পাঁচ বছর। এতে ১৯৯৮ সালের জুনে উদ্বোধন হলেও পাঁচ বছর শুধুই সুদ দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। আর মূল ঋণ পরিশোধ শুরু হয় ২০০৪ সালের জুন থেকে। সে সময় থেকে দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ৩০ বছরে শোধ করতে হবে বিশ্বব্যাংকের ঋণ। এডিবির ঋণও শোধ করতে হবে ৩০ বছরে। তবে সুদের হার ১ শতাংশ। আর জাইকার ঋণ ১ শতাংশ সুদে পরিশোধ করতে হবে ২০ বছরে।সূত্র জানায়, সেতু নির্মাণের পর ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৩৭ টাকা ৬৩ পয়সা। এতে মূল ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা। এ হিসেবে এখন পর্যন্ত ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে প্রায় ৯০ শতাংশ। ২০৩৪ সাল পর্যন্ত পুরো ঋণ পরিশোধ হওয়ার কালে এ পরিমাণ ৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ঋণের সুদের পরিমাণও গত কয়েক বছরে কিছুটা বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের জন্য ঋণ গ্রহণের সময় ডলারের দাম ছিল অনেক কম। সে সময়ের তুলনায় এখন ডলারের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তাই ঋণ পরিশোধের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। আগামীতে এ ঋণ আরও বাড়বে।তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে সরকার নিজস্ব অর্থায়ন দিচ্ছে। এটি সেতু কর্তৃপক্ষের জন্য অনেক সহায়ক। কারণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রদত্ত এ ঋণও পরিশোধ করতে হবে। তবে ডলারের বিনিময় হারের জন্য সেতু কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত কোনো অর্থ পরিশোধ করতে হবে না।তথ্যমতে, বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ-পরবর্তী সময়ে বিনিময় হার কিছুটা ধীরে বৃদ্ধি পায়। এতে ২০১০ সাল পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে খুব বেশি চাপে পড়েনি সেতু কর্তৃপক্ষ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ঋণের আসল বাবদ ৫৯ কোটি ৩৮ লাখ ও সুদ বাবদ ২২ কোটি তিন লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। এরপর থেকে দ্রুত বাড়তে থাকে ডলারের বিনিময়। ফলে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপও বাড়তে থাকবে।২০১০-১১ অর্থবছরে ডলারের বিনিময় হার ৭৮ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এতে শুধু আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয় ১৬৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আর সুদ দিতে হয় ৩১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর ডলারের বিনিময় হার ৮২ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এতে আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয় যথাক্রমে ১৭৪ কোটি ৯৪ লাখ ও ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

এরপর ২০১২-১৩ অর্থবছরে ঋণের আসল বাবদ ১৮৬ কোটি ৫৩ লাখ, ২০১৩-১৪তে ১৮০ কোটি আট লাখ, ২০১৪-১৫তে ১৯৫ কোটি ১০ লাখ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৯৪ কোটি দুই লাখ টাকা পরিশোধ করে সেতু কর্তৃপক্ষ। এ চার অর্থবছরে সুদ পরিশোধ করা হয় যথাক্রমে ৩১ কোটি ৩২ লাখ, ৩১ কোটি ২০ লাখ, ২৭ কোটি চার লাখ ও ২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টাকার দ্রুত অবমূল্যায়নে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে ছয় বছরে সুদ ও আসল বাবদ প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়। এদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত ঋণের আসল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ১ হাজার ৭৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আর অবশিষ্ট আছে ১ হাজার ৪৩৫ কোটি শূন্য পাঁচ লাখ টাকা। তবে মুদ্রার অবমূল্যায়নজনিত কারণে অতিরিক্ত ঋণের হিসাবরক্ষণ নিয়ে বিপাকে পড়ে সংস্থাটি। কারণ ব্যালান্স শিটে অতিরিক্ত ঋণ পরিশোধ হয়ে যাচ্ছিল। তবে বাস্তবে অপরিশোধিত থেকে যাচ্ছিল ঋণ। পরে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে ডিফারেন্ট ইন এক্সচেঞ্জ রেট ফর বরোয়িং শীর্ষক নতুন ব্যয় খাত সৃষ্টি করা হয়। এ হিসাবে অতিরিক্ত পরিশোধিত ঋণকে ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়। এ বিষয়ে দেশি-বিদেশি অডিট সংস্থার মতামতও নেয় সেতু কর্তৃপক্ষ।

সেতু বিভাগের হিসাব বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে দুই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। একদিকে ঋণ পরিশোধ হয়ে যাচ্ছিল। আরেকদিকে ঋণ অবশিষ্ট থেকে যাচ্ছিল। পরে সমস্যা সমাধানে যুক্ত হয় ডিফারেন্ট ইন এক্সচেঞ্জ রেট ফর বরোয়িং। এ পদ্ধতিতে ঋণের সুষ্ঠু হিসাব রাখা হচ্ছে।

এদিকে ঋণ শোধের চাপ বাড়তে থাকায় ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ১৪ শতাংশ টোলের হার বৃদ্ধি করা হয়। এরপরও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। এজন্য আবারও টোলের হার বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে। খসড়া প্রস্তাবে এটি ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, একদিকে সেতুর ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে প্রতি বছরই সেতুর মেরামতে অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। আর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তাই টোল বৃদ্ধি না করলে আগামীতে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিয়ে চলতে হবে। এজন্য টোল বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। তবে এখনও কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়নি।


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।

Be the first to comment on "টাকার অবমূল্যায়ন: বঙ্গবন্ধু সেতুর ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৯০ শতাংশ"

Leave a comment

Your email address will not be published.


*