শিরোনাম

রেলে দুর্ঘটনার হার কমছে

রেলে দুর্ঘটনার হার কমছে

সুজিত সাহা: দীর্ঘদিনের পুরনো লাইনসহ বিভিন্ন কারণে গত কয়েক বছর একের পর এক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছিল রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন ট্রেন। তবে সর্বশেষ অর্থবছরে দুর্ঘটনার হার কিছুটা কমে এসেছে। ট্র্যাক সংস্কার ছাড়াও নতুন কোচের কারণে দুর্ঘটনা কমে আসছে বলে মনে করছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে পূর্বাঞ্চলে সর্বমোট দুর্ঘটনা ঘটে ৬২টি। এর আগের বছরগুলোয় বড় (মেজর) দুর্ঘটনা বেশি হলেও সর্বশেষ অর্থবছরে সংঘটিত সব দুর্ঘটনাই ছিল ছোটখাটো (মাইনর)। এসব দুর্ঘটনায় ১ জন নিহত হয়। আহত হয় মাত্র ৫ জন। এর মধ্যে মেইন লাইনে ৩৪টি, লুপ লাইনে ২টি, শাখা লাইনে ১০টি ও ইয়ার্ড লাইনে ১৬টি দুর্ঘটনা ঘটে। পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগে ৩৬টি দুর্ঘটনার বিপরীতে চট্টগ্রাম বিভাগের ২৬টি দুর্ঘটনায় মারা গেছে মাত্র একজন। পর্যাপ্ত অপারেটিং নীতিমালা মেনে চলা হলে দুর্ঘটনার হার আরো কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সর্বশেষ দুর্ঘটনা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল ৩২৭টি, যার মধ্যে ২০৬টিই ছিল মেইন লাইনে সংঘটিত দুর্ঘটনা। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল মেজর দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় ৫৫ জনের মৃত্যু হয়। সেই সঙ্গে রেলের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির ক্ষতিও হয় বেশ। তবে সর্বশেষ অর্থবছরে সংঘটিত ৬২টি দুর্ঘটনার মাত্র ৩৪টি মেইন লাইনে হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির হারও ছিল কম। এক বছরের ব্যবধানে বড় ধরনের দুর্ঘটনার হার কমে যাওয়ায় রেলের দুর্ঘটনা ঝুঁকি কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল হাই বণিক বার্তাকে বলেন, রেল নিরাপদ বাহন। তবে বিগত সময়ে কিছু দুর্ঘটনা ঘটলেও রেলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি রেলপথ এখনো নির্মাণাধীন রয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে রেলপথ সংস্কার ও উন্নয়নের পাশাপাশি কোচ ও ইঞ্জিন আমদানি বাড়ানো গেলে রেলের দুর্ঘটনা ঝুঁকি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

রেলওয়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট শায়েস্তাগঞ্জ-রশিদপুর সেকশনে বি-স্পেশাল-২ নামের ট্রেনটি পয়েন্ট নং-২৯(এ) অতিক্রমকালে বিএফআর নং-৩৫৫৩০-এর সামনের ট্রলির বাম ও ডান পাশের চাকা লাইনচ্যুত হয়। মূলত লাইন সম্প্রসারণের ফলে ট্রেনটি দুর্ঘটনাকবলিত হয় বলে রেলের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে। একই বছরের ২০ আগস্ট আখাউড়া সেকশনের ৯৫১ নম্বর ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়ে। ট্র্যাক সার্কিট নং-ডব্লিউ-১০৪ দীর্ঘদিন ধরে মেরামত না করায় দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রমাণ পায় রেলের পরিবহন বিভাগ। ১১ আগস্ট নাথেরপেটুয়া-সোনাইমুড়ি সেকশনে ৮৮ নং ডেমু ট্রেনের সঙ্গে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি মাইক্রোবাসের সংঘর্ষ হয়। মূলত অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রমাণ পায় রেলের পরিবহন বিভাগ। তবে সর্বশেষ অর্থবছরে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোচ ও ট্র্যাকের অবকাঠামোগত ত্রুটির কোনো প্রমাণ পায়নি রেলওয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো। এক্ষেত্রে ম্যানুয়াল সিগন্যালিং সিস্টেম ছাড়াও ট্রেনচালক ও বন্ধ রেল স্টেশনের সিগন্যালিংজনিত জটিলতায় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ছোট আকারের দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ কিংবা সর্বোচ্চ গতিসীমায় লাইনচ্যুত হওয়া ছাড়াও ট্রেন বহির্ভূত কোনো যানবাহনকে ধাক্কা প্রদান করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে। অপরদিকে সিগন্যাল অমান্য করে যাওয়া, স্বল্প গতিবেগে লাইনচ্যুত কিংবা শান্টিংকালে অন্য ট্রেন বা ইঞ্জিনকে ধাক্কা প্রদান করলে ছোট আকারের দুর্ঘটনা হয়। কিন্তু গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বশেষ বছরে বড় দুর্ঘটনার হার নেই বললেই চলে। পূর্বাঞ্চলের একাধিক লাইনে বর্তমানে কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলকিংয়ের (সিবিআই) কাজ চলছে। বেশকিছু সেকশনে এরই মধ্যে সিবিআই পদ্ধতি চালু হয়েছে।

দুর্ঘটনা এড়াতে রেলওয়ে এরই মধ্যে বেশকিছু উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রসিড সিগন্যাল ও ফগ সিগন্যাল স্থাপনের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। দায়িত্বে অবহেলা করলে দায়িত্বরত স্টেশন মাস্টার বা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। প্রয়োজনে দুর্ঘটনা এড়াতে তদারকির জন্য বিশেষ পরিদর্শক নিয়োগেরও সুপারিশ করে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয়।

রেলের প্রকৌশল বিভাগের তথ্যানুসারে, গত দেড় বছরের ব্যবধানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের দুটি ডাবললাইন প্রকল্প চালু হয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-জয়দেবপুর মেইন ও শাখা লাইনগুলো সংস্কার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ইয়ার্ড, শাখা লাইন ছাড়াও ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম-দোহাজারী ও চট্টগ্রাম-নাজিরহাট লাইনের সংস্কার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে ১৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দীর্ঘদিনের পুরনো ট্র্যাকটিও সংস্কার করেছে রেলওয়ে।

লাকসাম থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত দীর্ঘদিনের পুরনো লাইনটি এরই মধ্যে সংস্কার কাজ শেষ করে এনেছে রেলওয়ে। ২০১৬ সালে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ১২০টির মতো নতুন কোচ সংযুক্ত হয়েছে। কোচ আমদানির পাশাপাশি ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত ট্র্যাকগুলো সংস্কার হওয়ায় রেলের দুর্ঘটনা ঝুঁকিও কমে এসেছে বলে মনে করছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।

সুত্র:বণিক বার্তা, জানুয়ারি ২০, ২০১৮


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।