গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি সংশোধনে রেলওয়েকে নির্দেশ

অপটিক্যাল ফাইবার ভাড়া

নিজস্ব অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের (ওএফসি) প্রয়োজনাতিরিক্ত ক্ষমতা যাতে ভাড়া দিতে পারে, সেজন্য বাংলাদেশ রেলওয়েকে লাইসেন্স দেয়া হয় ২০১৪ সালে। কিন্তু তার আগেই ১৯৯৭ সালে শীর্ষ সেলফোন অপারেটর গ্রামীণফোনকে নিজেদের ওএফসি নেটওয়ার্ক ভাড়া দেয়ার চুক্তি করে রেলওয়ে। পরবর্তীতে এ চুক্তি নবায়নও করা হয়। রেলের সঙ্গে গ্রামীণফোনের সম্পাদিত এ চুক্তি ও তা নবায়ন টেলিযোগাযোগ খাতের বিদ্যমান আইন, নীতিমালা ও বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মত দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তাই গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

সিগনালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ১৯৮৭-৯২ পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে রেললাইনের সমান্তরালে অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। নরওয়ে সরকারের আর্থিক অনুদানে এ ব্যবস্থা চালু করা হয় মেইন লাইন সেকশনে। এতে ২ হাজার ১০ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রেলওয়ের ৩০০ স্টেশন সংযুক্ত হয়। সে সময় সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহূত ছিল। এজন্য ১৯৯৭ সালে গ্রামীণফোনকে অপটিক্যাল ফাইবার ইজারা দেয় রেলওয়ে। ২০০৪ সালে এ চুক্তি সংশোধন করা হয়। আর ২০০৭ সালে আবারো চুক্তি নবায়ন করা হয়, যার মেয়াদ রয়েছে ২০১৭ সাল পর্যন্ত।

নেশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) লাইসেন্স পাওয়ার পর রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার ভাড়া নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে অন্যান্য সেলফোন অপারেটরও। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আগ্রহের বিষয়টি এরই মধ্যে জানিয়েছে তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২ হাজার ১০ কিলোমিটার ওএফসি নেটওয়ার্কের মধ্যে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার অন্য প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেয়ার সুযোগ নেই বলে বাংলাদেশ রেলওয়েকে জানিয়ে দিয়েছে বিটিআরসি।

রেলওয়েকে পাঠানো এ-সংক্রান্ত চিঠিতে বিটিআরসি উল্লেখ করেছে, রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য গ্রামীণফোনের সঙ্গে সম্পাদিত মূল চুক্তি ও পরবর্তীতে সংশোধিত চুক্তি পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। চুক্তিটির সঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১, এনটিটিএন লাইসেন্সিং ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং নীতিমালার অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। রেলওয়েকে এনটিটিএন লাইসেন্স দেয়ার ফলে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক ভাড়া-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের যে চুক্তি রয়েছে, তা সংশোধন করা বাধ্যতামূলক।

জানতে চাইলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ  বলেন, রেলওয়েকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দেশের প্রচলিত আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংস্থাটিকে বলা হয়েছে। রেলওয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জবাব পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে কমিশন।

স্বাভাবিকভাবে অপটিক্যাল ফাইবারের আয়ুষ্কাল ১৫ বছর। এ সময়ের পর ফাইবার পরিবর্তন করতে হয়। ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ভাড়া নেয়া দুই কোরের কেবল পরবর্তীতে নিজ খরচে প্রতিস্থাপন করে গ্রামীণফোন। ওই সময় ৩২-৪৮ কোরের ফাইবার স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও বিটিআরসি বলছে, রেলওয়ের কাছ থেকে নেয়া অপটিক্যাল ফাইবারের দুই থেকে চারটি কোর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারের সুযোগ নেই গ্রামীণফোনের। তাছাড়া এনটিটিএন লাইসেন্সিং ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং নীতিমালা অনুযায়ী রেলওয়ের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া অপটিক্যাল ফাইবার বা এর ট্রান্সমিশন ক্যাপাসিটি অন্য কোনো অপারেটরকে লিজ বা সাব-লিজ দেয়া যাবে না।

গ্রামীণফোনের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি গুরুত্ব দিয়ে সংশোধনে রেলওয়ের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে বিটিআরসি বলেছে, গ্রামীণফোন থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে যেসব আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা পাচ্ছে, তা যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়। এছাড়া গ্রাহকদের সেবা দিতে গ্রামীণফোন বাংলাদেশ রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করছে, সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে।

যোগাযোগ করা হলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফিরোজ সালাহ উদ্দিন বলেন, বিটিআরসি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। রেলওয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলতে বাধ্য। বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে রেলওয়ে।

জানা গেছে, রেলওয়ের কাছ থেকে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক ভাড়া নেয়ার বিষয়টিকে অন্য সেলফোন অপারেটররাও অনিয়মতান্ত্রিক সুবিধা বলে মনে করছে। গ্রামীণফোনের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের অন্যতম ভিত্তিও রেলওয়ের এ নেটওয়ার্ক।

ফাইবার অপটিক ভাড়া বাবদ প্রতি বছর রেলওয়েকে ১০৬ কোটি টাকা ভাড়া প্রদান করছে গ্রামীণফোন। রেলওয়ের কাছ থেকে নেয়া প্রতি মিটার অপটিক্যাল ফাইবারের জন্য মাসে গ্রামীণফোনের ব্যয় ৬৮ পয়সা।

এনটিটিএন ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং নীতিমালা অনুযায়ী, দেশে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক তৈরি ও তা ব্যবসায়িকভাবে ভাড়া প্রদানের জন্য এনটিটিএন লাইসেন্স নেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০১১ এর ধারা ৪০ অনুযায়ী, বিটিআরসির অনুমতি ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের দেশে টেলিযোগাযোগ সেবা দেয়ার সুযোগ নেই। সরকারের পূর্ব অনুমোদনসাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এ অনুমতি দিতে পারে কমিশন।

বর্তমানে দেশে এনটিটিএন লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে পাঁচটি। ২০০৯ সালে লাইসেন্স দেয়া হয় ফাইবার অ্যাট হোম ও সামিট কমিউনিকেশন্স লিমিটেডকে। আর ২০১৪ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত তিন প্রতিষ্ঠান— বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) লিমিটেডকে এনটিটিএন লাইসেন্স দেয় বিটিআরসি।

 

সুত্র:বর্ণিক বার্তা, এপ্রিল ১৩, ২০১৭

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।